সূচীপত্র
বিশেষজ্ঞদের মতে, হাতে থাকা সঞ্চয়ের পুরোটা এক জায়গায় না রেখে সঞ্চয়পত্র এবং এফডিআর (Fixed Deposit Receipt)-এর মধ্যে ভাগ করে বিনিয়োগ করা বুদ্ধিমানের কাজ। এটি যেমন ঝুঁকি কমায়, তেমনি নিশ্চিত লাভ এনে দিতে পারে।
সঞ্চয়পত্র: নিরাপত্তা ও উচ্চ মুনাফা
সঞ্চয়পত্র হলো একটি সরকারি পণ্য, তাই এটিতে বিনিয়োগকারীর জন্য সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ও আস্থার জায়গা থাকে।
| সুবিধা ✅ | অসুবিধা ❌ |
| সরকারি গ্যারান্টি, টাকা হারানোর ভয় নেই। | নির্দিষ্ট সীমার বেশি কেনা যায় না (সর্বোচ্চ ৪৫-৫০ লাখ টাকা)। |
| এফডিআর-এর তুলনায় সুদের হার বেশি (গড়ে প্রায় ১২%)। | মেয়াদ শেষের আগে ভাঙালে লাভের হার কমে যায়। |
| দীর্ঘমেয়াদে লাভ নিশ্চিত। | মুনাফার ওপর উৎসে কর কর্তন করা হয় (৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত ৫%, এর বেশি হলে ১০%)। |
| কিছু ক্ষেত্রে কর রেয়াত পাওয়া যায়। | জরুরি মুহূর্তে তাৎক্ষণিক ক্যাশ পাওয়া কঠিন হতে পারে। |
পরিবার সঞ্চয়পত্র (Family Savings Certificate):
কারা কিনতে পারবেন: ১৮+ বয়সী যেকোনো বাংলাদেশী মহিলা, যেকোনো শারীরিক প্রতিবন্ধী (পুরুষ/মহিলা), এবং ৬৫+ বয়সী যেকোনো বাংলাদেশী নাগরিক (পুরুষ/মহিলা)।
মুনাফার হার (৫ বছরান্তে): ১১.৯৩% (৭,৫০,০০০ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগের জন্য)।
সুবিধা: মাসিকভিত্তিতে মুনাফা প্রদেয়।
এফডিআর (Fixed Deposit Receipt): নমনীয়তা ও ঋণের সুযোগ
এফডিআর হলো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য এককালীন টাকা জমা রেখে সুদ পাওয়ার একটি নমনীয় ব্যবস্থা।
| সুবিধা ✅ | অসুবিধা ❌ |
| মেয়াদ বেছে নেওয়ার সুযোগ (৩ মাস থেকে ৫ বছর বা ১০ বছর)। | সাধারণত সুদের হার সঞ্চয়পত্রের চেয়ে কম (৬% থেকে ৯.২৫% এর মধ্যে)। |
| ঋণ নেওয়ার সুবিধা (জমার ৯০% পর্যন্ত)। | ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা ভালো না হলে ঝুঁকি বাড়তে পারে। |
| মাসিক বা ত্রৈমাসিক সুদ আয়ের সুযোগ। | সময়ের আগে ভাঙালে সুদ কমে যায়। |
| প্রয়োজনে তুলনামূলকভাবে সহজে ভাঙানো যায়। |
এফডিআর কাদের জন্য ভালো:
অধ্যাপক খালেদ মাহমুদের মতে, যদি আপনার কাছে এককালীন বাড়তি টাকা থাকে এবং আপনি স্বল্প থেকে মধ্যম সময়ের জন্য কম ঝুঁকি নিয়ে বিনিয়োগ করতে চান, তবে এফডিআর একটি নির্ভরযোগ্য উপায়।
ডিপিএস (Deposit Pension Scheme): নিয়মিত সঞ্চয়ের সেরা পথ
ডিপিএস হলো স্বল্প আয় থেকে নিয়মিতভাবে মাসিক কিস্তিতে অল্প অল্প করে সঞ্চয় করার জন্য সবচেয়ে সুবিধাজনক পদ্ধতি।
| ডিপিএস সুবিধা ✅ | এফডিআর-এর সঙ্গে পার্থক্য |
| নিয়মিত সঞ্চয়ের অভ্যাস গড়ে তোলে। | ডিপিএস হলো মাসিক কিস্তি, এফডিআর হলো এককালীন জমা। |
| সন্তানের শিক্ষা বা দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য পূরণে সহায়ক। | সীমিত আয় থেকে যারা ধীরে ধীরে টাকা জমাতে চান, তাদের জন্য ডিপিএস ভালো। |
| মেয়াদ ২ থেকে ২০ বছর পর্যন্ত হতে পারে। | এফডিআর-এর মেয়াদ তুলনামূলকভাবে কম হতে পারে। |
💡 বিনিয়োগ টিপস:
যদি হাতে বড় অঙ্কের নগদ টাকা থাকে: এফডিআর বা সঞ্চয়পত্র বেছে নিন।
যদি প্রতি মাসে অল্প অল্প করে সঞ্চয় করতে চান: ডিপিএস বেছে নিন।
বড় অঙ্কের ডিপিএস না করে, ছোট ছোট ভাগে (যেমন ২ হাজার ও ৩ হাজার টাকার দুটি ভিন্ন মেয়াদে) ভাগ করে ডিপিএস করা লাভজনক হতে পারে।
বিনিয়োগ করার আগে অবশ্যই ব্যাংকের সুনাম, আর্থিক সুরক্ষা এবং সুদের হার ভালোভাবে যাচাই করুন।
আপনার প্রয়োজন এবং আর্থিক লক্ষ্যের উপর ভিত্তি করে সঞ্চয়পত্র, এফডিআর, বা ডিপিএস-এর মধ্যে কোনটি আপনার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত তা আপনি এখন সহজেই সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।
টিআইএন ছাড়া কত টাকার সঞ্চয়পত্র কেনা যায়?
টিআইএন (TIN) বা আয়কর রিটার্ন দাখিলের প্রমাণপত্র (Proof of Submission of Return – PSR) ছাড়া সঞ্চয়পত্র কেনার ক্ষেত্রে বর্তমান নিয়মটি হলো:
বর্তমানে ১০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত সঞ্চয়পত্র কিনতে ক্রেতাকে আয়কর রিটার্ন দাখিলের প্রমাণপত্র (টিআইএন/পিএসআর) দেখাতে হবে না।
অর্থাৎ:
১০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত: সঞ্চয়পত্র কিনতে টিআইএন বা রিটার্ন জমার প্রমাণপত্র লাগবে না।
১০ লক্ষ টাকার বেশি: সঞ্চয়পত্র কিনলে অবশ্যই আয়কর রিটার্ন দাখিলের প্রমাণপত্র (টিআইএন বা পিএসআর) জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক।
এই নিয়মটি সাধারণ সঞ্চয়পত্র ক্রেতাদের জন্য একটি বড় সুবিধা, বিশেষ করে যারা ছোট ও মাঝারি আকারের বিনিয়োগ করতে চান।
সঞ্চয়পত্র নাকি এফডিআর কোনটি নিরাপদ?
সঞ্চয়পত্র এবং এফডিআর (স্থায়ী আমানত) উভয়ই তুলনামূলকভাবে নিরাপদ বিনিয়োগের মাধ্যম হলেও, নিরাপত্তার দিক থেকে সঞ্চয়পত্রকে সবচেয়ে বেশি নিরাপদ বলে গণ্য করা হয়।
নিচে নিরাপত্তার দিক থেকে দুটির তুলনা দেওয়া হলো:
১. সঞ্চয়পত্র: সবচেয়ে নিরাপদ (সর্বোচ্চ সরকারি গ্যারান্টি)
নিরাপত্তার কারণ: সঞ্চয়পত্র হলো একটি সরকারি পণ্য বা সরকারের দেওয়া একটি ঋণপত্র। এর অর্থ হলো, সরকার নিজেই এই বিনিয়োগের শতভাগ গ্যারান্টি দেয়।
ঝুঁকি: যেহেতু এটি সরকারের সরাসরি গ্যারান্টিযুক্ত, তাই টাকা হারানোর ঝুঁকি প্রায় শূন্য। দেশের অর্থনৈতিক বা ব্যাংকিং খাতে কোনো বড় ধরনের সংকট এলেও আপনার মূল টাকা ও মুনাফা সরকার নিশ্চিত করবে।
২. এফডিআর: ব্যাংকের নিরাপত্তা সাপেক্ষে নিরাপদ
নিরাপত্তার কারণ: এফডিআর হলো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে টাকা রাখা। এই নিরাপত্তা নির্ভর করে যে ব্যাংকটিতে আপনি টাকা রাখছেন, তার আর্থিক স্থিতিশীলতা ও সুনামের ওপর।
ঝুঁকি: যদিও বেশিরভাগ ব্যাংকই বাংলাদেশ ব্যাংক দ্বারা নিয়ন্ত্রিত এবং সুরক্ষিত, তাত্ত্বিকভাবে, কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের চরম আর্থিক বিপর্যয় ঘটলে সামান্য ঝুঁকি থাকতে পারে। তবে বড় ও সরকারি ব্যাংকগুলোর এফডিআরকে সাধারণত খুবই নিরাপদ হিসেবেই বিবেচনা করা হয়।
🛡️ মূল পার্থক্য (নিরাপত্তা):
| বৈশিষ্ট্য | সঞ্চয়পত্র | এফডিআর (স্থায়ী আমানত) |
| গ্যারান্টি প্রদানকারী | বাংলাদেশ সরকার (সর্বোচ্চ নিরাপত্তা) | সংশ্লিষ্ট ব্যাংক/আর্থিক প্রতিষ্ঠান |
| ঝুঁকির মাত্রা | প্রায় শূন্য (টাকা হারানোর ভয় নেই) | কম (ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার ওপর নির্ভরশীল) |
সিদ্ধান্ত:
যদি আপনার বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা হয় সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার, তবে সঞ্চয়পত্রই হলো সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বিকল্প।
যদি আপনি ব্যাংকের নিরাপত্তা এবং স্থিতিশীলতার ওপর আস্থা রাখেন এবং পাশাপাশি সহজে ভাঙানোর সুবিধা (Liquidity) বা ঋণ নেওয়ার সুবিধা চান, তবে এফডিআর নিরাপদ একটি বিকল্প।
