জমি কেনাবেচার ক্ষেত্রে অংশীদার বা প্রতিবেশীর ‘অগ্রক্রয়’ বা ‘প্রিয়েমশন’ (Pre-emption) নিয়ে বিদ্যমান জটিলতা নিরসনে উচ্চ আদালতের একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে নালিশি জমি বিক্রির সময় অংশীদারের উপস্থিতি বা তার মৌখিক অসম্মতি ভবিষ্যতে মামলা করার ক্ষেত্রে বাধা হবে কি না, সে বিষয়ে আইনি ধোঁয়াশা দূর করেছে দেশের সর্বোচ্চ আদালত।
মৌখিক আশ্বাস কি অধিকার নষ্ট করে?
ফজর উদ্দিন বনাম মইনুদ্দিন এবং অন্যান্য [৪৪ ডিএলআর (আপিল বিভাগ) ৬২] মামলার রায় অনুযায়ী, জমি বিক্রির সময় যদি অগ্রক্রয়ের দাবিদার ব্যক্তি (প্রার্থী) সেখানে উপস্থিত থাকেন কিংবা জমিটি কিনতে অস্বীকৃতি জানান, তবুও তার অগ্রক্রয়ের আইনি অধিকার নষ্ট হয় না। এমনকি তিনি যদি মৌখিকভাবে আশ্বাস দেন যে তিনি মামলা করবেন না, তবুও পরবর্তীতে তিনি আইনি প্রক্রিয়ায় মামলা করার অধিকার রাখেন। উচ্চ আদালত মনে করেন, ‘অগ্রক্রয়’ একটি বিধিবদ্ধ আইনগত অধিকার (Statutory Right), যা কেবল মৌখিক কোনো আচরণ বা সম্মতির কারণে বিলুপ্ত হতে পারে না।
মামলার রায় পক্ষে আসলে কি পূর্বের দলিল বাতিল হবে?
অনেকের মনে প্রশ্ন থাকে, অগ্রক্রয় মামলার ডিক্রি বা রায় পক্ষে আসলে আগের ক্রেতার দলিলটি কি বাতিল হয়ে যায়? আইনি ব্যাখ্যা অনুযায়ী:
স্বত্ব পরিবর্তন: অগ্রক্রয় মামলায় ডিক্রি পাওয়ার অর্থ হলো—আদালত ঘোষণা করছেন যে, আগের ক্রেতার স্থলে এখন থেকে মামলার বাদী (অংশীদার) জমির প্রকৃত মালিক হিসেবে গণ্য হবেন।
বিকল্প দলিল: এখানে আগের দলিলটি সরাসরি ছিঁড়ে বা পুড়িয়ে বাতিল করা হয় না, বরং আদালতের রায়ের মাধ্যমে আগের ক্রেতার অধিকারটি বাদীর ওপর স্থানান্তরিত হয়।
নামজারি: আদালতের ডিক্রির কপি দিয়ে এসি ল্যান্ড অফিসে নামজারি (Mutation) সম্পন্ন করার মাধ্যমে আগের ক্রেতার নাম বাদ দিয়ে বাদীর নাম খতিয়ানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এর ফলে আগের বিক্রয় দলিলের কার্যকারিতা আইনগতভাবে লুপ্ত হয়।
অগ্রক্রয় মামলার শর্তাবলী ও সময়সীমা
রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০-এর ৯৬ ধারা অনুযায়ী, কোনো কৃষি জমির অংশীদার যদি তার অংশ অন্য কারও কাছে বিক্রি করেন, তবে উত্তরাধিকার সূত্রে থাকা সহ-শরিকরা সেই জমি কেনার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পান। ১. সময়সীমা: বিক্রয় সম্পর্কে জানার ০২ মাসের মধ্যে মামলা করতে হয়। তবে সাফ-কবলা দলিল রেজিস্ট্রির ৩ বছরের পর আর মামলা করা যায় না। ২. আদালতে জমা: মামলার সময় দলিলের মূল্যের ওপর ২৫% ক্ষতিপূরণ এবং ৮% বার্ষিক সরল সুদসহ টাকা আদালতে জমা দিতে হয়।
বিশেষজ্ঞের পরামর্শ
ভূমি আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, জমি কেনার সময় সহ-শরিকদের লিখিত নোটিশ (Notice under section 89) দেওয়া জরুরি। যদি নোটিশ ছাড়াই জমি বিক্রি হয়, তবে সহ-শরিকরা যেকোনো সময় আদালতের আশ্রয় নিতে পারেন। উচ্চ আদালতের এই সিদ্ধান্ত (৪৪ ডিএলআর) সাধারণ মানুষের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বড় ভূমিকা রাখছে।
তথ্যসূত্র: রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন এবং উচ্চ আদালতের নজির (৪৪ ডিএলআর, এডি ৬২)
