সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে এবং পরিবেশ দূষণ রোধে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। গত ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে আনুষ্ঠানিকভাবে জারি করা হয়েছে “মোটরযান স্ক্র্যাপ ও রিসাইক্লিং নীতিমালা, ২০২৬”। এই নতুন আইন অনুযায়ী, ইকোনমিক লাইফ বা আয়ুষ্কাল শেষ হওয়া এবং দীর্ঘকাল ফিটনেসবিহীন পড়ে থাকা মোটরযান ধ্বংস বা ‘স্ক্র্যাপ’ করা এখন বাধ্যতামূলক।
সরকারি এই নির্দেশনা অমান্য করলে একদিকে যেমন আইনি শাস্তির মুখে পড়তে হবে, অন্যদিকে নিয়ম মেনে গাড়ি স্ক্র্যাপ করলে মালিকদের জন্য রাখা হয়েছে আকর্ষণীয় আর্থিক প্রণোদনা।
১. কোন গাড়িগুলো স্ক্র্যাপ করতে হবে?
নীতিমালা অনুযায়ী সব গাড়ি এই তালিকার অন্তর্ভুক্ত নয়। মূলত পাঁচটি ক্যাটাগরির যানবাহনকে স্ক্র্যাপযোগ্য হিসেবে গণ্য করা হবে:
আয়ুষ্কাল শেষ হওয়া: সরকার নির্ধারিত ‘ইকোনমিক লাইফ’ পার করা গাড়ি।
দীর্ঘমেয়াদী ফিটনেসবিহীন: কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়া ১ বছরের বেশি সময় ধরে ফিটনেস নবায়ন না করা গাড়ি।
দূষণকারী যান: এক মাসের মধ্যে তিনবার কালো ধোঁয়া নিঃসরণ পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ হলে।
ক্ষতিগ্রস্ত যান: দুর্ঘটনা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে এমনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত, যা মেরামত করা অলাভজনক।
অকেজো ঘোষিত: সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কর্তৃক পরিত্যক্ত ঘোষিত যানবাহন।
২. মালিকদের জন্য বিশেষ সুবিধা ও আর্থিক প্রণোদনা
সরকার কেবল কড়াকড়ি নয়, বরং মালিকদের উৎসাহিত করতে বিশেষ সুবিধা ঘোষণা করেছে:
রেজিস্ট্রেশনে ছাড়: পুরনো গাড়ি স্ক্র্যাপ করলে মিলবে একটি ‘স্ক্র্যাপ সার্টিফিকেট’। এই সার্টিফিকেট ব্যবহার করে নতুন গাড়ি কেনার সময় রেজিস্ট্রেশন ফিতে বিশেষ আর্থিক ছাড় বা সরকারি প্রণোদনা পাওয়া যাবে।
সরাসরি টাকা প্রাপ্তি: স্ক্র্যাপ করা গাড়ির বডি বা যন্ত্রাংশের ন্যায্য মূল্য নির্ধারণ করবে বিআরটিএ-র কমিটি। সেই অর্থ সরাসরি মালিকের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা হবে।
মামলা থেকে মুক্তি: মেয়াদোত্তীর্ণ গাড়ি রাস্তায় রাখা বা চালানোর ফলে যে মামলা ও জরিমানার ঝুঁকি থাকে, স্ক্র্যাপ করার মাধ্যমে তা থেকে স্থায়ী মুক্তি মিলবে।
৩. স্ক্র্যাপ করার ডিজিটাল ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়া
পুরো প্রক্রিয়াটি বিআরটিএ-এর মাধ্যমে অনলাইনে সম্পন্ন হবে:
আবেদন: মালিককে বিআরটিএ-র নির্দিষ্ট পোর্টালে আবেদন করতে হবে।
যাচাই: গাড়ির কোনো আইনি জটিলতা বা মামলা আছে কিনা তা পরীক্ষা করা হবে।
হস্তান্তর: অনুমোদিত ‘স্ক্র্যাপ ভেন্ডর’-এর কাছে গাড়িটি বুঝিয়ে দিতে হবে। (সাধারণ ভাঙ্গারি দোকানে এটি করা যাবে না)।
ধ্বংসকরণ: ইঞ্জিন ও চেসিস নম্বর এমনভাবে নষ্ট করা হবে যাতে তা পুনরায় ব্যবহার না হয়।
সার্টিফিকেট: স্ক্র্যাপ সম্পন্ন হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে মালিক সার্টিফিকেট ও পাওনা টাকা বুঝে পাবেন।
৪. স্ক্র্যাপ না করলে নতুন গাড়ি কেনা অসম্ভব
নীতিমালার ৮.২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী এক কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। কোনো ব্যক্তির নামে যদি এমন কোনো গাড়ি থাকে যার ইকোনমিক লাইফ শেষ, তবে সেই গাড়িটি আইন অনুযায়ী স্ক্র্যাপ না করা পর্যন্ত তিনি নিজের নামে নতুন বা পুরাতন কোনো গাড়ি রেজিস্ট্রেশন করতে পারবেন না। অর্থাৎ, নতুন গাড়ি কেনার প্রথম শর্তই হলো পুরনো লক্কড়-ঝক্কড় গাড়িটি বৈধভাবে ধ্বংস করা।
বিশেষ সতর্কতা
বিআরটিএ জানিয়েছে, কোনো মালিক যদি নিজে থেকে গাড়ি স্ক্র্যাপ না করেন এবং মেয়াদোত্তীর্ণ গাড়ি রাস্তায় নামান, তবে সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮ অনুযায়ী বড় অঙ্কের জরিমানা করা হবে। এমনকি গাড়িটি বাজেয়াপ্ত করে বাধ্যতামূলক স্ক্র্যাপিংয়ে পাঠানো হতে পারে।
তথ্যসূত্র: মোটরযান স্ক্র্যাপ ও রিসাইক্লিং নীতিমালা, ২০২৬; বাংলাদেশ গেজেট (১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬)।
‘মোটরযান স্ক্র্যাপ ও রিসাইক্লিং নীতিমালা, ২০২৬’ এর আলোকে বিভিন্ন ধরনের যানবাহনের ইকোনমিক লাইফ বা আয়ুষ্কাল এবং নীতিমালার মূল দিকগুলো নিচে বিস্তারিত দেওয়া হলো:
১. বিভিন্ন যানবাহনের ইকোনমিক লাইফ (আয়ুষ্কাল)
সরকার পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যানবাহনের ধরন অনুযায়ী একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে। সাধারণত এই সময় পার হলে গাড়িটি আর রাস্তায় চলার উপযোগী থাকে না:
| যানবাহনের ধরন | নির্ধারিত ইকোনমিক লাইফ (আয়ুষ্কাল) |
| বাস ও মিনিবাস | ২০ বছর |
| ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান | ২৫ বছর |
| অটোরিকশা (থ্রি-হুইলার) | ১৫ বছর |
| ট্যাক্সিক্যাব | ১৫ বছর |
| ব্যক্তিগত গাড়ি (Private Car) | ২৫ বছর (পরিবর্তন সাপেক্ষ) |
| মোটরসাইকেল | ১৫ বছর (নবায়ন সাপেক্ষ) |
দ্রষ্টব্য: নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে বিআরটিএ বিশেষ পরীক্ষার মাধ্যমে এই সময়সীমা সামান্য পুনর্মূল্যায়ন করতে পারে, তবে নীতিমালার মূল লক্ষ্য মেয়াদোত্তীর্ণ গাড়ি রাস্তা থেকে সরানো।
২. নীতিমালার ৫টি প্রধান স্তম্ভ
এই নীতিমালাটি মূলত ৫টি লক্ষ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে:
পরিবেশ সুরক্ষা: পুরনো ইঞ্জিনের অতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণ এবং কালো ধোঁয়া বন্ধ করা।
সড়ক নিরাপত্তা: যান্ত্রিকভাবে দুর্বল বা ব্রেক-ফেইল করতে পারে এমন লক্কড়-ঝক্কড় গাড়ি রাস্তা থেকে সরানো।
রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রি: গাড়ির লোহা ও অন্যান্য যন্ত্রাংশ পুনরায় ব্যবহার করে দেশীয় শিল্পকে সমৃদ্ধ করা।
ডিজিটালাইজেশন: স্ক্র্যাপ করার পুরো প্রক্রিয়াটি বিআরটিএ-র অনলাইন সিস্টেমের মাধ্যমে স্বচ্ছ করা।
মালিকদের প্রণোদনা: পুরনো গাড়ি ত্যাগ করলে নতুন গাড়ি কিনতে আর্থিক সুবিধা দেওয়া।
৩. গুরুত্বপূর্ণ নিয়মসমূহ (যেগুলো আপনার জানা জরুরি)
৮.১ অনুচ্ছেদ: মেয়াদোত্তীর্ণ কোনো মোটরযান জনসমক্ষে বা রাস্তায় পার্ক করে রাখা যাবে না। এটি দণ্ডনীয় অপরাধ।
৮.২ অনুচ্ছেদ: যদি আপনার নামে একটি মেয়াদোত্তীর্ণ গাড়ি থাকে এবং আপনি সেটি স্ক্র্যাপ না করেন, তবে বিআরটিএ আপনার নামে অন্য কোনো নতুন বা পুরনো গাড়ির রেজিস্ট্রেশন (মালিকানা বদলও) করবে না।
১০.৩ অনুচ্ছেদ: স্ক্র্যাপ করার পর ৩০ দিনের মধ্যে গাড়ির মালিককে নির্ধারিত পাওনা টাকা এবং ‘স্ক্র্যাপিং সার্টিফিকেট’ প্রদান করা হবে।
৪. স্ক্র্যাপ না করার পরিণাম
আপনি যদি নীতিমালা অমান্য করে মেয়াদোত্তীর্ণ বা ফিটনেসবিহীন গাড়ি ব্যবহার করেন:
সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ অনুযায়ী ভারী জরিমানা।
গাড়িটি আইন প্রয়োগকারী সংস্থা কর্তৃক জব্দ (Seize) করা।
জব্দকৃত গাড়িটি সরকারি ব্যবস্থাপনায় বাধ্যতামূলকভাবে স্ক্র্যাপ করে ফেলা।
