বাংলাদেশের সাধারণ মানুষকে ব্যাংকিং সেবার আওতায় আনতে এক সময় ‘ডাচ্-বাংলা মোবাইল ব্যাংকিং’ বা বর্তমানের ‘রকেট’ ছিল একমাত্র ভরসা। কিন্তু এক দশকের ব্যবধানে চিত্রটি পুরোপুরি বদলে গেছে। বর্তমানে মোবাইল ব্যাংকিং বলতেই সাধারণ মানুষের মুখে সবার আগে চলে আসে বিকাশ বা নগদের নাম। অগ্রদূত হয়েও রকেটের এই স্থবিরতার পেছনে বেশ কিছু কৌশলগত ও কাঠামোগত কারণ দেখছেন বাজার বিশ্লেষকরা।
১. ব্র্যান্ডিং ও মার্কেটিংয়ে রক্ষণশীলতা
বিকাশ বা নগদ যেভাবে আগ্রাসী মার্কেটিংয়ের মাধ্যমে মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে, রকেট সেখানে অনেক বেশি রক্ষণশীল। টেলিভিশন বিজ্ঞাপন থেকে শুরু করে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে রকেটের উপস্থিতি তুলনামূলক অনেক কম। ফলে তরুণ প্রজন্ম এবং নতুন গ্রাহকদের কাছে রকেটের ‘ব্র্যান্ড ইমেজ’ ততটা জোরালো নয়। প্রতিযোগীরা যখন জীবনযাত্রার অংশ হিসেবে নিজেদের তুলে ধরছে, রকেট তখনো কেবল একটি ‘ব্যাংকিং টুল’ হিসেবেই রয়ে গেছে।
২. আধুনিকায়নের অভাব ও জটিল অ্যাপ ইন্টারফেস
বর্তমান যুগে গ্রাহক সেবার প্রধান শর্ত হলো সহজ এবং মসৃণ ইউজার ইন্টারফেস। বিকাশ বা নগদের অ্যাপ ব্যবহার করা যতটা সহজ, রকেটের অ্যাপ সেই তুলনায় কিছুটা জটিল এবং পুরনো ধাঁচের। অনেক ব্যবহারকারীর অভিযোগ, রকেট অ্যাপের নেভিগেশন এবং ট্রানজ্যাকশন প্রক্রিয়া প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় সময়সাপেক্ষ। একটি আধুনিক ও ব্যবহারকারী-বান্ধব অ্যাপ তৈরিতে রকেটের এই অনীহা তাদের পিছিয়ে পড়ার অন্যতম কারণ।
৩. ইকোসিস্টেম ও মার্চেন্ট পেমেন্টে সীমাবদ্ধতা
মোবাইল ব্যাংকিং এখন আর শুধু টাকা পাঠানো বা উত্তোলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। কেনাকাটা, ইউটিলিটি বিল, অনলাইন শপিং থেকে শুরু করে চায়ের দোকানের পেমেন্ট—সবখানেই বিকাশের জয়জয়কার। এই বিশাল ‘ইকোসিস্টেম’ তৈরিতে রকেট অনেক পিছিয়ে। একজন গ্রাহক যখন দেখেন তার দৈনন্দিন কেনাকাটায় রকেট ব্যবহারের সুযোগ কম, তখন তিনি স্বাভাবিকভাবেই অন্য সেবার দিকে ঝুঁকে পড়েন।
৪. চার্জ কাঠামো ও আকর্ষণীয় অফারের অভাব
নগদ বাজারে আসার পর ‘সর্বনিম্ন ক্যাশ-আউট চার্জ’ দিয়ে একটি বড় বাজার নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। অন্যদিকে, বিকাশ নিয়মিত ক্যাশব্যাক এবং ডিসকাউন্ট অফার দিয়ে গ্রাহক ধরে রাখছে। রকেটের ক্ষেত্রে এ ধরনের আকর্ষণীয় ক্যাম্পেইন বা সাশ্রয়ী চার্জের সুবিধা খুব একটা চোখে পড়ে না। ফলে সাধারণ গ্রাহক, যারা খরচের ব্যাপারে সচেতন, তারা রকেট ব্যবহারে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন।
৫. ডাচ্-বাংলা এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের সাথে অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতা
রকেটের পিছিয়ে পড়ার একটি বড় কারণ হলো ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের নিজস্ব ‘এজেন্ট ব্যাংকিং’ সেবা। ব্যাংকটি বর্তমানে তাদের এজেন্ট ব্যাংকিং নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণে যতটা গুরুত্ব দিচ্ছে, রকেটের প্রসারে ততটা দিচ্ছে না বলে মনে করেন অনেকে। অনেক ক্ষেত্রে রকেটের গ্রাহক সেবা এবং এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা একে অপরের প্রতিযোগী হয়ে দাঁড়িয়েছে। গ্রাহকরাও মোবাইল ওয়ালেটের চেয়ে সরাসরি এজেন্ট ব্যাংকিং বা কার্ড ব্যবহার করাকে বেশি নিরাপদ বা সুবিধাজনক মনে করছেন।
৬. এজেন্ট পয়েন্টের দুষ্প্রাপ্যতা
পাড়া-মহল্লায় বা প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিকাশ বা নগদের এজেন্ট যেভাবে হাত বাড়ালেই পাওয়া যায়, রকেটের ক্ষেত্রে তা নয়। অনেক ক্ষেত্রে এজেন্ট পাওয়া গেলেও পর্যাপ্ত ‘ক্যাশ’ না থাকা বা সেবা দিতে অনিহার অভিযোগ পাওয়া যায়। টাকা জমা দেওয়া বা তোলার জন্য যদি গ্রাহককে অনেক দূরে যেতে হয়, তবে সেই সেবার জনপ্রিয়তা কমে যাওয়াটাই স্বাভাবিক।
উপসংহার
বিশেষজ্ঞদের মতে, রকেট যদি আবার বাজারে শক্ত অবস্থানে ফিরতে চায়, তবে তাদের প্রচলিত ব্যাংকিং চিন্তাধারা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। আধুনিক প্রযুক্তি, শক্তিশালী মার্চেন্ট নেটওয়ার্ক এবং গ্রাহক-কেন্দ্রিক মার্কেটিং কৌশল গ্রহণ না করলে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের এই তীব্র প্রতিযোগিতায় রকেটের টিকে থাকা আরও কঠিন হয়ে পড়বে।
