সূচীপত্র
সম্প্রতি বাংলাদেশে মোবাইল হ্যান্ডসেট নিবন্ধনের ক্ষেত্রে NEIR ডাটাবেজের কড়াকড়িতে বিপাকে পড়েছেন সাধারণ গ্রাহকরা। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, একটি নির্দিষ্ট হ্যান্ডসেটে শুধুমাত্র সেই ব্যক্তির সিম চলবে যার নামে ফোনটি নিবন্ধিত। অর্থাৎ, হ্যান্ডসেট এবং সিম কার্ড—উভয়ই একই জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) দিয়ে নিবন্ধিত হতে হবে। এই নিয়মের ফলে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা বলা হলেও, বাস্তব ক্ষেত্রে এটি সাধারণ ব্যবহারকারী ও সেকেন্ড হ্যান্ড মোবাইল বাজারের জন্য ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
১. সেকেন্ড হ্যান্ড মার্কেটে বড় ধস
এই নিয়মের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে ব্যবহৃত বা সেকেন্ড হ্যান্ড ফোন কেনাবেচায়। আগে একজন ব্যবহারকারী খুব সহজেই পুরাতন ফোন কিনে নিজের সিম ব্যবহার করতে পারতেন। কিন্তু এখন পুরাতন মালিকের NID থেকে ফোনটি ‘ডি-রেজিস্টার’ না করা পর্যন্ত নতুন মালিকের সিমে নেটওয়ার্ক আসবে না। দেশের বিশাল একটি অংশের মানুষ যারা সাশ্রয়ী মূল্যে পুরাতন ফোন কেনেন, তারা এখন আইনি ও প্রযুক্তিগত জটিলতায় পড়ার ভয়ে আছেন।
২. ব্যক্তিগত ও পারিবারিক ব্যবহারে বাধা
বাস্তব জীবনে অনেক সময় বাবা-মায়ের নামে কেনা সিম সন্তান ব্যবহার করে, কিংবা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ফোন অদলবদল হয়। এই নতুন নিয়মে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ফোন বা সিম শেয়ার করার সুযোগ প্রায় বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এমনকি অফিসিয়াল ফোনগুলোতে ব্যক্তিগত সিম ব্যবহারের ক্ষেত্রেও তৈরি হচ্ছে নেটওয়ার্ক জটিলতা।
৩. ইতিবাচক দিক: কমবে মোবাইল চুরি
তবে এই নিয়মের একটি বড় সুবিধা হচ্ছে মোবাইল চুরি বা ছিনতাই রোধ। চোর যদি ফোনটি ছিনতাই করে নিজের বা অন্য কারো সিম কার্ড প্রবেশ করায়, তবে কোনোভাবেই নেটওয়ার্ক পাবে না। এতে ফোনটি চোরের কাছে অকেজো হয়ে পড়বে, যা দীর্ঘমেয়াদে অপরাধ কমিয়ে আনতে সহায়ক হতে পারে।
৪. ভ্যাট ও ইমপোর্ট পলিসির বৈষম্য
এদিকে বাজারে ফোনের দাম নিয়ে অস্থিরতা কাটছে না। আমদানিকৃত ফোনের ওপর নামমাত্র ভ্যাট কমানো হলেও, দেশি কারখানায় উৎপাদিত ফোনের ওপর ভ্যাট ৫% থেকে বাড়িয়ে ১০% করার গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। একদিকে টেকনিক্যাল জটিলতা, অন্যদিকে দামের ঊর্ধ্বগতি—সব মিলিয়ে সাধারণ ক্রেতারা নাজেহাল।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মটি হওয়া উচিত ছিল ঐচ্ছিক। অর্থাৎ গ্রাহক যদি চান তার ফোনটি লক করে রাখবেন, তবেই অন্য সিম কাজ করবে না। কিন্তু সবার জন্য এটি বাধ্যতামূলক করে দেওয়ায় সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়বে। ডিজিটাল বাংলাদেশ থেকে স্মার্ট বাংলাদেশে উত্তরণের এই সময়ে প্রযুক্তির ব্যবহার সহজ করার বদলে কঠিন করে দেওয়া হচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
এসব ফোন কিভাবে চালু করা যাবে?
বিটিআরসি (BTRC) বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের এই কড়াকড়ি নিয়ম চালু থাকলে, একটি ফোন সচল করতে বা অন্য সিমে ব্যবহার উপযোগী করতে আপনাকে টেকনিক্যাল এবং লিগ্যাল—উভয় ধাপ অনুসরণ করতে হবে। আপনার সমস্যার সমাধানে নিচের পদ্ধতিগুলো কার্যকর হতে পারে:
১. ডি-রেজিস্ট্রেশন (De-registration) প্রক্রিয়া
যদি ফোনটি সেকেন্ড হ্যান্ড হয়, তবে আগের মালিকের ডাটাবেজ থেকে ফোনটিকে মুক্ত করতে হবে।
আগের মালিকের সহায়তা: ফোনটির পূর্ববর্তী মালিককে তার নিবন্ধিত সিম থেকে নির্দিষ্ট কোড ডায়াল করে বা এনইআইআর (NEIR) পোর্টালে লগইন করে হ্যান্ডসেটটি ডি-রেজিস্ট্রেশন করতে হবে।
প্রক্রিয়া: সাধারণত বিটিআরসি-র ওয়েবসাইটে বা এসএমএস-এর মাধ্যমে এটি করা যায় (যেমন:
DR <Space> IMEIলিখে নির্দিষ্ট নম্বরে পাঠানো)।
২. নতুন মালিকের নামে পুনঃনিবন্ধন (Re-registration)
ফোনটি ডি-রেজিস্ট্রার হয়ে গেলে সেটি এখন “ফ্রি”। এবার আপনার নিজের সিম দিয়ে এটি নিবন্ধিত করতে হবে।
আপনার এনআইডি (NID) দিয়ে নিবন্ধিত সিমটি ফোনে প্রবেশ করান।
ফোন চালু করার পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিবন্ধনের জন্য ফিরতি মেসেজ আসতে পারে। অথবা ম্যানুয়ালি পোর্টালে গিয়ে আপনার এনআইডি ও আইএমইআই (IMEI) তথ্য দিয়ে নিবন্ধন সম্পন্ন করতে হবে।
৩. অফিসিয়াল পোর্টালে ডকুমেন্ট সাবমিট
যদি ফোনটি বিদেশ থেকে আনা হয় বা উপহার হিসেবে পাওয়া হয়, তবে এটি বৈধ করার জন্য:
neir.btrc.gov.bd পোর্টালে গিয়ে অ্যাকাউন্ট খুলুন।
সেখানে ফোনের ক্রয়ের রশিদ বা পাসপোর্টের কপি (বিদেশ থেকে আনলে) আপলোড করে আবেদন করুন। কর্তৃপক্ষ যাচাই করে আপনার সিমের সাথে ফোনের আইএমইআই লিঙ্ক করে দেবে।
৪. ফ্যামিলি বা কর্পোরেট ফোনের ক্ষেত্রে
যদি আপনার ফোনটি অফিসের হয় বা অন্য কোনো সদস্যের নামে কেনা হয়, তবে:
কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলে ফোনের ডাটাবেজে আপনার সিম নম্বরটি ‘অ্যাডিশনাল ইউজার’ হিসেবে যুক্ত করার কোনো অপশন আছে কি না দেখতে হবে। (যদিও বর্তমান কড়াকড়িতে এটি বেশ কঠিন)।
৫. কাস্টমার কেয়ারের সাহায্য নেওয়া
সবচেয়ে সহজ এবং নিরাপদ উপায় হলো আপনার সিম অপারেটরের (যেমন গ্রামীণফোন, রবি, বাংলালিংক) নিকটস্থ কাস্টমার কেয়ারে যাওয়া। সেখানে আপনার এনআইডি এবং ফোনের ক্রয় রশিদ দেখালে তারা ডাটাবেজ আপডেট করে দিতে পারবে।
সতর্কতা: আইএমইআই (IMEI) পরিবর্তন করার চেষ্টা করবেন না। অনেক অসাধু ব্যবসায়ী সফটওয়্যার দিয়ে আইএমইআই বদলে দেওয়ার অফার দিতে পারে, যা সম্পূর্ণ অবৈধ এবং ধরা পড়লে আইনি জটিলতায় পড়তে পারেন।
