২০২৬ সালের এপ্রিল মাসের বর্তমান পরিস্থিতি অনুযায়ী, বাংলাদেশে বিদ্যুৎ লোডশেডিংয়ের কোনো নির্দিষ্ট বা এলাকাভিত্তিক সরকারি শিডিউল (যেমন: ১ ঘণ্টা পর পর বা ২ ঘণ্টা পর পর) আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। তবে মাঠপর্যায়ের খবর এবং বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্যানুযায়ী লোডশেডিংয়ের একটি চিত্র পাওয়া যায়:
বিদ্যুৎ বিভ্রাটের বর্তমান চিত্র (এপ্রিল ২০২৬)
বিভাগীয় শহর ও ঢাকা: ঢাকা বা বড় শহরগুলোতে লোডশেডিং তুলনামূলক কম। তবে অনেক ক্ষেত্রে দিনে ২ থেকে ৩ বার বিদ্যুৎ যাচ্ছে, যা এলাকাভেদে ভিন্ন হতে পারে।
গ্রাম ও মফস্বল এলাকা: লোডশেডিংয়ের সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ছে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতাধীন এলাকাগুলোতে। টাঙ্গাইলসহ বিভিন্ন জেলা থেকে পাওয়া তথ্যমতে, অনেক জায়গায় ৩০ মিনিট বিদ্যুৎ থাকলে ২ থেকে ২.৫ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। কিছু কিছু এলাকায় দিনে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা, এমনকি চরম অবস্থায় ১০-১২ ঘণ্টাও লোডশেডিং হচ্ছে।
পিক আওয়ার (Peak Hours): সাধারণত বিকেল ৫টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত বিদ্যুতের চাহিদা সবচেয়ে বেশি থাকে, তাই এই সময়ে বিভ্রাটের মাত্রা বাড়ে।
কেন হচ্ছে এই লোডশেডিং?
১. জ্বালানি সংকট: ডলার সংকটের কারণে বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য ফার্নেস অয়েল ও কয়লা আমদানিতে জটিলতা সৃষ্টি হওয়ায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
২. তাপমাত্রা বৃদ্ধি: এপ্রিল মাসে তীব্র গরমের কারণে বিদ্যুতের চাহিদা আগের চেয়ে অনেক বেড়ে গেছে (চাহিদা প্রায় ১৮,০০০ মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে)।
৩. রক্ষণাবেক্ষণ: কয়েকটি বড় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারিগরি ত্রুটি ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের কারণে উৎপাদন কিছুটা কম হচ্ছে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
সরকার আগামী ১৮০ দিনের একটি বিশেষ কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে যাতে লোডশেডিং পর্যায়ক্রমে কমিয়ে আনা যায়। এছাড়া রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রথম ইউনিট থেকে ১,২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়া শুরু করেছে, যা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে বড় ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
আপনার এলাকার সঠিক লোডশেডিংয়ের সময় জানতে স্থানীয় বিদ্যুৎ অফিস বা আপনার গ্রাহক সেবার (যেমন: ডেসকো, ডিপিডিসি বা পল্লী বিদ্যুৎ) অ্যাপ বা ওয়েবসাইটে লক্ষ্য রাখতে পারেন।
বিদ্যুৎ অফিস কিভাবে লোড শেডিং সাজায়?
বিদ্যুৎ অফিস বা ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানিগুলো (যেমন: ডিপিডিসি, ডেসকো বা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি) লোডশেডিংয়ের শিডিউল সাধারণত একটি সুনির্দিষ্ট গাণিতিক ও কারিগরি প্রক্রিয়ায় সাজায়। এটি মূলত চাহিদা (Demand) এবং যোগানের (Supply) ভারসাম্যের ওপর ভিত্তি করে করা হয়।
নিচে লোডশেডিং সাজানোর মূল ধাপগুলো সহজভাবে দেওয়া হলো:
১. বরাদ্দ নির্ধারণ (Load Allocation)
জাতীয় গ্রিড বা ন্যাশনাল লোড ডেসপাচ সেন্টার (NLDC) থেকে প্রতিটি বিতরণ কোম্পানিকে জানানো হয় যে তারা কত মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাবে। ধরুন, ডেসকোর চাহিদা ১০০০ মেগাওয়াট, কিন্তু গ্রিড থেকে বরাদ্দ দেওয়া হলো ৮০০ মেগাওয়াট। তাহলে বাকি ২০০ মেগাওয়াট লোডশেডিং করার পরিকল্পনা নিতে হয়।
২. ফিডার ভিত্তিক বিভাজন (Feeder-wise Distribution)
একটি বিদ্যুৎ অফিসের অধীনে অনেকগুলো ‘ফিডার’ বা লাইন থাকে। অফিসগুলো তাদের পুরো এলাকাকে ছোট ছোট ব্লকে ভাগ করে নেয়। প্রতিটি ফিডারে কতটুকু লোড আছে, তা তারা আগে থেকেই জানে।
৩. অগ্রাধিকার তালিকা (Priority List)
লোডশেডিং সাজানোর সময় কিছু এলাকাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয় যেখানে সাধারণত বিদ্যুৎ বন্ধ করা হয় না:
কেপিআই (KPI) এলাকা: গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দপ্তর বা সচিবালয়।
হাসপাতাল: বড় বড় সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল।
শিল্পাঞ্চল: উৎপাদন সচল রাখতে কিছু বিশেষ ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন।
৪. রোটেশন বা পর্যায়ক্রমিক পদ্ধতি
সাধারণত আবাসিক এলাকাগুলোতে ‘Cyclic Rotation’ বা পর্যায়ক্রমিক পদ্ধতিতে শিডিউল করা হয়।
যদি ২ ঘণ্টা পর পর ১ ঘণ্টা লোডশেডিং করার সিদ্ধান্ত হয়, তবে অফিসের সফটওয়্যার স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটি তালিকা তৈরি করে।
উদাহরণ: ‘এ’ ব্লক সকাল ১০টা থেকে ১১টা, ‘বি’ ব্লক ১১টা থেকে ১২টা—এভাবে চক্রাকারে বিদ্যুৎ বন্ধ রাখা হয়।
৫. জরুরি লোড ড্রপিং (Emergency Load Shedding)
অনেক সময় আগে থেকে তৈরি করা শিডিউল মানা সম্ভব হয় না। যদি হুট করে জাতীয় গ্রিডে ফ্রিকোয়েন্সি কমে যায় বা কোনো বড় পাওয়ার প্ল্যান্ট বন্ধ হয়ে যায়, তখন NLDC-র নির্দেশে মুহূর্তের মধ্যেই অনেক ফিডার বন্ধ করে দেওয়া হয়। একে বলা হয় ‘ফোর্সড লোডশেডিং’।
৬. নিয়ন্ত্রণ কক্ষের ভূমিকা (Control Room)
প্রতিটি বিদ্যুৎ অফিসের একটি সেন্ট্রাল কন্ট্রোল রুম থাকে। সেখান থেকে অপারেটররা কম্পিউটার বা ম্যানুয়াল সুইচের মাধ্যমে ফিডারগুলো বন্ধ বা চালু করেন। বর্তমানে অনেক জায়গায় SCADA সিস্টেমের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে এটি নিয়ন্ত্রণ করা হয়।
একটি মজার তথ্য: লোডশেডিং সাজানোর সময় কারিগরি কর্মকর্তারা চেষ্টা করেন যাতে কোনো ফিডার টানা ১ ঘণ্টার বেশি বন্ধ না থাকে। তবে চাহিদার ঘাটতি অনেক বেশি হলে (যেমন এখন ২০২৬-এর এপ্রিলে হচ্ছে) তখন বাধ্য হয়ে একই এলাকায় দিনে একাধিকবার বা দীর্ঘ সময় লোডশেডিং করতে হয়।