হাতে ৩০ লাখ টাকা থাকলে নিরাপদ বিনিয়োগের মাধ্যমে কয়েক বছরে সেই অর্থ ৬০ লাখে নেওয়া অনেকেরই লক্ষ্য। বিশেষ করে ৩ মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্রে ৩০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে প্রতি তিন মাসে পাওয়া মুনাফা আবার DPS-এ জমা করার পরিকল্পনা করলে মূলধনের পাশাপাশি আলাদা একটি সঞ্চয় তহবিল গড়ে তোলা সম্ভব। তবে বর্তমান মুনাফার হার ও উৎসে করের হিসাব বলছে, শুধু সঞ্চয়পত্রের মুনাফা পুনঃবিনিয়োগ করে ৬ বছরে ৩০ লাখ টাকা থেকে ৬০ লাখ টাকা করা সম্ভব নয়।
বর্তমানে জুলাই–ডিসেম্বর ২০২৬ সময়ের জন্য জাতীয় সঞ্চয় স্কিমগুলোর মুনাফার হার অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। ৩ মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্রে ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগের জন্য মুনাফার হার ১১.৮২ শতাংশ এবং এর বেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ১১.৭৭ শতাংশ।
৩০ লাখ টাকা রাখলে প্রতি তিন মাসে কত মুনাফা
৩০ লাখ টাকা ১১.৭৭ শতাংশ হারে বিনিয়োগ করলে বছরে মোট মুনাফা হবে—
৩০,০০,০০০ × ১১.৭৭% = ৩,৫৩,১০০ টাকা।
অর্থাৎ প্রতি তিন মাসে মোট মুনাফা—
৩,৫৩,১০০ ÷ ৪ = ৮৮,২৭৫ টাকা।
তবে মুনাফার পুরো ৮৮,২৭৫ টাকা বিনিয়োগকারীর হাতে থাকবে না। আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ১০৫ অনুযায়ী সঞ্চয়পত্রের মুনাফা পরিশোধের সময় ১০ শতাংশ উৎসে কর কর্তনের বিধান রয়েছে।
১০ শতাংশ কর বাদ দিলে প্রতি তিন মাসে নিট মুনাফা দাঁড়ায় প্রায়—
৮৮,২৭৫ − ৮,৮২৮ = ৭৯,৪৪৭ টাকা।
অর্থাৎ মাসিক গড় হিসাবে এই মুনাফা প্রায়—
৭৯,৪৪৭ ÷ ৩ = ২৬,৪৮২ টাকা।
এই অর্থ খরচ না করে নিয়মিত DPS-এ জমা করাই হবে পরিকল্পনার মূল কৌশল।
মুনাফা দিয়ে DPS করলে কত হবে
ধরা যাক, ৩০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র থেকে কর কাটার পর পাওয়া প্রায় ২৬,৪৮২ টাকা মাসিক সমপরিমাণ অর্থ ৫ বছর মেয়াদি DPS-এ জমা করা হলো।
শুধু উদাহরণ হিসেবে DPS-এর বার্ষিক মুনাফা/সুদ ১০.৫০ শতাংশ ধরে হিসাব করলে ৬০ মাসে এই মাসিক কিস্তির ভবিষ্যৎ মূল্য প্রায় ২০.৮ লাখ টাকা হতে পারে।
অর্থাৎ ৫ বছর শেষে—
- মূল সঞ্চয়পত্রের মূলধন: ৩০ লাখ টাকা
- মুনাফা থেকে DPS: প্রায় ২০.৮ লাখ টাকা
- মোট: প্রায় ৫০.৮ লাখ টাকা
এখানে DPS-এর সুদের ওপর প্রযোজ্য কর এবং অন্যান্য শর্ত বিবেচনায় নিলে নিট অর্থ আরও কিছুটা কম হতে পারে।
তাহলে ৬০ লাখ করতে কত অতিরিক্ত টাকা লাগবে
এখানেই পরিকল্পনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
৩০ লাখ টাকা থেকে ৬০ লাখ করতে হলে মূলধনের বাইরে আরও ৩০ লাখ টাকা তৈরি করতে হবে।
শুধু সঞ্চয়পত্রের কর-পরবর্তী মুনাফা দিয়ে মাসে প্রায় ২৬,৪৮২ টাকা DPS-এ জমা করলে ১০.৫০ শতাংশ বার্ষিক হার ধরে ৫ বছর শেষে আনুমানিক ২০.৮ লাখ টাকা তৈরি হয়। ফলে ৩০ লাখ টাকার লক্ষ্যে পৌঁছাতে আরও প্রায় ৯.২ লাখ টাকা ঘাটতি থাকে।
সেই ঘাটতি পূরণ করতে ৬০ মাস ধরে অতিরিক্ত অর্থ যোগ করলে মাসে আনুমানিক ১১,৭০০ টাকা অতিরিক্ত সঞ্চয় প্রয়োজন হতে পারে।
অর্থাৎ মোট মাসিক DPS কিস্তি হতে পারে প্রায়—
২৬,৪৮২ + ১১,৭০০ = ৩৮,২০০ টাকা।
তবে এখানে ৫ বছরের DPS শেষ হওয়ার পর ষষ্ঠ বছরে অর্থ কোথায় রাখা হবে এবং সেই অর্থে কী হারে মুনাফা পাওয়া যাবে—তা চূড়ান্ত ফলকে প্রভাবিত করবে।
একটি সম্ভাব্য বিনিয়োগ কাঠামো
৩০ লাখ টাকা দিয়ে ৬ বছরের একটি পরিকল্পনা এভাবে সাজানো যেতে পারে—
| বিনিয়োগের ধাপ | আনুমানিক পরিমাণ |
|---|---|
| প্রাথমিক সঞ্চয়পত্র | ৩০,০০,০০০ টাকা |
| বর্তমান মুনাফার হার | ১১.৭৭% |
| বছরে মোট মুনাফা | ৩,৫৩,১০০ টাকা |
| প্রতি ৩ মাসে মোট মুনাফা | ৮৮,২৭৫ টাকা |
| ১০% উৎসে করের পর | ≈৭৯,৪৪৭ টাকা |
| মাসিক সমপরিমাণ নিট মুনাফা | ≈২৬,৪৮২ টাকা |
| DPS-এ নিজের অতিরিক্ত সঞ্চয় | ≈১১,৭০০ টাকা/মাস |
| মোট DPS কিস্তি | ≈৩৮,২০০ টাকা/মাস |
এই হিসাব উদাহরণভিত্তিক। DPS-এর প্রকৃত সুদের হার, কর এবং ভবিষ্যতে সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার পরিবর্তিত হলে ফলও পরিবর্তিত হবে।
৩ বছর পর কী হবে
এখানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। ৩ মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্রের মেয়াদ ৩ বছর। তাই ছয় বছরের পরিকল্পনায় প্রথম তিন বছর শেষে মূল ৩০ লাখ টাকা কীভাবে পুনঃবিনিয়োগ করা হবে, সেটি আগে থেকেই বিবেচনায় রাখতে হবে।
বর্তমান হার পরবর্তী সময়েও একই থাকবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। সরকার জাতীয় সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার সময়ের সঙ্গে পুনর্নির্ধারণ করতে পারে। ২০২৬ সালের জুলাই–ডিসেম্বরের জন্য আগের হারই বহাল রাখা হয়েছে।
তাই প্রথম তিন বছর পর নতুন করে ৩০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করলে তখনকার প্রযোজ্য মুনাফার হার অনুযায়ী পরবর্তী তিন বছরের হিসাব করতে হবে।
৬ বছরে দ্বিগুণ করার সবচেয়ে বাস্তবসম্মত কৌশল
৩০ লাখ টাকা দিয়ে শুরু করা বিনিয়োগকারীর জন্য মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত মুনাফা খরচ না করে সেটিকে দ্বিতীয় বিনিয়োগে পাঠানো।
পরিকল্পনাটি হতে পারে—
প্রথম ধাপ: ৩০ লাখ টাকা ৩ মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্রে রাখা।
দ্বিতীয় ধাপ: প্রতি তিন মাসের কর-পরবর্তী মুনাফা সম্পূর্ণভাবে DPS-এ বিনিয়োগ করা।
তৃতীয় ধাপ: লক্ষ্যমাত্রা ৬০ লাখ হলে মুনাফার পাশাপাশি নিজের পক্ষ থেকে আনুমানিক ১১–১২ হাজার টাকা মাসে অতিরিক্ত সঞ্চয় করা।
চতুর্থ ধাপ: ৫ বছর মেয়াদি DPS শেষ হলে প্রাপ্ত অর্থ ষষ্ঠ বছরের জন্য উপযুক্ত সুদভিত্তিক আমানত বা অন্য নিরাপদ বিনিয়োগে রাখা।
পঞ্চম ধাপ: প্রথম ৩ বছর শেষে মূল ৩০ লাখ টাকা তখনকার প্রযোজ্য সঞ্চয়পত্রের হারে পুনঃবিনিয়োগ করা।
শুধু মুনাফা পুনঃবিনিয়োগ করলেই কেন দ্বিগুণ হবে না
১১.৭৭ শতাংশ বার্ষিক মুনাফা শুনতে বেশি মনে হলেও ১০ শতাংশ উৎসে কর কাটার পর কার্যকর মুনাফা কমে যায়। তার ওপর মুনাফার টাকা যদি DPS-এ রাখা হয়, DPS-এর সুদও কর-পরবর্তী হিসাবে বিবেচনা করতে হবে।
অন্যদিকে ৬ বছরে মূল টাকা দ্বিগুণ করতে হলে ৩০ লাখ থেকে অতিরিক্ত ৩০ লাখ টাকা তৈরি করতে হবে। ফলে মুনাফার পুরো টাকা পুনঃবিনিয়োগ করলেও শুধু সেটি দিয়ে লক্ষ্য পূরণ করা কঠিন।
অর্থাৎ ৩০ লাখ টাকা মূলধন + সঞ্চয়পত্রের মুনাফা + DPS-এর সুদ + প্রয়োজনীয় অতিরিক্ত মাসিক সঞ্চয়—এই সমন্বিত পদ্ধতিই ৬০ লাখ টাকার লক্ষ্যে পৌঁছানোর বাস্তবসম্মত পথ।
বিনিয়োগের আগে যে বিষয়গুলো মনে রাখা জরুরি
প্রথমত, ১১.৭৭ শতাংশ হারটি বর্তমান জুলাই–ডিসেম্বর ২০২৬ সময়ের জন্য প্রযোজ্য। ভবিষ্যতে এই হার একই থাকবে এমন নিশ্চয়তা নেই।
দ্বিতীয়ত, সঞ্চয়পত্রের মুনাফায় ১০ শতাংশ উৎসে কর কর্তনের বিধান রয়েছে।
তৃতীয়ত, DPS-এর সুদের হারও ভবিষ্যতে পরিবর্তিত হতে পারে। তাই নির্দিষ্ট কোনো ব্যাংকের বর্তমান DPS হার ধরে ছয় বছর পরের ফলকে নিশ্চিত ফলাফল হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।
শেষ কথা
৩০ লাখ টাকা সঞ্চয়পত্রে রেখে ৬ বছরে ৬০ লাখ টাকা করার পরিকল্পনা সম্ভব হলেও শুধু সঞ্চয়পত্রের মুনাফা DPS-এ জমা করলেই লক্ষ্য পূরণ হবে না। বর্তমান ১১.৭৭ শতাংশ মুনাফার হার ও ১০ শতাংশ উৎসে কর ধরে প্রতি তিন মাসে প্রায় ৭৯,৪৪৭ টাকা নিট মুনাফা পাওয়া যেতে পারে, যা মাসিক গড়ে প্রায় ২৬,৪৮২ টাকার সমান।
এই মুনাফা নিয়মিত DPS-এ বিনিয়োগের পাশাপাশি মাসে আনুমানিক ১১–১২ হাজার টাকা অতিরিক্ত সঞ্চয় করলে ৬০ লাখ টাকার লক্ষ্যে পৌঁছানোর সম্ভাবনা অনেক বেশি হবে। তবে চূড়ান্ত ফল নির্ভর করবে আগামী বছরগুলোতে সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার, DPS-এর সুদ, কর এবং ষষ্ঠ বছরে অর্থ পুনঃবিনিয়োগের ওপর।
তাই ৬০ লাখ টাকার লক্ষ্যকে নিশ্চিত রিটার্ন নয়, বরং পরিকল্পিত সঞ্চয়ের একটি আর্থিক লক্ষ্য হিসেবে দেখা উচিত।
