পে স্কেল নিউজ ২০২৬

জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬: গেজেট জারি, ১ জুলাই থেকেই কার্যকর—ধাপে ধাপে বাড়বে বেতন, ২০২৭ সালের জুলাইয়ে মিলবে পূর্ণ সুবিধা

দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ‘চাকরি (বেতন ও ভাতাদি) আদেশ, ২০২৬’ জারি করেছে সরকার। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের বাস্তবায়ন-১ অনুবিভাগ থেকে জারি করা এস.আর.ও. নং ৩৪৭-আইন/২০২৬-এর এই প্রজ্ঞাপন প্রকাশিত হয়েছে বাংলাদেশ গেজেটের অতিরিক্ত সংখ্যায়, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে। ১৯ পৃষ্ঠার প্রজ্ঞাপনে নতুন বেতনস্কেলের পাশাপাশি বেতন নির্ধারণ, উচ্চতর গ্রেড, পেনশন, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা সহায়ক, টিফিন, কার্যভার, মোবাইলসহ বিভিন্ন ভাতা এবং অনলাইনে বেতন ফিক্সেশনের বিস্তারিত নিয়ম নির্ধারণ করা হয়েছে।

গেজেটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—জাতীয় বেতনস্কেল, ২০২৬-এর কার্যকারিতা ১ জুলাই ২০২৬ থেকে গণ্য করা হয়েছে। তবে নতুন মূল বেতনের সম্পূর্ণ পার্থক্য একসঙ্গে কার্যকর হচ্ছে না; গ্রেডভেদে নির্দিষ্ট অংশ তিন ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। ফলে গেজেট প্রকাশ সেপ্টেম্বর মাসে হলেও এর আর্থিক কার্যকারিতা জুলাই থেকেই গণনা হবে।

১ জুলাই ২০২৬ থেকে প্রথম ধাপ

গেজেট অনুযায়ী, ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে একজন কর্মচারী যে মূল বেতন পেতেন এবং নতুন জাতীয় বেতনস্কেল অনুযায়ী নির্ধারিত মূল বেতনের মধ্যে যে পার্থক্য তৈরি হবে, তার নির্দিষ্ট অংশ প্রথম ধাপে দেওয়া হবে।

১ জুলাই ২০২৬ থেকে ৩১ ডিসেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত—

  • ৯ম গ্রেড ও তদূর্ধ্ব: বেতন পার্থক্যের ৪০ শতাংশ
  • ১০ম থেকে ২০তম গ্রেড: বেতন পার্থক্যের ৫০ শতাংশ

বর্তমান বেতনের সঙ্গে যোগ করে দেওয়ার বিধান রয়েছে।

অর্থাৎ নতুন স্কেলে কারও বেতন যদি ৩০ জুনের পুরোনো বেতনের তুলনায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বেশি হয়, প্রথম ছয় মাসেই পুরো পার্থক্য হাতে আসবে না; গেজেটে নির্ধারিত শতাংশ অনুযায়ী প্রথম ধাপের বেতন পাবেন।

জানুয়ারি ২০২৭ থেকে দ্বিতীয় ধাপ

এরপর ১ জানুয়ারি ২০২৭ থেকে ৩০ জুন ২০২৭ পর্যন্ত দ্বিতীয় ধাপ কার্যকর হবে।

এ সময়ে—

  • ৯ম গ্রেড ও তদূর্ধ্ব: বেতন পার্থক্যের ৭০ শতাংশ
  • ১০ম থেকে ২০তম গ্রেড: বেতন পার্থক্যের ৭৫ শতাংশ

প্রদান করা হবে।

ফলে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধে কর্মচারীদের নতুন বেতনের আরেকটি বড় অংশ কার্যকর হবে।

১ জুলাই ২০২৭ থেকে শতভাগ নতুন মূল বেতন

নতুন বেতন কাঠামোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হলো ১ জুলাই ২০২৭

ওই তারিখ থেকে বার্ষিক বেতনবৃদ্ধিসহ নতুন নির্ধারিত মূল বেতন শতভাগ কার্যকর হবে। অর্থাৎ ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে শুরু হওয়া পর্যায়ক্রমিক বাস্তবায়ন ২০২৭ সালের ১ জুলাই পূর্ণাঙ্গ পর্যায়ে পৌঁছাবে।

গেজেট প্রকাশের আগের সময়ের বেতনও বকেয়া

প্রজ্ঞাপনে স্পষ্ট বলা হয়েছে, কর্মচারীরা ১ জুলাই ২০২৬ থেকে আদেশ জারির তারিখ পর্যন্ত সময়ের বেতন বকেয়া হিসেবে পাওয়ার অধিকারী হবেন।

একইভাবে অবসরভোগী ও আজীবন পারিবারিক পেনশনভোগীরাও ১ জুলাই ২০২৬ থেকে আদেশ জারির তারিখ পর্যন্ত প্রাপ্য নিট পেনশনের বকেয়া পাবেন।

এ কারণে সেপ্টেম্বর মাসে গেজেট প্রকাশ হলেও জুলাই-আগস্টের কার্যকর তারিখ হারিয়ে যাচ্ছে না।


২০ গ্রেড বহাল, সর্বনিম্ন ২০ হাজার টাকা

নতুন বেতনস্কেলে বিদ্যমান ২০টি গ্রেডই বহাল রাখা হয়েছে। তবে প্রতিটি গ্রেডের মূল বেতন উল্লেখযোগ্যভাবে পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে।

গেজেটের সারণি অনুযায়ী—

গ্রেডজাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬
১ম৭৮,০০০ থেকে → ১,৫৬,০০০ টাকা নির্ধারিত
২য়১,৩২,০০০–১,৫৩,০০০ টাকা
৩য়১,১৩,০০০–১,৪৮,৮০০ টাকা
৪র্থ১,০০,০০০–১,৪২,৪০০ টাকা
৫ম৮৬,০০০–১,৩৯,৭০০ টাকা
৬ষ্ঠ৭১,০০০–১,৩৪,০০০ টাকা
৭ম৫৮,০০০–১,২৬,৮০০ টাকা
৮ম৪৬,০০০–১,১০,৮০০ টাকা
৯ম৪৪,০০০–১,০৫,৯০০ টাকা
১০ম৩২,০০০–৭৭,৩০০ টাকা
১১তম২৫,০০০–৬০,৫০০ টাকা
১২তম২৪,৩০০–৫৮,৭০০ টাকা
১৩তম২৪,০০০–৫৮,০০০ টাকা
২০তম২০,০০০–৪৮,৪০০ টাকা

গেজেটের পূর্ণ সারণিতে ১ম থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত প্রতিটি ধাপের বেতনক্রম নির্ধারণ করা হয়েছে।

এ ছাড়া মন্ত্রিপরিষদ সচিব, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ও সমমর্যাদার পদে ১ লাখ ৭২ হাজার টাকা এবং সিনিয়র সচিব ও সমমর্যাদার পদে ১ লাখ ৬৪ হাজার টাকা নির্ধারিত হয়েছে।


নতুন বেতন কীভাবে নির্ধারণ হবে?

নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো বেতন নির্ধারণের নিয়ম

৩০ জুন ২০২৬ তারিখে কর্মচারী যে মূল স্কেল, উচ্চতর গ্রেড বা অন্য কোনো অনুমোদিত স্কেলে বেতন পেতেন, ১ জুলাই থেকে তার বিপরীতে নতুন জাতীয় বেতনস্কেলের সংশ্লিষ্ট স্কেল প্রযোজ্য হবে।

কেউ যদি পুরোনো স্কেলের সর্বনিম্ন ধাপে বেতন পেয়ে থাকেন, তাহলে নতুন স্কেলের সংশ্লিষ্ট প্রারম্ভিক ধাপে তাঁর বেতন নির্ধারিত হবে।

আর কেউ যদি পুরোনো স্কেলের প্রারম্ভিক ধাপের চেয়ে বেশি বেতন পেয়ে থাকেন, তাহলে পুরোনো স্কেলের প্রারম্ভিক বেতন থেকে তাঁর বর্তমান বেতনের পার্থক্য বের করে নতুন স্কেলের প্রারম্ভিক বেতনের সঙ্গে যোগ করা হবে। সেই অঙ্ক নতুন স্কেলের কোনো ধাপে না মিললে পরবর্তী উচ্চতর ধাপে বেতন নির্ধারণ করা হবে।

গেজেটে এর একটি উদাহরণও দেওয়া হয়েছে। সেখানে ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে ১৩ হাজার ৭৯০ টাকা মূল বেতন পাওয়া একজন কর্মচারীর নতুন স্কেলে বেতন হিসাব করে ২৬ হাজার ৩০০ টাকা নির্ধারণের উদাহরণ দেখানো হয়েছে।


৮ বছর পর উচ্চতর গ্রেড

নতুন পে-স্কেলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে উচ্চতর গ্রেড ব্যবস্থায়।

গেজেট অনুযায়ী, কোনো স্থায়ী কর্মচারী পদোন্নতি ছাড়া একই পদে ৮ বছর চাকরি পূর্ণ করলে, চাকরি সন্তোষজনক হওয়া সাপেক্ষে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ৯ম বছরে পরবর্তী উচ্চতর গ্রেডে বেতন পাবেন।

এ উচ্চতর গ্রেডকে পদোন্নতি হিসেবে গণ্য করা হবে না।

এখানেই শেষ নয়। প্রথম উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার পর একই পদে আরও ৬ বছর পদোন্নতি ছাড়া চাকরি করলে এবং চাকরি সন্তোষজনক হলে ৭ম বছরে দ্বিতীয় উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সুযোগ থাকবে।

তবে এ সুবিধা বেতনস্কেলের নির্দিষ্ট গ্রেড পর্যন্ত প্রযোজ্য এবং একই পদে নির্দিষ্ট সীমার বেশি উচ্চতর গ্রেড পাওয়া যাবে না। আগে একই পদে সিলেকশন গ্রেড, টাইম স্কেল বা উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার ইতিহাস থাকলেও নতুন সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ রয়েছে।

বিশেষভাবে ব্লকড পদ বা যেসব পদে পদোন্নতির ব্যবস্থা নেই, সেসব ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করলে তৃতীয় উচ্চতর গ্রেডেরও সুযোগ রাখা হয়েছে।


প্রতি ১ জুলাই বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট

নতুন পে-স্কেলে বার্ষিক বেতনবৃদ্ধির তারিখও একীভূত করা হয়েছে।

গেজেট অনুযায়ী সকল কর্মচারীর বার্ষিক বেতনবৃদ্ধির তারিখ হবে প্রতি অর্থবছরের প্রথম দিন—১ জুলাই।

নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত কোনো কর্মচারীর যোগ্যতাসম্পন্ন চাকরির মেয়াদ কমপক্ষে ছয় মাস হলে তিনি বার্ষিক বেতনবৃদ্ধির সুবিধা পাবেন।


নতুন নিয়োগে অগ্রিম ইনক্রিমেন্ট

১ জুলাই ২০২৬ বা তার পরে প্রথমবার নিয়োগ পাওয়া কর্মচারীদের জন্যও বিশেষ বিধান রয়েছে।

৯ম গ্রেড বা তদূর্ধ্ব স্কেলের পদে নির্দিষ্ট শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকলে কিছু ক্ষেত্রে একটি বা দুটি অগ্রিম বেতনবৃদ্ধি দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।

এ ছাড়া বিসিএস ক্যাডারে ৯ম গ্রেডে সরাসরি নিয়োগ পাওয়া কর্মচারীদের একটি অতিরিক্ত অগ্রিম বেতনবৃদ্ধির সুবিধা দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে বিসিএস পরীক্ষায় ক্যাডার পদে সুপারিশ না পেলেও সরকারি কর্ম কমিশনের সুপারিশে ৯ম গ্রেডে নন-ক্যাডার পদে নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের বেতন ৯ম গ্রেডের প্রারম্ভিক ধাপে নির্ধারণের বিধান রয়েছে।


পেনশনেও নতুন হিসাব

নতুন পে-স্কেলে কর্মরতদের পাশাপাশি অবসরভোগী ও আজীবন পারিবারিক পেনশনভোগীদের জন্যও নতুন কাঠামো রাখা হয়েছে।

গেজেটে বলা হয়েছে, পেনশন ও গ্রাচুইটির বিদ্যমান হার অপরিবর্তিত থাকবে। তবে নতুন জাতীয় বেতনস্কেল অনুযায়ী নিট পেনশন পুনর্নির্ধারণ করা হবে।

নিট পেনশনের ক্ষেত্রে দুইটি বড় স্তর রাখা হয়েছে—

২০,০০১ টাকা ও তদূর্ধ্ব নিট পেনশন:
প্রথম ধাপে বৃদ্ধির পার্থক্যের ৪০ শতাংশ এবং দ্বিতীয় ধাপে ৭০ শতাংশ।

১ টাকা থেকে ২০,০০০ টাকা পর্যন্ত নিট পেনশন:
প্রথম ধাপে বৃদ্ধির পার্থক্যের ৫০ শতাংশ এবং দ্বিতীয় ধাপে ৭৫ শতাংশ।

এরপর ১ জুলাই ২০২৭ থেকে শতভাগ নতুন নিট পেনশন কার্যকর হবে।


অন্যান্য ভাতা ২০২৮ সালের আগে পুরোনো হারেই

পে-স্কেলের গেজেটের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—সব ভাতা ১ জুলাই ২০২৬ থেকে নতুন হারে কার্যকর হচ্ছে না।

প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, নতুন আদেশের অধীন প্রদেয় অন্যান্য সব ভাতা—উৎসব ভাতা ও বাংলা নববর্ষ ভাতাসহ—৩১ ডিসেম্বর ২০২৭ পর্যন্ত ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে প্রাপ্য অঙ্কে দেওয়া হবে।

নতুন বেতনস্কেলে নির্ধারিত ভাতার হার ১ জানুয়ারি ২০২৮ থেকে কার্যকর হবে।

অর্থাৎ মূল বেতন ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ সময়ে ধাপে ধাপে পরিবর্তিত হলেও অনেক ভাতার নতুন হার কার্যকর হওয়ার সময় নির্ধারিত হয়েছে ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি


বাড়িভাড়া ভাতায় নতুন কাঠামো

বাড়িভাড়া ভাতার নতুন হারও ১ জানুয়ারি ২০২৮ থেকে কার্যকর হবে।

গেজেটের সারণি অনুযায়ী ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায়—

  • গ্রেড ২০-এর সর্বনিম্ন ধাপ থেকে গ্রেড ১৬-এর সর্বোচ্চ ধাপ: মূল বেতনের ৬০%
  • গ্রেড ১৫ থেকে গ্রেড ১০: মূল বেতনের ৫০%
  • গ্রেড ৯ থেকে গ্রেড ৫: মূল বেতনের ৪৫%
  • গ্রেড ৪ থেকে গ্রেড ১ ও তদূর্ধ্ব: মূল বেতনের ৪০%

অন্যান্য সিটি করপোরেশন, সাভার, নির্দিষ্ট পৌর এলাকা এবং অন্যান্য স্থানের জন্য পৃথক হার নির্ধারণ করা হয়েছে।

এ কারণে ২০২৬ সালের জুলাই থেকে নতুন বেতন হাতে পাওয়ার সময় বাড়িভাড়া সঙ্গে সঙ্গে নতুন হারে যুক্ত হবে—এমনটি গেজেট বলছে না। নতুন বাড়িভাড়া কাঠামোর কার্যকর তারিখ ১ জানুয়ারি ২০২৮


১১–২০ গ্রেডে টিফিন ভাতা ৫০০ টাকা

নতুন পে-স্কেলে অপেক্ষাকৃত নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য টিফিন ভাতার বিধান রাখা হয়েছে।

১১তম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীরা মাসে ৫০০ টাকা টিফিন ভাতা পাবেন।

তবে কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে লাঞ্চ ভাতা অথবা বিনামূল্যে দুপুরের খাবার পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্মচারী টিফিন ভাতা পাবেন না।


শিক্ষা সহায়ক ভাতা

সব কর্মচারীর জন্য সন্তানপ্রতি মাসে ৫০০ টাকা শিক্ষা সহায়ক ভাতা দেওয়ার বিধান রয়েছে।

তবে সর্বোচ্চ দুই সন্তানের জন্য মাসিক ১ হাজার টাকা পর্যন্ত এ সুবিধা পাওয়া যাবে।

স্বামী ও স্ত্রী দুজনই সরকারি কর্মচারী হলে একই সন্তানের জন্য দুজনের পৃথক শিক্ষা সহায়ক ভাতা নেওয়ার সুযোগ থাকবে না; একজনের ক্ষেত্রেই সন্তান সংখ্যা গণনা করে ভাতা নির্ধারণ করতে হবে।

২৩ বছর বয়স পর্যন্ত সন্তানের জন্য নির্ধারিত শর্তে শিক্ষা সহায়ক ভাতা পাওয়ার বিধান রয়েছে।


কার্যভার ভাতা ১ হাজার ৫০০ টাকা

চলতি দায়িত্ব বা অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনকারী কর্মচারীদের জন্য মাসিক ১ হাজার ৫০০ টাকা কার্যভার ভাতা নির্ধারণ করা হয়েছে।

তবে এ ভাতা পেতে সংশ্লিষ্ট দায়িত্ব পালন এবং বিদ্যমান বিধিবিধানের শর্ত পূরণ করতে হবে।


বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানের জন্য ৩ হাজার টাকা

নতুন কাঠামোয় বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন/প্রতিবন্ধী সন্তানের জন্য সন্তানপ্রতি মাসে ৩ হাজার টাকা ভাতার বিধান রাখা হয়েছে।

সর্বোচ্চ দুই সন্তানের জন্য এ সুবিধা প্রযোজ্য হবে এবং নির্ধারিত শর্ত পূরণ করতে হবে।


মোবাইল ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা

গেজেটে মোবাইল ভাতারও নতুন কাঠামো রাখা হয়েছে। বিভিন্ন গ্রেড অনুযায়ী মোবাইল ভাতা নির্ধারণ করা হয়েছে।

এ ছাড়া পাহাড়ি এলাকা, হাওড়, দ্বীপ ও চর এলাকায় কর্মরত কর্মচারীদের জন্য বিশেষ ভাতা এবং প্রশিক্ষণ/প্রেষণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট ভাতার বিধান রয়েছে।

নির্দিষ্ট কিছু সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের বিশেষ ভাতা, বিশেষ গার্ড ভাতা, ক্ষতিপূরণ ভাতা ও ঝুঁকি ভাতার ক্ষেত্রেও ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে অর্থ বিভাগের জারি করা পৃথক স্মারকের বিধান প্রযোজ্য হবে।


উৎসব ও শ্রান্তি-বিনোদন ভাতা বহাল

নতুন গেজেটে বার্ষিক উৎসব ভাতা এবং শ্রান্তি ও বিনোদন ভাতা বিদ্যমান বিধান অনুযায়ী বহাল রাখা হয়েছে।

তবে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হলো—কোনো কর্মচারী একবার শ্রান্তি ও বিনোদন ভাতা উত্তোলন করার পর পরবর্তী সময়ে বেতন নির্ধারণজনিত বকেয়া হিসাবের কারণে ওই ভাতার অতিরিক্ত অর্থ দাবি করতে পারবেন না।


কারা এই পে-স্কেলের আওতায় থাকছেন না?

গেজেটে জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬-এর আওতা সম্পর্কে নির্দিষ্ট ব্যতিক্রমও উল্লেখ করা হয়েছে।

এই আদেশ প্রজাতন্ত্রের চাকরিতে নিয়োজিত কর্মচারীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হলেও বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস, প্রতিরক্ষা প্রাক্কলন থেকে বেতনপ্রাপ্ত বেসামরিক কর্মচারী, পুলিশ বাহিনী ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশে নিয়োজিত কর্মচারী, নির্দিষ্ট রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক, শিক্ষানবিশ/প্রশিক্ষণার্থী, আউটসোর্সিং কর্মী, দৈনিকভিত্তিক শ্রমিক এবং চুক্তি বা খণ্ডকালীন ভিত্তিতে নিয়োজিত ব্যক্তিরা এ আদেশের সাধারণ আওতার বাইরে রাখা হয়েছে।


iBAS++-এ হবে অনলাইনে বেতন ফিক্সেশন

নতুন পে-স্কেলের বাস্তবায়নে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ধাপ হবে অনলাইনে বেতন নির্ধারণ

গেজেটে বলা হয়েছে, জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬ জারির পর সরকারি কর্মচারীরা iBAS++ সিস্টেমে প্রবেশ করে নির্ধারিত ছক পূরণ করে নতুন বেতন নির্ধারণ করবেন।

গেজেটেড কর্মচারী iBAS++-এর লগইন ইউজার আইডি ও পাসওয়ার্ড ব্যবহার করবেন। আর নন-গেজেটেড কর্মচারী জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর ও জন্মতারিখ ব্যবহার করে এবং নিবন্ধিত মোবাইল নম্বরে পাঠানো OTP দিয়ে সিস্টেমে প্রবেশ করবেন।

কোনো কর্মচারীর জাতীয় পরিচয়পত্র না থাকলে বেতন নির্ধারণের আগে এনআইডি নিবন্ধনের কথাও বলা হয়েছে।

সিস্টেমে প্রয়োজনীয় তথ্য পূরণ করে ডিডিওর কাছে সাবমিট করলে নিবন্ধিত মোবাইল নম্বরে স্বয়ংক্রিয় এসএমএস যাবে। আবার তথ্য সাবমিটের আগেই সিস্টেমে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর নতুন স্কেলে নির্ধারণযোগ্য মূল বেতন স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রদর্শিত হবে।


বেতন ফিক্সেশনের পর ভেরিফিকেশন নম্বর

অনলাইনে তথ্য সাবমিশনের পর হিসাবরক্ষণ অফিসের যাচাই ও অনুমোদনের মাধ্যমে বেতন নির্ধারণ চূড়ান্ত হবে।

এরপর Pay Fixation Verification Number তৈরি হবে। এ ভেরিফিকেশন নম্বর নতুন বেতন নির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে কাজ করবে।

গেজেটে অনলাইন প্রক্রিয়াকে গুরুত্ব দেওয়ার ফলে ভবিষ্যতে বেতন নির্ধারণের বড় অংশই ডিজিটাল পদ্ধতিতে সম্পন্ন হবে।


বিশেষ সুবিধা বিলুপ্ত

জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬ কার্যকর হওয়ার তারিখ থেকেই বিদ্যমান বিশেষ সুবিধা বিলুপ্ত হয়েছে বলে গণ্য হবে।

তবে ১ জুলাই ২০২৬ থেকে গেজেট প্রকাশের সময় পর্যন্ত কর্মচারী বা পেনশনভোগী যে বিশেষ সুবিধা পেয়েছেন, সেটির সমন্বয়ের বিষয়ে প্রজ্ঞাপনে পৃথক বিধান রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে ১ জুলাই ২০২৬ তারিখে অবসর-উত্তর ছুটিতে থাকা কর্মচারীর জন্য বিশেষ সুবিধা অবসর-উত্তর ছুটি শেষ না হওয়া পর্যন্ত পাওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।


এক নজরে জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬

বিষয়গেজেটের সিদ্ধান্ত
গেজেট১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কার্যকর তারিখ১ জুলাই ২০২৬
মোট গ্রেড২০টি
সর্বনিম্ন মূল বেতন২০,০০০ টাকা
সর্বোচ্চ নির্ধারিত বেতন১,৫৬,০০০ টাকা
মন্ত্রিপরিষদ সচিব/সমমর্যাদা১,৭২,০০০ টাকা
সিনিয়র সচিব/সমমর্যাদা১,৬৪,০০০ টাকা
প্রথম ধাপ১ জুলাই–৩১ ডিসেম্বর ২০২৬
দ্বিতীয় ধাপ১ জানুয়ারি–৩০ জুন ২০২৭
শতভাগ নতুন মূল বেতন১ জুলাই ২০২৭
নতুন ভাতা কাঠামো১ জানুয়ারি ২০২৮
উচ্চতর গ্রেড৮ বছর পর প্রথমটি, শর্তসাপেক্ষে
বার্ষিক ইনক্রিমেন্টপ্রতি ১ জুলাই
শিক্ষা সহায়ক ভাতাসন্তানপ্রতি ৫০০ টাকা, সর্বোচ্চ ১,০০০
টিফিন ভাতা১১–২০ গ্রেডে ৫০০ টাকা
কার্যভার ভাতা১,৫০০ টাকা
প্রতিবন্ধী/বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তান ভাতাসন্তানপ্রতি ৩,০০০ টাকা
বেতন ফিক্সেশনiBAS++ অনলাইনে

শেষ কথা

জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬-এর গেজেট প্রকাশের মধ্য দিয়ে সরকারি কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের অপেক্ষার প্রশাসনিক অধ্যায় শেষ হয়েছে। তবে গেজেট প্রকাশ মানেই সব সুবিধা একই দিনে হাতে পাওয়া নয়—এটাই এই প্রজ্ঞাপনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক।

নতুন মূল বেতন ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর ধরা হলেও প্রথম ছয় মাসে গ্রেডভেদে ৪০ বা ৫০ শতাংশ, পরবর্তী ছয় মাসে ৭০ বা ৭৫ শতাংশ এবং ১ জুলাই ২০২৭ থেকে শতভাগ মূল বেতন কার্যকর হবে। অন্যদিকে অধিকাংশ নতুন ভাতা ১ জানুয়ারি ২০২৮ থেকে নতুন হারে পাওয়ার কথা বলা হয়েছে।

একই সঙ্গে উচ্চতর গ্রেডের নতুন নিয়ম, প্রতি ১ জুলাই ইনক্রিমেন্ট, পেনশন পুনর্নির্ধারণ, শিক্ষা সহায়ক ও টিফিন ভাতা, প্রতিবন্ধী সন্তানের ভাতা এবং iBAS++-ভিত্তিক অনলাইন বেতন ফিক্সেশন—সব মিলিয়ে নতুন আদেশটি শুধু একটি বেতনসারণি নয়; বরং সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা ও অবসর সুবিধার পূর্ণাঙ্গ প্রশাসনিক কাঠামো নির্ধারণ করেছে।

সরকারি গেজেটের সংশ্লিষ্ট পৃষ্ঠাগুলোতে এসব বিধান বিস্তারিতভাবে উল্লেখ রয়েছে।

সাম্প্রতিক সংবাদ প্রতিবেদনগুলোতেও ৩১ আগস্ট মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর ১৭ সেপ্টেম্বর গেজেট জারির প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে থাকার কথা প্রকাশিত হয়েছিল। 

PDF Downlod Link: Pay Scale 2026

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *