জমি ও ফ্ল্যাটের নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় সাধারণ মানুষের জন্য বড় স্বস্তির খবর এসেছে। জাতীয় সংসদে পাস হওয়া অর্থবিল-২০২৬ অনুযায়ী, জমি ও ফ্ল্যাটের বণ্টননামা, দলিল নিবন্ধন এবং নামজারির ক্ষেত্রে ট্যাক্সপেয়ার্স আইডেন্টিফিকেশন নম্বর (টিআইএন) বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব প্রত্যাহার করা হয়েছে। ফলে এসব সেবা গ্রহণের জন্য নতুন করে টিআইএন সংগ্রহ করতে হবে না।
এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে প্রস্তাবিত বাজেটে থাকা একটি আলোচিত বিধান থেকে সরকার সরে এসেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এতে সাধারণ নাগরিক, উত্তরাধিকারসূত্রে সম্পত্তি পাওয়া ব্যক্তি এবং ক্ষুদ্র সম্পত্তির মালিকরা প্রশাসনিক জটিলতা ছাড়াই নিবন্ধন কার্যক্রম সম্পন্ন করতে পারবেন।
প্রস্তাবিত বাজেটে কী ছিল?
২০২৬–২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে করজাল সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে জমি ও ফ্ল্যাট-সংক্রান্ত বিভিন্ন সেবায় টিআইএন বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব রাখা হয়েছিল।
এর আওতায় সিটি করপোরেশন ও পৌর এলাকায়—
- জমির দলিল নিবন্ধন,
- ফ্ল্যাট নিবন্ধন,
- বণ্টননামা সম্পাদন,
- নামজারি (মিউটেশন)
এসব ক্ষেত্রে টিআইএন নম্বর জমা দেওয়ার বিধান যুক্ত করার পরিকল্পনা ছিল।
তবে বিষয়টি নিয়ে আইনজীবী, কর বিশেষজ্ঞ, আবাসন খাতের উদ্যোক্তা এবং সাধারণ মানুষের পক্ষ থেকে ব্যাপক আলোচনা ও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।
শেষ পর্যন্ত কী সিদ্ধান্ত হলো?
অর্থবিল পাসের সময় সরকার ওই বিধানটি বাতিল করে। ফলে জমি বা ফ্ল্যাট নিবন্ধন, বণ্টননামা কিংবা নামজারির জন্য টিআইএন নম্বর আর বাধ্যতামূলক থাকছে না।
অর্থাৎ, পূর্বের নিয়মেই প্রয়োজনীয় দলিলপত্রের মাধ্যমে এসব কাজ সম্পন্ন করা যাবে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ এই সিদ্ধান্ত?
বাংলাদেশে অনেক ব্যক্তি রয়েছেন যাদের করযোগ্য আয় নেই, কিন্তু উত্তরাধিকারসূত্রে বা পারিবারিক কারণে জমি বা ফ্ল্যাটের মালিকানা হস্তান্তরের প্রয়োজন হয়।
যদি টিআইএন বাধ্যতামূলক করা হতো, তাহলে তাদের অনেককেই শুধুমাত্র নিবন্ধনের জন্য টিআইএন নিতে হতো। এতে অতিরিক্ত সময়, প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এবং জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা ছিল।
নতুন সিদ্ধান্তের ফলে—
- করযোগ্য আয় না থাকলেও নিবন্ধন কার্যক্রম সহজ হবে।
- উত্তরাধিকারসূত্রে সম্পত্তি হস্তান্তরে বাড়তি ঝামেলা কমবে।
- সাধারণ নাগরিকের প্রশাসনিক ব্যয় ও সময় সাশ্রয় হবে।
- নিবন্ধন প্রক্রিয়া আগের নিয়মেই পরিচালিত হবে।
ব্যাংক হিসাবের ক্ষেত্রেও স্বস্তি
একই অর্থবিলে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে। ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রেও টিআইএন বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব প্রত্যাহার করা হয়েছে।
ফলে যাদের করযোগ্য আয় নেই, তারাও আগের মতো সহজেই ব্যাংক হিসাব খুলতে পারবেন।
করমুক্ত আয়সীমাও বেড়েছে
অর্থবিলে ব্যক্তিশ্রেণির করমুক্ত বার্ষিক আয়সীমা ৪ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ বছরে ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করলে কোনো আয়কর দিতে হবে না। এর মাধ্যমে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য কিছুটা কর-স্বস্তি নিশ্চিত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ
অর্থনীতিবিদ ও কর বিশেষজ্ঞদের মতে, করজাল সম্প্রসারণ গুরুত্বপূর্ণ হলেও যেসব সেবা সাধারণ নাগরিকের দৈনন্দিন প্রয়োজনের সঙ্গে জড়িত, সেখানে অতিরিক্ত প্রশাসনিক শর্ত আরোপ করলে জনগণের ভোগান্তি বাড়তে পারে। তাই জমি-ফ্ল্যাট নিবন্ধনে টিআইএনের বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত বাস্তবসম্মত এবং জনবান্ধব পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সারসংক্ষেপ
পাস হওয়া অর্থবিল অনুযায়ী জমি-ফ্ল্যাট নিবন্ধন, বণ্টননামা ও নামজারিতে টিআইএন নম্বর বাধ্যতামূলক নয়। একই সঙ্গে ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রেও টিআইএনের বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে করমুক্ত আয়সীমা ৪ লাখ টাকায় উন্নীত করায় সাধারণ করদাতারাও বাড়তি স্বস্তি পাবেন। এসব পরিবর্তনের মাধ্যমে সরকার একদিকে করব্যবস্থাকে আরও ভারসাম্যপূর্ণ রাখার চেষ্টা করেছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের প্রশাসনিক জটিলতা কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে।
