ইসলামি শরিয়াহ অনুযায়ী কোনো ব্যক্তির মৃত্যুর পর তার রেখে যাওয়া সম্পত্তি বন্টনের প্রক্রিয়াটি ‘মুসলিম উত্তরাধিকার আইন’ বা ‘ফারায়েজ’ নামে পরিচিত । মুসলমানদের এই ব্যক্তিগত আইনটি মূলত পবিত্র কোরআন, হাদিস, ইজমা এবং কিয়াসের ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত । বর্তমান বাংলাদেশে এই ধর্মীয় বিধানের পাশাপাশি ১৯৩৭ সালের শরিয়াহ আইন এবং ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের মাধ্যমে সম্পত্তি বন্টন প্রক্রিয়া পরিচালিত হয় ।
উত্তরাধিকার আইনের প্রধান উৎসসমূহ: বিশেষজ্ঞদের মতে, এই আইনের প্রথম ও প্রধান উৎস হলো আল-কোরআন । বিশেষ করে সূরা নিসায় উত্তরাধিকারীদের নির্দিষ্ট অংশের কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে । এছাড়া রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ বা হাদিস, মুসলিম আইনবিদদের ঐক্যমত্য (ইজমা) এবং যুক্তিনির্ভর সাদৃশ্য (কিয়াস) এই আইনের অবিচ্ছেদ্য অংশ ।
সম্পত্তির অংশীদার ও বন্টন নীতি: মুসলিম আইনে উত্তরাধিকারীদের প্রধানত দুটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে: ১. অংশীদার (Sharers): কোরআন নির্ধারিত নির্দিষ্ট অংশের অধিকারী ১২ জন ব্যক্তি, যার মধ্যে ৪ জন পুরুষ এবং ৮ জন নারী । পিতা, স্বামী, মাতা, কন্যা এবং স্ত্রী—এই পাঁচজন কখনোই উত্তরাধিকার থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত হন না । ২. অবশিষ্টাংশভোগী (Residuaries): অংশীদারদের নির্দিষ্ট অংশ দেওয়ার পর যদি কোনো সম্পত্তি অবশিষ্ট থাকে, তবে তারা তা লাভ করেন ।
১৯৬১ সালের উল্লেখযোগ্য সংস্কার: মূল হানাফী আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তির জীবিত থাকাকালীন তার কোনো পুত্র বা কন্যা মারা গেলে, ওই মৃত সন্তানের সন্তানরা (দাদা/নানার সম্পত্তিতে) উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হতেন । তবে ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ৪ ধারা অনুযায়ী এই নিয়মে আমূল পরিবর্তন আনা হয়েছে । বর্তমানে মৃত পুত্র বা কন্যার সন্তানরা তাদের বাবা বা মা বেঁচে থাকলে যে পরিমাণ সম্পত্তি পেতেন, ঠিক সেই পরিমাণ অংশ লাভ করেন ।
পারিবারিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট: বাংলাদেশে মুসলমানদের জন্য এই আইনটি শুধু একটি ধর্মীয় বিধি নয়, বরং একটি বিধিবদ্ধ আইনি কাঠামো । উত্তরাধিকারের পাশাপাশি বিবাহ, বিবাহ-বিচ্ছেদ এবং ওয়াকফ সংক্রান্ত বিষয়গুলোও এই আইনের অধীনে পরিচালিত হয় । বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই আইন সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান থাকলে পারিবারিক সম্পত্তি নিয়ে সৃষ্ট অনেক জটিলতা ও বিরোধ এড়ানো সম্ভব।
