জমি কেনাবেচা বা পৈতৃক সম্পত্তির হিসাব মেলাতে গিয়ে সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি যে সমস্যায় পড়েন, তা হলো দলিলের ভাষা। দলিলে এমন কিছু গূঢ় ও প্রাচীন শব্দ ব্যবহার করা হয়, যার অর্থ না বুঝলে জমি শনাক্ত করা বা সঠিক মালিকানা যাচাই করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে এই অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে প্রতারক চক্র জাল দলিল বা ভুল তথ্যের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে হয়রানি করে।
ভূমি বিশেষজ্ঞদের মতে, জমির দলিল মূলত একটি আইনি নথি। এখানে ব্যবহৃত শব্দগুলো বছরের পর বছর ধরে প্রশাসনিক ও আইনি কাঠামোতে প্রচলিত। তাই জমি সংক্রান্ত জটিলতা এড়াতে অন্তত ১০০টি মূল শব্দ জানা থাকা জরুরি।
জমির পরিচয় ও অবস্থান সংক্রান্ত শব্দ
একটি জমির গোড়াপত্তন হয় তার অবস্থান দিয়ে। দলিলে গ্রাম শব্দটির পরিবর্তে ব্যবহৃত হয় ‘মৌজা’। প্রতিটি মৌজার একটি নির্দিষ্ট সরকারি নম্বর থাকে, যাকে বলা হয় ‘জে.এল. নং’। জমির সীমানা বোঝাতে ব্যবহার করা হয় ‘চৌহদ্দি’ এবং প্রতিটি নির্দিষ্ট প্লটকে বলা হয় ‘দাগ নম্বর’। জমির মানচিত্রকে বলা হয় ‘নকশা’ বা ‘সিট’।
মালিকানা ও উত্তরাধিকারের ভাষা
দলিলে বাবার নাম বোঝাতে ‘পিং’ এবং স্বামীর নাম বোঝাতে ‘জং’ ব্যবহৃত হয়। যদি কোনো মালিক লিখতে না জানেন, তবে তার নামের পাশে ‘নিং’ (নিরক্ষর) লেখা থাকে এবং তার হয়ে যিনি নাম লিখে দেন তাকে বলা হয় ‘বং’ (বাহক)। একাধিক মালিক থাকলে সবার নাম না লিখে সংক্ষেপে ‘গং’ লেখা হয়।
মালিকানার ধরণ অনুযায়ী শব্দগুলো ভিন্ন হয়। যেমন:
বায়া: যিনি জমি বিক্রি করছেন।
হেবা বিল এওয়াজ: বিনিময়ের ভিত্তিতে দান করা জমি।
এজমালি: যৌথ মালিকানার জমি।
খাস: সরকারের মালিকানাধীন ভূমি।
দেবোত্তর: মন্দিরের নামে উৎসর্গকৃত জমি।
ওয়াকফ: ধর্মীয় বা জনহিতকর কাজে দান করা জমি।
রেকর্ড ও নথিপত্র সংক্রান্ত পরিভাষা
জমির রেকর্ড বুক বা মালিকানা বিবরণীকে বলা হয় ‘খতিয়ান’। খতিয়ানের প্রাথমিক কপিকে বলা হয় ‘পর্চা’। পুরোনো রেকর্ডকে ‘সাবেক’ এবং বর্তমান বা সর্বশেষ রেকর্ডকে ‘হাল’ বলা হয়। এছাড়া মালিকানা পরিবর্তনের প্রক্রিয়াকে বলা হয় ‘নামজারি’ বা ‘দাখিল-খারিজ’। খাজনা পরিশোধের রশিদকে বলা হয় ‘দাখিলা’।
সতর্ক থাকতে হবে যেসব শব্দে
দলিল পড়ার সময় কিছু শব্দ অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখা উচিত। যেমন ‘তঞ্চকতা’, যার অর্থ হলো প্রতারণা। কোনো দলিলে তঞ্চকতা প্রমাণিত হলে তা বাতিলযোগ্য। আবার ‘তামাদি’ মানে হলো সময়সীমা পার হয়ে যাওয়া; নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে দাবি না করলে অনেক সময় আইনি অধিকার হারানো লাগে। ‘অছিয়তনামা’ বা উইল হলো মৃত্যুর আগে সম্পত্তি বণ্টনের লিখিত নির্দেশ।
কেন এই শব্দগুলো জানা জরুরি?
ভূমি অফিসের কর্মকর্তারা জানান, অনেক সময় মানুষ ‘তফসিল’ (জমির বিস্তারিত তালিকা) না পড়েই দলিলে স্বাক্ষর করেন। আবার ‘হিস্যা’ (অংশ) এবং ‘একুনে’ (মোট পরিমাণ) না বোঝার কারণে নিজের প্রাপ্য অংশ থেকে বঞ্চিত হন। জমির ধরণ যেমন ‘বাস্তু’ (বসতভিটা) নাকি ‘কান্দা’ (উঁচু জমি) তা না জানলে জমির সঠিক দাম নির্ধারণ করা সম্ভব হয় না।
উপসংহার: জমি কেনাবেচা মানেই বড় অংকের আর্থিক লেনদেন। তাই কেবল দালালের ওপর নির্ভর না করে দলিলের মৌলিক শব্দগুলো নিজের আয়ত্তে রাখা বুদ্ধিমানের কাজ। এই ‘দলিলী ভাষা’ জানা থাকলে যেমন প্রতারণার ঝুঁকি কমে, তেমনি নিজের সম্পত্তির অধিকারও সুসংহত হয়।
