পাসপোর্ট তথ্য

পাসপোর্ট পুনঃইস্যুতে বড় পরিবর্তন: হারানোর পর কী করবেন, কখন দিতে হবে ১০ হাজার টাকা

বাংলাদেশে হারানো, চুরি হওয়া কিংবা নষ্ট হয়ে যাওয়া পাসপোর্ট পুনঃইস্যুর ক্ষেত্রে নতুন নির্দেশনা জারি করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। নতুন নিয়মে পাসপোর্ট হারানোর পর অনলাইনে রিপোর্ট করা, থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা, পুরোনো পাসপোর্টের তথ্য যাচাই এবং পুনঃইস্যুর সময় পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য অপরিবর্তিত রাখার বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে প্রথমবার পাসপোর্ট হারানো বা চুরি হওয়ার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত দণ্ড ফি না থাকলেও দ্বিতীয়বার থেকে প্রতিবার ১০ হাজার টাকা অতিরিক্ত দণ্ড ফি দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বহিরাগমন-৪ শাখা থেকে ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে জারি করা পরিপত্রে এসব নির্দেশনা দেওয়া হয়। পরিপত্র অনুযায়ী, নির্দেশনাগুলো জারির তারিখ থেকেই কার্যকর হবে। পাসপোর্টের অপব্যবহার রোধ, পরিচয় জালিয়াতি প্রতিরোধ এবং নিরাপদ আন্তর্জাতিক ভ্রমণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

পাসপোর্ট হারালে প্রথমেই যে দুটি কাজ করতে হবে

নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, পাসপোর্ট হারিয়ে গেলে বা চুরি হলে আবেদনকারীকে দ্রুত দুটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রথমত, বহিরাগমন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের নির্ধারিত ওয়েবসাইট বা অনলাইন ব্যবস্থায় হারানোর রিপোর্ট করতে হবে। দ্বিতীয়ত, নিকটস্থ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে হবে।

অনলাইনে রিপোর্ট পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পাসপোর্টের অবস্থা বা স্ট্যাটাস হালনাগাদসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। অন্যদিকে, থানায় করা জিডির সত্যতা যাচাই করে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদন পাঠানোর বিধান রয়েছে।

পরিপত্রে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট থানা ৭২ ঘণ্টার মধ্যে জিডির সত্যতা যাচাই করে প্রতিবেদন বহিরাগমন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর অথবা নিকটস্থ পাসপোর্ট অফিসে পাঠাবে। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন পাওয়া না গেলে আবেদনকারীকে অনির্দিষ্টকাল অপেক্ষা করতে হবে না। সে ক্ষেত্রে জিডির কপি সংযুক্ত করে পাসপোর্ট পুনঃইস্যুর আবেদন দাখিল বা গ্রহণ করা যাবে।

এরপর প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করে ‘Lost Circular’ জারি করে পুনঃইস্যুর কার্যক্রম সম্পন্ন করা হবে।

প্রথমবার হারালে জরিমানা নেই, পরেরবার ১০ হাজার টাকা

নতুন পরিপত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পাসপোর্ট হারানো বা চুরি হওয়ার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত দণ্ড ফির বিধান। নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রথমবার পাসপোর্ট হারানো, চুরি হওয়া বা বিনষ্ট হওয়ার ক্ষেত্রে নির্ধারিত পাসপোর্ট ফির বাইরে অতিরিক্ত কোনো দণ্ড ফি দিতে হবে না।

তবে পরবর্তী সময়ে আবার পাসপোর্ট হারানো, চুরি হওয়া বা বিনষ্ট হলে প্রতিবার নির্ধারিত পাসপোর্ট ফির অতিরিক্ত ১০ হাজার টাকা দণ্ড ফি দিতে হবে।

অর্থাৎ, দ্বিতীয়বার পাসপোর্ট হারালে আবেদনকারীকে প্রযোজ্য পাসপোর্ট ফি এবং অতিরিক্ত ১০ হাজার টাকা দিতে হবে। তৃতীয়বার বা পরবর্তী প্রতিবারও একই হারে অতিরিক্ত দণ্ড ফি প্রযোজ্য হবে।

এখানে মনে রাখতে হবে, ১০ হাজার টাকা মোট পাসপোর্ট ফি নয়; এটি নির্ধারিত ফি ছাড়াও দিতে হবে এমন অতিরিক্ত দণ্ড ফি। পাসপোর্টের ধরন, মেয়াদ ও সরবরাহের ধরন অনুযায়ী মূল ফি আলাদা হতে পারে।

নতুন পাসপোর্টে থাকবে আগেরটি হারানোর তথ্য

হারানো, চুরি হওয়া বা বিনষ্ট হওয়া পাসপোর্ট পুনঃইস্যু করার পর নতুন পাসপোর্টের ডেটাপেজে ইংরেজিতে স্পষ্টভাবে ‘Previous Passport is Reported to be Lost’ লেখা থাকবে।

এর অর্থ, আগের পাসপোর্টটি হারানো হয়েছে বলে রিপোর্ট করা হয়েছিল। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ডাটাবেজে পুরোনো পাসপোর্টের অবস্থা ‘Lost’ অথবা ‘Revoked’ হিসেবে যথাযথভাবে হালনাগাদ করতে হবে।

এ ব্যবস্থার মাধ্যমে আগের পাসপোর্টের তথ্য গোপন রেখে নতুন নথি ব্যবহার করার ঝুঁকি কমানো এবং প্রয়োজনের সময় সংশ্লিষ্ট পাসপোর্টের ইতিহাস যাচাই সহজ করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

হারানো পাসপোর্ট পরে পাওয়া গেলে ব্যবহার করা যাবে?

পাসপোর্ট হারানোর পর সেটি পাওয়া গেলেও আগের পাসপোর্টটি যদি ‘Revoked’ করা হয়ে থাকে, তাহলে সেটি পুনরায় সক্রিয় করা বা বিদেশ ভ্রমণে ব্যবহার করা যাবে না।

এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে দ্রুত নিকটস্থ থানায় এবং বহিরাগমন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের নির্ধারিত অনলাইন ব্যবস্থায় বিষয়টি জানাতে হবে। বিদেশে অবস্থান করলে সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশ দূতাবাস, হাইকমিশন বা কনস্যুলেটকেও অবহিত করতে হবে।

এরপর প্রয়োজন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ডাটাবেজ ও ইমিগ্রেশন অ্যালার্ট হালনাগাদ করবে। তাই হারানো পাসপোর্ট পরে হাতে ফিরে এলেও সেটিকে বৈধ ভ্রমণ দলিল হিসেবে ব্যবহার করার আগে নিজে থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না। পাসপোর্টটি বাতিল বা রিভোক করা হয়ে থাকলে সেটি দিয়ে ভ্রমণ করা নিষিদ্ধ।

নাম, জন্মতারিখ ও বাবা-মায়ের নাম পরিবর্তনে বিধিনিষেধ

হারানো বা চুরি হওয়া পাসপোর্ট পুনঃইস্যুর ক্ষেত্রে আবেদনকারীর মৌলিক পরিচয়গত তথ্য সম্পূর্ণ পরিবর্তন করা যাবে না। পরিপত্রে বিশেষভাবে নাম, জন্মতারিখ, পিতার নাম ও মাতার নামের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে বৈধভাবে কোনো তথ্য সংশোধনের প্রয়োজন হলে প্রযোজ্য আইন, বিধি এবং অনুমোদিত তথ্য সংশোধন প্রক্রিয়া অনুসরণ করে বিষয়টি পৃথকভাবে বিবেচনা করা যাবে।

অর্থাৎ, পাসপোর্ট হারানোর অজুহাতে সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিচয়ে নতুন পাসপোর্ট নেওয়ার সুযোগ থাকবে না। আবার প্রকৃত তথ্যগত ভুল সংশোধনের প্রয়োজন হলে নির্ধারিত বৈধ পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে।

পাসপোর্ট আংশিক নষ্ট হলে কী করতে হবে?

পাসপোর্ট আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলে এবং পরিচয় শনাক্ত করার মতো অংশ আবেদনকারীর কাছে থাকলে সেটি সমর্পণের ভিত্তিতে পুনঃইস্যু করা যাবে।

অন্যদিকে, পাসপোর্ট সম্পূর্ণভাবে নষ্ট হয়ে গেলে এবং আবেদনকারীকে শনাক্ত করার মতো কোনো অংশ দেখানো সম্ভব না হলে হারানো পাসপোর্টের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে।

তাই পাসপোর্ট ক্ষতিগ্রস্ত হলে অবশিষ্ট অংশ ফেলে না দিয়ে সংরক্ষণ করা এবং পুনঃইস্যুর আবেদনের সময় সংশ্লিষ্ট পাসপোর্ট অফিসের নির্দেশনা অনুসরণ করা গুরুত্বপূর্ণ।

বিদেশে পাসপোর্ট হারালে করণীয়

বিদেশে অবস্থানকালে পাসপোর্ট হারানো, চুরি হওয়া বা বিনষ্ট হলে বহিরাগমন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের নির্ধারিত অনলাইন ব্যবস্থায় রিপোর্ট করতে হবে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশ দূতাবাস, হাইকমিশন বা কনস্যুলেটকে অবহিত করতে হবে।

পরিপত্র অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশি মিশন ‘Lost Circular’ জারি করে পুনঃইস্যুর প্রক্রিয়া সম্পন্ন করবে এবং প্রয়োজনীয় তথ্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠাবে।

প্রবাসীদের ক্ষেত্রে তাই পাসপোর্ট হারানোর বিষয়টি গোপন না রেখে দ্রুত রিপোর্ট করা, পরিচয়সংক্রান্ত নথি প্রস্তুত রাখা এবং সংশ্লিষ্ট মিশনের নির্দেশনা অনুসরণ করা জরুরি।

হারানো পাসপোর্টের তথ্য যাবে ইমিগ্রেশন ব্যবস্থায়

নতুন নির্দেশনায় হারানো বা চুরি হওয়া পাসপোর্টের তথ্য স্পেশাল ব্রাঞ্চের Immigration Management System (IMS)-এ হালনাগাদ করার কথা বলা হয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী INTERPOL-কে নোটিফিকেশন দেওয়াসহ বিধি অনুসারে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এর মাধ্যমে হারানো পাসপোর্টের অপব্যবহার শনাক্ত করা এবং সংশ্লিষ্ট নথি সম্পর্কে প্রয়োজনীয় কর্তৃপক্ষকে অবহিত করার ব্যবস্থা জোরদার হবে। তবে পরিপত্রে প্রতিটি ঘটনার ক্ষেত্রেই INTERPOL-কে নোটিফিকেশন দেওয়ার বাধ্যবাধকতা উল্লেখ করা হয়নি; প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে।

পাসপোর্ট পুনঃইস্যুর নতুন নিয়ম এক নজরে

  • অনলাইন রিপোর্ট: পাসপোর্ট হারানো বা চুরি হওয়ার পর দ্রুত নির্ধারিত অনলাইন ব্যবস্থায় রিপোর্ট করতে হবে।
  • থানায় জিডি: নিকটস্থ থানায় সাধারণ ডায়েরি করতে হবে।
  • ৭২ ঘণ্টার সময়সীমা: জিডির সত্যতা যাচাই করে এ সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন পাঠানোর নির্দেশনা রয়েছে।
  • প্রথমবার হারালে: নির্ধারিত পাসপোর্ট ফির বাইরে অতিরিক্ত দণ্ড ফি নেই।
  • দ্বিতীয়বার থেকে: প্রতিবার নির্ধারিত ফির অতিরিক্ত ১০ হাজার টাকা দণ্ড ফি দিতে হবে।
  • নতুন পাসপোর্টে উল্লেখ: আগের পাসপোর্ট হারানোর বিষয়টি ডেটাপেজে লেখা থাকবে।
  • পরিচয়গত তথ্য: নাম, জন্মতারিখ, পিতা ও মাতার নাম সম্পূর্ণ পরিবর্তন করা যাবে না।
  • পরে পুরোনো পাসপোর্ট পাওয়া গেলে: সেটি রিভোক করা হয়ে থাকলে পুনরায় সক্রিয় বা ভ্রমণে ব্যবহার করা যাবে না।
  • বিদেশে হারালে: অনলাইন রিপোর্টের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশি মিশনকে জানাতে হবে।

আগের নির্দেশনা সমন্বয় করে নতুন পরিপত্র

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখের পরিপত্রে হারানো, চুরি হওয়া বা বিনষ্ট হওয়া পাসপোর্ট পুনঃইস্যু বিষয়ে আগের নির্দেশনা সমন্বয় ও সংশোধন করে নতুন ব্যবস্থা নির্ধারণ করা হয়েছে। পরিপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, এটি জারির তারিখ থেকেই কার্যকর হবে।

নতুন ব্যবস্থায় আবেদনকারীর দায়িত্ব, জিডি যাচাই, অনলাইন রিপোর্ট, পাসপোর্টের স্ট্যাটাস হালনাগাদ এবং অতিরিক্ত দণ্ড ফির বিষয়গুলো স্পষ্ট করা হয়েছে। এতে একদিকে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত আবেদনকারীদের পুনঃইস্যুর প্রক্রিয়া চালু রাখার সুযোগ রয়েছে, অন্যদিকে পাসপোর্টের অপব্যবহার ঠেকাতে যাচাই ও তথ্য ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

শেষ কথা

পাসপোর্ট হারিয়ে গেলে শুধু নতুন পাসপোর্টের আবেদন করাই যথেষ্ট নয়; নির্ধারিত নিয়মে অনলাইন রিপোর্ট, থানায় জিডি এবং প্রয়োজনীয় যাচাইয়ের প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। প্রথমবার হারানোর ক্ষেত্রে অতিরিক্ত দণ্ড ফি না থাকলেও পরবর্তী প্রতিবার ১০ হাজার টাকা অতিরিক্ত দণ্ড ফি দিতে হবে।

বিশেষ করে, হারানো পাসপোর্ট পরে পাওয়া গেলে সেটি রিভোক করা হয়েছে কি না, তা গুরুত্বপূর্ণ। রিভোক করা হয়ে থাকলে সেটি দিয়ে বিদেশ ভ্রমণ করা যাবে না। তাই পাসপোর্ট হারানো বা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনা ঘটলে দ্রুত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো এবং সর্বশেষ নির্দেশনা অনুসরণ করাই সবচেয়ে নিরাপদ পদক্ষেপ।

Source File

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *