দেশের ভূমি ব্যবস্থাপনা ও কর নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে। আগামী ১ জুলাই ২০২৬ থেকে দেশজুড়ে কার্যকর হতে যাচ্ছে নতুন ‘উৎসে কর বিধিমালা, ২০২৬’। নতুন এই বিধিমালার অধীনে নির্দিষ্ট এলাকাগুলোতে জমি ও ফ্ল্যাট কেনাবেচা, বণ্টন কিংবা নামজারি (মিউটেশন) করার ক্ষেত্রে আয়কর রিটার্ন দাখিলের প্রমাণপত্র বা ‘প্রুফ অব সাবমিশন অব রিটার্ন’ (PSR) বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও ভূমি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, করের আওতা বাড়াতে এবং ভূমি খাতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ফলে, এখন থেকে করযোগ্য আয় না থাকলেও নির্দিষ্ট এলাকার ভূমি মালিকদের বাধ্যতামূলকভাবে রিটার্ন দাখিল করতে হবে।
যেসব এলাকায় নতুন নিয়ম কার্যকর হবে
নতুন বিধিমালা অনুযায়ী, দেশের সব সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা এবং ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড এলাকার আওতাধীন যেকোনো জমি বা ফ্ল্যাটের ক্ষেত্রে এই নিয়ম প্রযোজ্য হবে। এই সীমানার বাইরে থাকা সাধারণ গ্রামীণ এলাকা আপাতত এই কড়াকড়ির বাইরে থাকতে পারে।
যেসব কাজে পিএসআর (PSR) বাধ্যতামূলক হচ্ছে
ভূমি সেবা ও রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া গতিশীল ও স্বচ্ছ করতে মূলত ৫টি গুরুত্বপূর্ণ কাজে আয়কর রিটার্ন জমার স্লিপ বা পিএসআর প্রদর্শন করতে হবে:
১. সাব-কবলা (বিক্রয়) দলিল রেজিস্ট্রেশন: যেকোনো জমি বা ফ্ল্যাট বিক্রির চূড়ান্ত দলিল করার সময় ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়েরই পিএসআর লাগবে। ২. পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দলিল রেজিস্ট্রেশন: জমির আমমোক্তারনামা বা পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দেওয়ার ক্ষেত্রেও এই নিয়ম মানতে হবে। ৩. বায়নানামা দলিল রেজিস্ট্রেশন: জমি কেনাবেচার প্রাথমিক চুক্তি বা বায়নানামা দলিলের ক্ষেত্রেও পিএসআর বাধ্যতামূলক। ৪. বণ্টন দলিল রেজিস্ট্রেশন (নতুন সংযোজন): পৈতৃক বা শরিকানা সম্পত্তি নিজেদের মধ্যে বাটোয়ারা বা বণ্টন দলিল করার ক্ষেত্রেও এবার নতুন করে পিএসআর যুক্ত করা হয়েছে। ৫. নামজারি বা মিউটেশন (প্রথমবারের মতো বাধ্যতামূলক): জমি কেনার পর সরকারি রেকর্ডে নিজের নাম তোলার প্রক্রিয়া বা নামজারি (মিউটেশন) করতে গেলে এখন থেকে প্রথমবারের মতো পিএসআর জমা দিতে হবে।
“আয় নেই, তাও কি রিটার্ন দিতে হবে?”
সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে—যাদের বড় কোনো ব্যবসা বা চাকরি নেই, তারা কেন রিটার্ন দেবেন? আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন নিয়ম অনুযায়ী নির্দিষ্ট এলাকার মধ্যে যদি কেউ জমি কেনা, বেচা, বাটোয়ারা কিংবা নামজারি করতে চান, তবে তার করযোগ্য আয় থাকুক বা না থাকুক, তাকে অবশ্যই করদাতা হিসেবে নিবন্ধিত হতে হবে এবং আয়কর রিটার্ন জমার স্লিপ (PSR) দেখাতে হবে। অর্থাৎ, জমির মালিকানা বা হস্তান্তরের প্রয়োজনেই রিটার্ন দাখিল করা বাধ্যতামূলক।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ:
শেষ মুহূর্তের আইনি জটিলতা বা সাধের জমি ও ফ্ল্যাটের রেজিস্ট্রেশন আটকে যাওয়া এড়াতে ভূমি মালিকদের এখনই ৩টি বিষয়ে প্রস্তুতি নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে:
টিআইএন (TIN) সার্টিফিকেট প্রস্তুত বা সচল রাখা।
নিয়মিত আয়কর রিটার্ন (Tax Return) দাখিল করে জমার স্লিপ সংগ্রহে রাখা।
জমির যাবতীয় কাগজপত্র ও খতিয়ান হালনাগাদ (Update) রাখা।
জনসচেতনতা বৃদ্ধি জরুরি
সরকারের এই নতুন নিয়ম সম্পর্কে এখনো দেশের সিংহভাগ সাধারণ ভূমি মালিক সম্পূর্ণ অন্ধকার বা অসচেতন রয়েছেন। আইন বাস্তবায়নের শুরুতে যাতে কোনো সাধারণ নাগরিক হয়রানি বা আইনি মারপ্যাঁচে না পড়েন, সেজন্য সরকারের পাশাপাশি নাগরিক সমাজ ও সচেতন মহলকে এই তথ্য ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। একটি ছোট অসচেতনতার কারণে যেন কারো বৈধ জমির অধিকার বা জরুরি নামজারির কাজ আটকে না যায়, সেদিকে সবার লক্ষ্য রাখা উচিত।
