ই নামজারি ও ভূমি কর

🏛️ ভূমি নামজারি/খারিজ আদেশের বিরুদ্ধে আইনি প্রতিকার: কোথায়, কখন যাবেন?

সূচীপত্র

সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসিল্যান্ড কর্তৃক নামজারি (মিউটেশন) আবেদন নামঞ্জুর (Reject) হলে কিংবা কোনো আদেশ স্বার্থের পরিপন্থী হলে হতাশ হওয়ার কিছু নেই। ‘রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০’ অনুযায়ী, একজন সংক্ষুব্ধ নাগরিক ধাপে ধাপে উচ্চতর আদালতে প্রতিকার চাওয়ার পূর্ণ সুযোগ পান।

আইনি প্রক্রিয়া সফল করতে প্রতিকার পাওয়ার সঠিক আদালত ও সুনির্দিষ্ট তামাদি (Limitation) সময়সীমা জেনে রাখা অত্যন্ত জরুরি।

ধাপ ১: রিভিউ (Review) – এসিল্যান্ড বরাবর

যদি আদেশে কোনো সাধারণ করণিক ভুল (Clerical Mistake) থাকে অথবা আবেদনকারী নতুন কোনো দালিলিক প্রমাণ উপস্থাপন করতে চান, তবে যেই এসিল্যান্ড আদেশ দিয়েছেন, তাঁর বরাবরই রিভিউ আবেদন করা যায়।

  • সময়সীমা: আদেশের তারিখ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে। (রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০ এর ধারা ১৫০)

ধাপ ২: প্রথম আপিল (Appeal) – এডিসি রেভিনিউ আদালতে

এসিল্যান্ডের আদেশে সন্তুষ্ট না হলে অথবা রিভিউ আবেদন খারিজ হলে, পরবর্তী পদক্ষেপ হিসেবে জেলার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) বা এডিসি রেভিনিউ আদালতে আপিল দায়ের করতে হবে। নামজারি বা খারিজ বাতিলের ক্ষেত্রে এটি একটি অত্যন্ত কার্যকর পদক্ষেপ।

  • সময়সীমা: আদেশের তারিখ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে। (ধারা ১৪৭ ও ১৪৮)

ধাপ ৩: দ্বিতীয় আপিল/রিভিশন (Revision) – বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়

এডিসি রেভিনিউ-এর রায়েও যদি সংক্ষুব্ধ হন বা ন্যায়বিচার না পান, তবে বিভাগীয় কমিশনারের (Divisional Commissioner) কার্যালয়ে আপিল বা রিভিশন দায়ের করা যাবে।

  • সময়সীমা: আদেশের তারিখ থেকে ৬০ দিনের মধ্যে।

ধাপ ৪: চূড়ান্ত প্রতিকার – ভূমি আপিল বোর্ড

আইনি প্রতিকার চাওয়ার সর্বশেষ ধাপ হলো ভূমি আপিল বোর্ড (Land Appeal Board)। বিভাগীয় কমিশনারের আদেশের বিরুদ্ধে এখানে চূড়ান্ত প্রতিকার চাওয়া যায়। এই বোর্ড কর্তৃক প্রদত্ত রায়ই সাধারণত এই প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়।

  • সময়সীমা: আদেশের তারিখ থেকে ৯০ দিনের মধ্যে।

💡 বিশেষ সতর্কতা: আপিল বা রিভিশন দায়ের করার ক্ষেত্রে আদেশের সার্টিফাইড কপি বা নকল তুলতে যে সময়টুকু লাগবে, তা তামাদির এই নির্ধারিত মেয়াদ থেকে বাদ যাবে (Limitation Act অনুযায়ী)। তাই আদেশ হওয়ার পর দ্রুত সার্টিফাইড কপির জন্য আবেদন করা বুদ্ধিমানের কাজ, যা আইনি প্রতিকার চাওয়ার সুযোগকে সুরক্ষিত রাখবে।

ভূমি সংক্রান্ত আইনি অধিকার রক্ষায় সচেতন নাগরিক হিসেবে এই প্রক্রিয়া ও সময়সীমা জানা অপরিহার্য।

সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসি ল্যান্ডের সর্বোচ্চ ক্ষমতা কি?

সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসি ল্যান্ড (AC Land) বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের একজন কর্মকর্তা হিসেবে উপজেলা/রাজস্ব সার্কেল পর্যায়ে ভূমি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে কালেক্টর বা জেলা প্রশাসক-এর প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেন। তাঁর সর্বোচ্চ ক্ষমতা প্রধানত ভূমি প্রশাসন, রাজস্ব আদায় এবং নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতার মধ্যে নিহিত।

সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর গুরুত্বপূর্ণ ও সর্বোচ্চ ক্ষমতা বা এখতিয়ারগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:

🌟 ভূমি ব্যবস্থাপনায় সর্বোচ্চ ক্ষমতা

  • নামজারি (Mutation), জমাভাগ (Partition) ও জমা একত্রীকরণ (Amalgamation) সংক্রান্ত আদেশ: জমির মালিকানা পরিবর্তনের পর রেকর্ড হালনাগাদ করার জন্য নামজারি আবেদন মঞ্জুর বা নামঞ্জুর করার সর্বোচ্চ এখতিয়ার তাঁর রয়েছে।

  • ভূমি উন্নয়ন কর (Land Development Tax) নির্ধারণ ও আদায়: তিনি ভূমি উন্নয়ন করের assessment, collection (আদায়) এবং remission (মওকুফ)-এর দায়িত্বে থাকেন।

  • রেকর্ড সংশোধন (Record Correction): ভূমি ব্যবস্থাপনা ম্যানুয়াল, ১৯৯০ এবং অন্যান্য আইন অনুযায়ী খতিয়ান ও স্বত্বলিপি প্রণয়ন বা সংশোধনের মাধ্যমে রেকর্ড হালকরণে তিনি পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তবে এই ক্ষমতা করণিক ভুলের (Clerical Mistake) সংশোধনের মধ্যে সীমাবদ্ধ।

  • খাস জমি ব্যবস্থাপনা ও বন্দোবস্ত: সরকারি খাস জমি চিহ্নিত করা, অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ করা এবং ভূমিহীনদের মধ্যে কৃষি ও অকৃষি খাস জমি বন্দোবস্ত দেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি মূল ভূমিকা পালন করেন।

  • সায়রাত মহাল ব্যবস্থাপনা: হাট-বাজার, জলমহাল (নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে) এবং অন্যান্য সায়রাত মহালের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, সীমানা নির্ধারণ ও ইজারা প্রদান সংক্রান্ত কাজ তিনি সম্পাদন করেন।

  • অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ: সরকারি স্বার্থ সংশ্লিষ্ট জমি বা খাস জমি থেকে অবৈধ দখলদার উচ্ছেদের জন্য আইন অনুযায়ী কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।

  • সার্টিফিকেট মামলা পরিচালনা: ভূমি উন্নয়ন কর বা সরকারি পাওনা খেলাপি হলে রেন্ট সার্টিফিকেট মামলা (Public Demands Recovery Act) পরিচালনা ও নিষ্পত্তি করার ক্ষমতা তাঁর রয়েছে।

⚖️ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা (Executive Magistracy Power)

এসি ল্যান্ড পদাধিকারবলে একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে ক্ষমতাপ্রাপ্ত হন। এই ক্ষমতার মাধ্যমে তিনি:

  • মোবাইল কোর্ট পরিচালনা: পরিবেশ, ভোক্তা অধিকার বা ভূমি সংক্রান্ত আইন লঙ্ঘনের জন্য মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে বিভিন্ন অপরাধে তাৎক্ষণিক দণ্ড বা জরিমানা প্রদান করতে পারেন।

  • আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা: বিশেষ পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য ফৌজদারি কার্যবিধির (Criminal Procedure Code) অধীনে আদেশ জারি করতে পারেন।

  • আইনের প্রয়োগ: মাঠ পর্যায়ে ভূমি সংক্রান্ত বিভিন্ন আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করেন।

🔗 নিয়ন্ত্রণ ও সমন্বয়

যদিও এসি ল্যান্ডের এসব ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ক্ষমতা রয়েছে, তবে তিনি উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও), অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) এবং সর্বোপরি জেলা প্রশাসক (কালেক্টর)-এর নিয়ন্ত্রণে থেকে কাজ করেন। তাঁর প্রদত্ত আদেশের বিরুদ্ধে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তিগণ উচ্চতর কর্তৃপক্ষ (যেমন এডিসি রেভিনিউ, বিভাগীয় কমিশনার, ভূমি আপিল বোর্ড) এর নিকট আপিল করার সুযোগ পান।

মোটকথা, এসি ল্যান্ড হলেন মাঠ পর্যায়ে ভূমি প্রশাসন ও রাজস্ব সংক্রান্ত প্রায় সকল বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং তার বাস্তবায়নকারী সর্বোচ্চ একক কর্মকর্তা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *