সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ‘প্রস্তাবিত জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৫’-এর একটি খসড়া তালিকা নিয়ে সরকারি কর্মচারী মহলে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছে। বিশেষ করে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের গ্রেড উন্নয়নের আন্দোলনের যৌক্তিকতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, প্রস্তাবিত এই স্কেলে নিম্নধাপের গ্রেডগুলোর মধ্যে বেতনের ব্যবধান এতটাই নগণ্য যে, গ্রেড পরিবর্তন হলেও আর্থিক লাভের অঙ্ক হবে খুবই সামান্য।
সূচীপত্র
বেতন বৈষম্যের নতুন চিত্র
প্রস্তাবিত বেতন স্কেল অনুযায়ী, ১৩তম গ্রেড থেকে ১১তম গ্রেড পর্যন্ত মূল বেতনের ব্যবধান মাত্র ১,০০০ টাকা। বিস্তারিত চিত্রটি নিম্নরূপ:
| গ্রেড | প্রস্তাবিত মূল বেতন (টাকা) | পূর্ববর্তী গ্রেডের সাথে ব্যবধান |
| ১৩তম গ্রেড | ২৪,০০০/- | — |
| ১২তম গ্রেড | ২৪,৩০০/- | ৩০০ টাকা |
| ১১তম গ্রেড | ২৫,০০০/- | ৭০০ টাকা |
বিশ্লেষণে দেখা যায়, একজন শিক্ষক ১৩তম গ্রেড থেকে পদোন্নতি পেয়ে ১২তম গ্রেডে গেলে তার মূল বেতন বাড়বে মাত্র ৩০০ টাকা। একইভাবে ১২তম থেকে ১১তম গ্রেডে উন্নীত হলে বৃদ্ধি পাবে মাত্র ৭০০ টাকা। অর্থাৎ, ১৩তম থেকে সরাসরি ১১তম গ্রেডে গেলেও বেতন বাড়বে মাত্র ১,০০০ টাকা।
আন্দোলনের কার্যকারিতা নিয়ে সংশয়
প্রাথমিক শিক্ষকরা দীর্ঘদিন ধরে ১০ম গ্রেড বা তার উচ্চতর গ্রেডের দাবিতে রাজপথে আন্দোলন করে আসছেন। কিন্তু প্রস্তাবিত স্কেলের এই কাঠামো কার্যকর হলে গ্রেড পরিবর্তনের সেই লড়াই কেবল ‘পদবি’ বা ‘সামাজিক সম্মানের’ মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে।
পর্যবেক্ষকদের মতে:
আর্থিক প্রাপ্তি নগণ্য: বেতন স্কেলের এই ক্ষুদ্র ব্যবধানের ফলে আন্দোলন করে গ্রেড পরিবর্তন করলেও জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে তা কোনো উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে না।
কমিশনের কৌশলী অবস্থান: সমালোচকদের দাবি, বেতন স্কেলের ধাপগুলোর ব্যবধান কমিয়ে আনা হয়েছে যাতে গ্রেড পরিবর্তনের দাবি পূরণ করলেও সরকারের ওপর বড় কোনো আর্থিক চাপ না পড়ে।
সম্মান বনাম অর্থ: গ্রেড উন্নয়ন হলে শিক্ষকদের সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি পেলেও পকেটে তার প্রতিফলন থাকবে না বললেই চলে।
শিক্ষকদের প্রতিক্রিয়া
সাধারণ শিক্ষকদের একটি বড় অংশ মনে করছেন, এই প্রস্তাবিত কমিশন রিপোর্ট তাদের দীর্ঘদিনের দাবিকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার একটি কৌশল মাত্র। আন্দোলন যেখানে ছিল কয়েক হাজার টাকার বৈষম্য নিরসনের, সেখানে মাত্র কয়েকশ টাকার ব্যবধান শিক্ষকদের হতাশ করেছে।
এখন দেখার বিষয়, এই প্রস্তাবিত স্কেল চূড়ান্ত হওয়ার আগে শিক্ষক সংগঠনগুলো তাদের দাবিতে কোনো পরিবর্তন আনে কি না। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে এটি স্পষ্ট যে, গ্রেড উন্নয়নের সকল আন্দোলন এখন আর্থিক সুবিধার চেয়ে ‘সম্মান রক্ষার’ লড়াইয়ে বেশি পরিণত হয়েছে।

বেতন বৈষম্যের চরম শিখরে বাংলাদেশ: সরকারি চাকরি কি শুধুই উচ্চপদস্থদের জন্য?
বাংলাদেশের সরকারি চাকুরিজীবীদের বেতন কাঠামো নিয়ে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ এবার জনসম্মুখে বিস্ফোরিত হচ্ছে। বিশেষ করে প্রস্তাবিত নতুন বেতন স্কেলের খসড়া (২০২৫) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসার পর সাধারণ কর্মচারীদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। নিচুতলার কর্মচারীদের অভিযোগ, রাষ্ট্রের বেতন বরাদ্দের সিংহভাগই কুক্ষিগত করে রাখছেন ১ম থেকে ১০ম গ্রেডের কর্মকর্তারা, আর বদনামের বোঝা বইতে হচ্ছে সাধারণ কর্মচারীদের।
বিশ্লেষণে প্রকট বৈষম্য
আপনার দেয়া চার্টটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে থাকা কর্মকর্তাদের (গ্রেড ১-৫) বেতন ও সুযোগ-সুবিধা যেখানে আকাশচুম্বী, সেখানে নিচের দিকের গ্রেডগুলোতে (১১-২০) বেতন বৃদ্ধি কেবল ‘নামমাত্র’।
গ্রেড বৈষম্য: শীর্ষ গ্রেডগুলোতে বেতনের ব্যবধান যেখানে হাজার হাজার টাকা, সেখানে ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের বেতনের পার্থক্য মাত্র কয়েকশ টাকা। যেমন— ১৩তম থেকে ১১তম গ্রেডের ব্যবধান মাত্র ১,০০০ টাকা।
বরাদ্দের ভারসাম্যহীনতা: মোট বাজেটের একটি বিশাল অংশ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বিলাসিতা, গাড়ি সুবিধা এবং উচ্চ মূল বেতনে ব্যয় হয়। অথচ জনবল বেশি থাকা সত্ত্বেও নিচের গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য বরাদ্দ থাকে যৎসামান্য।
জনগণের আদালতে বিচার
সাধারণ কর্মচারীদের প্রশ্ন—রাষ্ট্রীয় সেবা কি কেবল উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারাই প্রদান করেন? মাঠ পর্যায়ে কাজ করা ১১ থেকে ২০ গ্রেডের লক্ষ লক্ষ কর্মচারী কেন সবসময় বঞ্চিত থাকবে?
ভুক্তভোগী কর্মচারীদের দাবি: ১. বেতন বৈষম্য নিরসন: উচ্চ ও নিম্ন গ্রেডের বেতনের অনুপাত ১:৪ করার যে দাবি দীর্ঘদিন ধরে চলছে, তা এই নতুন স্কেলেও উপেক্ষা করা হয়েছে। ২. সুযোগ-সুবিধার ব্যবধান: চিকিৎসা ভাতা, শিক্ষা ভাতা এবং বাড়ি ভাড়ার ক্ষেত্রে উচ্চপদস্থ ও নিম্নপদস্থদের মধ্যে যে বিশাল দেয়াল তোলা হয়েছে, তা অমানবিক। ৩. বদনাম বনাম বাস্তবতা: প্রায়ই শোনা যায় সরকারি কর্মচারীরা অনেক বেতন পান, কিন্তু বাস্তবে নিম্ন গ্রেডের একজন কর্মচারীর মাসিক বেতন দিয়ে বর্তমান বাজারে পরিবার চালানো অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশেষজ্ঞ অভিমত
অর্থনীতিবিদদের মতে, একটি বৈষম্যহীন রাষ্ট্রে বেতন কাঠামোর পার্থক্য এত বেশি হওয়া উচিত নয়। নিচুতলার কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মান নিশ্চিত না করে কেবল উচ্চবিত্ত আমলাতান্ত্রিক কাঠামোকে তুষ্ট করলে প্রশাসনে বিশৃঙ্খলা ও দুর্নীতির প্রবণতা আরও বাড়বে।
উপসংহার: সরকার যদি দ্রুত এই বেতন বৈষম্য কমিয়ে না আনে, তবে ১১ থেকে ২০ গ্রেডের বিশাল এই কর্মী বাহিনী মানসিকভাবে ভেঙে পড়বে। সাধারণ জনগণের কাছে প্রশ্ন—এই অসম বন্টন কি আদৌ একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের কাম্য?
