জমি কেনাবেচা বা পৈতৃক সম্পত্তির হিসাব মেলাতে গিয়ে অনেকেই বিপাকে পড়েন দলিলের ভাষা বুঝতে না পেরে। সাধারণ বাংলা শব্দের চেয়ে দলিলের ভাষা কিছুটা ভিন্ন হওয়ায় অনেকেই দলিলে কী লেখা আছে তা পুরোপুরি অনুধাবন করতে পারেন না। ফলে অনেক সময় প্রতারণার শিকার হতে হয়। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দলিলে ব্যবহৃত প্রচলিত কিছু পারিভাষিক শব্দ জানলে যে কেউ নিজের দলিল নিজেই পড়তে ও বুঝতে পারবেন।
ভূমি সেবা সহজতর করতে এবং সাধারণ মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধিতে দলিলে ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ ১০০টি শব্দের অর্থ ব্যাখ্যা করা হলো:
জমির পরিচয় ও অবস্থান সংক্রান্ত শব্দ
দলিলের শুরুতেই জমির অবস্থান বোঝাতে মৌজা (গ্রাম) এবং জে.এল. নং (মৌজা নম্বর) ব্যবহার করা হয়। জমির চারপাশের সীমানাকে বলা হয় চৌহদ্দি। এছাড়া নকশায় জমির নির্দিষ্ট ভাগকে বলা হয় সিট।
মালিকানা ও রেকর্ড সংক্রান্ত শব্দ
জমির মালিকানার প্রধান রেকর্ডবুক হলো খতিয়ান (যাকে সংক্ষেপে খং বলা হয়)। জরিপ অনুযায়ী জমির অবস্থাকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়: সাবেক (আগের রেকর্ড) এবং হাল (বর্তমান রেকর্ড)। জমির মালিকানা পরিবর্তনের প্রক্রিয়াকে বলা হয় নামজারি বা দাখিল-খারিজ। এছাড়া পর্চা হলো খতিয়ানের প্রাথমিক কপি যা প্রমাণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
ব্যক্তি ও পক্ষ পরিচিতি
দলিলে পিতার নাম বোঝাতে পিং এবং স্বামীর নাম বোঝাতে জং ব্যবহার করা হয়। যদি একাধিক অংশীদার থাকে তবে তাদের নামের শেষে গং লেখা থাকে। বিক্রেতাকে সাধারণত বায়া বলা হয় এবং যিনি জমি শনাক্ত করেন তাকে বলা হয় সনাক্তকারী। দলিলে কেউ নিরক্ষর হলে তার নামের পাশে নিং এবং তার হয়ে কেউ লিখে দিলে তাকে বং (বাহক) বলা হয়।
জমির শ্রেণি ও পরিমাপ
জমির মোট পরিমাণ বা মূল্য বোঝাতে মং বা মবলক ব্যবহৃত হয়। চাষযোগ্য জমি বা বসতভিটার ক্ষেত্রে বাস্তু (বসতভিটা) বা কান্দা (উঁচু জমি) শব্দগুলো পাওয়া যায়। নদীর পলি জমে সৃষ্ট জমিকে বলা হয় চর বা টেক। সরকারি মালিকানাধীন জমিকে বলা হয় খাস জমি।
লেনদেন ও হস্তান্তরের ধরন
জমি হস্তান্তরের বিভিন্ন মাধ্যম রয়েছে। যেমন:
হেবা বিল এওয়াজ: বিনিময়ের ভিত্তিতে দান।
এওয়াজ: সমমূল্যের বিনিময়।
অছিয়তনামা: মৃত্যুর পর সম্পত্তি বণ্টনের উইল।
ইজারা: সাময়িক চুক্তি বা ভাড়া।
গির্ব: জমি বন্ধক রাখা।
সতর্কতামূলক শব্দ
দলিল জালিয়াতি বা প্রতারণা বোঝাতে তঞ্চকতা শব্দটি ব্যবহৃত হয়। কোনো দাবি বা দলিল অকার্যকর হয়ে গেলে তাকে বলা হয় তামাদি। অন্যদিকে, দলিল বা রেকর্ডের ভুল সংশোধন করাকে বলা হয় তরমিম।
উপসংহার
ভূমি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই পরিভাষাগুলো জানা থাকলে সাধারণ মানুষ দলিলে উল্লিখিত জমির দাগ নম্বর, হিস্যা (অংশ) এবং তফসিল (বিস্তারিত তালিকা) সহজেই যাচাই করতে পারবেন। এতে করে জমি কেনাবেচায় স্বচ্ছতা আসবে এবং মামলা-মোকদ্দমার হার অনেক কমে যাবে। তাই ভূমি সংক্রান্ত যে কোনো কাজে নামার আগে এই মৌলিক শব্দগুলো আয়ত্তে রাখা প্রত্যেক নাগরিকের জন্য জরুরি।
