নতুন বছরের শুরুতেই সঞ্চয়পত্রের বিনিয়োগকারীদের জন্য দুঃসংবাদ নিয়ে এলো অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ (আইআরডি)। সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১ জানুয়ারি ২০২৬ থেকে কার্যকর হয়েছে সঞ্চয়পত্রের নতুন ও পুনর্নির্ধারিত মুনাফার হার। ছয় মাসের ব্যবধানে আবারও মুনাফার হার কমানোর ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন মধ্যবিত্ত এবং যারা সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর নির্ভর করে সংসার চালান।
সূচীপত্র
মুনাফা হ্রাসের মূল চিত্র
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বিনিয়োগের পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে মুনাফার হারে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে। বিশেষ করে ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকার বেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে মুনাফা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন হার: বর্তমান পুনর্বিন্যাস অনুযায়ী সঞ্চয়পত্রের সর্বোচ্চ মুনাফার হার দাঁড়িয়েছে ১০.৫৯ শতাংশ এবং সর্বনিম্ন ৮.৭৪ শতাংশ।
পরিবার সঞ্চয়পত্র: দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় এই স্কিমে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগে আগে যেখানে মাসে প্রায় ৯৪৪ টাকা (লাখ প্রতি) পাওয়া যেত, এখন তা কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮৩৪ টাকায়। অর্থাৎ প্রতি লাখে বিনিয়োগকারীরা মাসে প্রায় ১১০ টাকা কম পাবেন।
পেনশনার সঞ্চয়পত্র: অবসরপ্রাপ্তদের জন্য নির্ধারিত এই স্কিমে ৭.৫ লাখ টাকার কম বিনিয়োগে মুনাফা ১১.৯৮% থেকে কমিয়ে ১০.৫৯% করা হয়েছে।
স্কিম অনুযায়ী নতুন মুনাফার হার (একনজরে)
| সঞ্চয়পত্রের ধরন | ৭.৫ লাখ টাকা পর্যন্ত মুনাফা (%) | ৭.৫ লাখ টাকার বেশি মুনাফা (%) |
| পরিবার সঞ্চয়পত্র | ১০.৫৪% | ১০.৪১% |
| পেনশনার সঞ্চয়পত্র | ১০.৫৯% | ১০.৪১% |
| বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্র (৫ বছর) | ১০.৪৪% | ১০.৪১% |
| ৩ মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক | ১০.৪৮% | ১০.৪৩% |
কেন এই সিদ্ধান্ত?
অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকার মূলত ব্যাংক আমানতের সুদের হারের সঙ্গে সঞ্চয়পত্রের হারের সামঞ্জস্য আনতে এই পদক্ষেপ নিয়েছে। এর মাধ্যমে ব্যাংকগুলোতে তারল্য বৃদ্ধি এবং বাণিজ্যিক ঋণের সুদহার কমিয়ে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে উচ্চ মূল্যস্ফীতির (৮-৯ শতাংশ) এই সময়ে সঞ্চয়পত্রের মুনাফা কমে যাওয়া সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বিনিয়োগকারীদের জন্য জরুরি তথ্য
আইআরডি-র প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, যারা ১ জানুয়ারি ২০২৬-এর আগে সঞ্চয়পত্র কিনেছেন, তাদের মুনাফার হার অপরিবর্তিত থাকবে। তবে মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ওই অর্থ পুনরায় বিনিয়োগ (Re-investment) করতে চাইলে নতুন নির্ধারিত হার প্রযোজ্য হবে।

প্রতি লাখে মাসে কত টাকা মুনাফা পাওয়া যাবে?
১ জানুয়ারি ২০২৬ থেকে কার্যকর হওয়া নতুন মুনাফার হার অনুযায়ী, ১ লক্ষ টাকার সঞ্চয়পত্রে মাসিক মুনাফা কত পাওয়া যাবে তা নিচে দেওয়া হলো।
মুনাফার পরিমাণ নির্ভর করে আপনার মোট বিনিয়োগের পরিমাণ এবং উৎসে কর (Tax) কর্তনের ওপর। ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগে ৫% কর এবং তার বেশি বিনিয়োগে ১০% কর কাটা হয়।
১. পরিবার সঞ্চয়পত্র (মাসিক মুনাফা প্রদান করে)
বিনিয়োগের পরিমাণ অনুযায়ী প্রতি লাখে মাসে মুনাফা দাঁড়াবে:
৭.৫ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগ করলে: * ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগে (৫% কর দিয়ে): প্রায় ৮৩৪ টাকা।
৫ লক্ষের বেশি কিন্তু ৭.৫ লক্ষ পর্যন্ত (১০% কর দিয়ে): প্রায় ৭৯০ টাকা।
৭.৫ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগ করলে: * ১০% কর কর্তনের পর প্রতি লাখে মাসে প্রায় ৭৮০ টাকা।
২. পেনশনার সঞ্চয়পত্র (৩ মাস অন্তর মুনাফা প্রদান করে)
এই স্কিমে মুনাফা ৩ মাস পরপর দেওয়া হয়, তবে মাসিক হিসেবে করলে দাঁড়ায়:
৭.৫ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগ করলে: * ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগে (কোনো কর নেই): প্রায় ৮৮২ টাকা।
৫ লক্ষের বেশি কিন্তু ৭.৫ লক্ষ পর্যন্ত (১০% কর দিয়ে): প্রায় ৭৯৪ টাকা।
৭.৫ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগ করলে: * ১০% কর কর্তনের পর প্রতি লাখে মাসে প্রায় ৭৮০ টাকা।
৩. তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র
৭.৫ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগ করলে: * ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত (৫% কর দিয়ে): প্রায় ৮৩০ টাকা।
৫ থেকে ৭.৫ লক্ষ পর্যন্ত (১০% কর দিয়ে): প্রায় ৭৮৬ টাকা।
৭.৫ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগ করলে: * ১০% কর কর্তনের পর প্রতি লাখে মাসে প্রায় ৭৮২ টাকা।
সহজ হিসাবের জন্য সারাংশ: আপনি যদি নতুন করে পরিবার সঞ্চয়পত্র কেনেন এবং আপনার মোট বিনিয়োগ ৫ লক্ষ টাকার নিচে হয়, তবে প্রতি লাখে মাসে আপনি ৮৩৪ টাকা হাতে পাবেন। কিন্তু আপনার মোট বিনিয়োগ যদি বড় অংকের (যেমন ৩০-৪০ লক্ষ টাকা) হয়, তবে আপনি প্রতি লাখে মাসে গড়ে ৭৮০ টাকার মতো মুনাফা পাবেন।
