দেশের নিম্নবিত্ত ও সুবিধাবঞ্চিত গর্ভবতী মায়েদের পুষ্টি নিশ্চিত করতে এবং মাতৃত্বকালীন ঝুঁকি কমাতে সরকার ‘মাতৃত্বকালীন ভাতা’ বা ‘গর্ভকালীন ভাতা’ প্রদান করে আসছে। তবে অনেক সময় সঠিক তথ্যের অভাবে অনেক যোগ্য নারী এই সুবিধার বাইরে থেকে যান। আবেদন প্রক্রিয়া, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং ভাতার পরিমাণ নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ নির্দেশিকা নিচে তুলে ধরা হলো।
১. আবেদনের যোগ্যতা যাচাই
এই ভাতার জন্য আবেদন করতে হলে আবেদনকারীকে নির্দিষ্ট কিছু শর্ত পূরণ করতে হয়:
নাগরিকত্ব: আবেদনকারীকে অবশ্যই জন্মসূত্রে বাংলাদেশের নাগরিক হতে হবে।
আর্থিক অবস্থা: সাধারণত যেসকল পরিবারের মাসিক আয় ২,০০০ টাকার নিচে, তারা অগ্রাধিকার পাবেন।
সন্তান সংখ্যা: এই সুবিধা শুধুমাত্র প্রথম ও দ্বিতীয় সন্তানের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। তৃতীয় সন্তানের জন্য এই ভাতা প্রদান করা হয় না।
গর্ভকাল: আবেদন করার সময় আবেদনকারীকে অন্তত ৫ মাসের গর্ভবতী হতে হবে।
বয়সসীমা: আবেদনকারীর বয়স অবশ্যই ২০ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে হতে হবে।
২. প্রয়োজনীয় কাগজপত্র
আবেদন করার আগে নিচের ডকুমেন্টগুলো সংগ্রহে রাখুন:
আবেদনকারীর জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) অথবা জন্ম নিবন্ধন সনদ।
স্বামীর জাতীয় পরিচয়পত্রের (NID) ফটোকপি।
ডাক্তার বা কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে সত্যায়িত গর্ভাবস্থার সনদপত্র বা প্রেগনেন্সি টেস্ট রিপোর্ট।
আবেদনকারীর ৩ কপি রঙিন পাসপোর্ট সাইজের ছবি।
নিজস্ব নামে নিবন্ধিত মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট (বিকাশ, নগদ বা রকেট)।
স্থায়ী বাসিন্দার প্রমাণ হিসেবে নাগরিকত্ব সনদ (প্রয়োজন সাপেক্ষে)।
৩. আবেদন পদ্ধতি: অনলাইন ও অফলাইন
আবেদনকারী চাইলে ঘরে বসে অনলাইনে অথবা সরাসরি অফিসে গিয়ে আবেদন করতে পারেন।
অনলাইন পদ্ধতি: সরকারের নির্দিষ্ট পোর্টালে (যেমন- 103.48.16.6:8080/LM-MIS/applicant/onlineRegistration) গিয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে ফর্ম পূরণ করতে হবে। ছবি ও প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টের স্ক্যান কপি আপলোড করার পর আবেদনটি সাবমিট করতে হবে। আবেদন শেষে প্রাপ্ত ‘ট্র্যাকিং আইডি’টি অবশ্যই সংরক্ষণ করতে হবে।
অফলাইন পদ্ধতি: অনলাইনে সমস্যা হলে সরাসরি নিজ এলাকার ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) বা পৌরসভা অফিসে গিয়ে নির্ধারিত আবেদন ফর্ম সংগ্রহ করতে হবে। ফর্মটি নির্ভুলভাবে পূরণ করে সংশ্লিষ্ট অফিসে জমা দিতে হবে। পরবর্তীতে ইউপি চেয়ারম্যান বা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা তথ্যগুলো যাচাই-বাছাই করবেন।
৪. ভাতার পরিমাণ ও প্রদানের প্রক্রিয়া
সরকার বর্তমানে মাসিক ৮০০ টাকা হারে এই ভাতা প্রদান করে থাকে। তবে এই টাকা প্রতি মাসে আলাদাভাবে দেওয়া হয় না।
কিস্তি: প্রতি ৬ মাস পর পর ৪,৮০০ টাকা করে মোট ৪টি কিস্তিতে এই টাকা প্রদান করা হয়।
মোট পরিমাণ: টানা ২৪ মাস (২ বছর) এই সুবিধা পাওয়া যায়, যার মোট অংক দাঁড়ায় ১৯,২০০ টাকা।
টাকা পাওয়ার মাধ্যম: কোনো মধ্যস্বত্বভোগী ছাড়াই সরাসরি আবেদনকারীর মোবাইল ব্যাংকিং (নগদ/বিকাশ/রকেট) বা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা পৌঁছে যায়।
৫. কিছু জরুরি সতর্কতা
দালাল থেকে সাবধান: মাতৃত্বকালীন ভাতার কার্ড সম্পূর্ণ বিনামূল্যে করা হয়। কেউ টাকা দাবি করলে সাথে সাথে কর্তৃপক্ষকে জানান।
আবেদনের সঠিক সময়: সাধারণত অর্থ বছরের শুরু অর্থাৎ জুলাই মাসের আগে আবেদন করা ভালো, কারণ ওই সময়েই নতুন ভাতাভোগী নির্বাচন করা হয়। তবে অনলাইন পোর্টাল খোলা থাকা সাপেক্ষে মাসের ১ থেকে ২০ তারিখের মধ্যে আবেদনের চেষ্টা করা উচিত।
সঠিক তথ্য প্রদান: ফর্মে কোনো ভুল তথ্য দিলে বা তথ্য গোপন করলে আবেদনটি বাতিল হতে পারে।
গর্ভকালীন এই আর্থিক সহায়তা দরিদ্র মায়েদের পুষ্টিকর খাবার ও চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সঠিক সময়ে আবেদনের মাধ্যমে যোগ্য সকল মা এই সরকারি সুবিধার আওতায় আসতে পারেন।
