আজকের খবর ২০২৬

জমির অগ্রক্রয় (প্রি-এমশন) মামলা কী? কখন করা যায়, কত সময়ের মধ্যে এবং কী কী শর্ত মানতে হয়

জমি সংক্রান্ত বিরোধ বাংলাদেশে অন্যতম সাধারণ আইনি সমস্যার মধ্যে একটি। বিশেষ করে যৌথ মালিকানার (শরিকানা) জমি অন্য কোনো ব্যক্তি বা বহিরাগত ক্রয় করলে প্রায়ই “অগ্রক্রয়” বা প্রি-এমশন (Pre-emption) মামলা নিয়ে বিরোধ দেখা দেয়। অনেকেই এটিকে ভুলবশত “জমি পেনশন মামলা” বলে উল্লেখ করলেও প্রকৃতপক্ষে এটি জমি সংক্রান্ত অগ্রক্রয় বা প্রি-এমশন মামলা, যা নির্দিষ্ট আইনি বিধানের আওতায় পরিচালিত হয়।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো সহ-শরিক বা যৌথ মালিককে না জানিয়ে কিংবা তাকে বঞ্চিত করে জমি বহিরাগত ব্যক্তির কাছে বিক্রি করা হলে নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ সাপেক্ষে সেই জমি নিজের নামে ফেরত নেওয়ার অধিকারকে অগ্রক্রয় বা প্রি-এমশন বলা হয়।

কেন করা হয় অগ্রক্রয় মামলা?

অগ্রক্রয় আইনের মূল উদ্দেশ্য হলো পারিবারিক বা শরিকানার জমিতে বহিরাগত ব্যক্তির প্রবেশ সীমিত রাখা এবং জমির যৌথ মালিকানা ও পারিবারিক স্বার্থ সংরক্ষণ করা। একই সঙ্গে জমি অতিরিক্ত খণ্ড-বিখণ্ড হওয়া থেকেও রক্ষা পায়।

কোন পরিস্থিতিতে মামলা করা যায়?

যদি কোনো সহ-শরিককে অবহিত না করে তার অংশীদারিত্বের জমি অন্য কারও কাছে বিক্রি করা হয়, তাহলে তিনি আইন অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আদালতে অগ্রক্রয় মামলা দায়ের করতে পারেন।

মামলা করার সময়সীমা

আইন অনুযায়ী সময়সীমা দুটি ক্ষেত্রে ভিন্ন হতে পারে—

  • যদি বিক্রির নোটিশ পাওয়া যায়: নোটিশ পাওয়ার তারিখ থেকে ২ মাসের মধ্যে মামলা করতে হবে।
  • যদি কোনো নোটিশ না পাওয়া যায়: দলিল নিবন্ধনের তারিখ থেকে সর্বোচ্চ ৩ বছরের মধ্যে মামলা করা যাবে।

সময়সীমা অতিক্রম করলে সাধারণত অগ্রক্রয়ের অধিকার কার্যকর থাকে না।

মামলা করতে কী কী অর্থ জমা দিতে হয়?

অগ্রক্রয় মামলা দায়েরের সময় আদালতে কিছু নির্ধারিত অর্থ জমা দিতে হয়। এর মধ্যে রয়েছে—

  • জমির বিক্রয়মূল্য বা বাজারমূল্য অনুযায়ী প্রযোজ্য অর্থ;
  • দলিলে উল্লেখিত বিক্রয়মূল্যের ২৫ শতাংশ ক্ষতিপূরণ;
  • দলিল নিবন্ধনের তারিখ থেকে মামলা দায়ের পর্যন্ত সময়ের জন্য বার্ষিক ৮ শতাংশ হারে সরল সুদ

এসব অর্থ আদালতে জমা দেওয়া অগ্রক্রয় মামলার একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি শর্ত।

কৃষি ও অকৃষি জমির ক্ষেত্রে ভিন্ন আইন

জমির ধরন অনুযায়ী অগ্রক্রয়ের আইনও আলাদা।

কৃষি জমির ক্ষেত্রে অগ্রক্রয় মামলা পরিচালিত হয় ভূমি সংস্কার আইন, ১৯৫০ (State Acquisition and Tenancy Act)-এর ৯৬ ধারা অনুযায়ী।

অন্যদিকে অকৃষি জমির ক্ষেত্রে, বিশেষ করে পৌরসভা বা মহানগর এলাকার জমির জন্য অকৃষি প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৪৯-এর ২৪ ধারা অনুযায়ী মামলা পরিচালিত হয়।

বিরোধ দেখা দিলে কী করবেন?

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, জমি নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে প্রথমেই সংশ্লিষ্ট জমির—

  • দলিল,
  • খতিয়ান,
  • নামজারি,
  • মালিকানার অন্যান্য প্রমাণপত্র

সংগ্রহ করে অভিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া উচিত। প্রয়োজন হলে ভূমি-রাজস্ব সংক্রান্ত অনলাইন সেবার মাধ্যমেও মামলার অগ্রগতি ও প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করা যেতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ

আইনজীবীরা বলছেন, অগ্রক্রয় মামলা একটি সময়সীমা নির্ভর আইনি প্রতিকার। তাই জমি বিক্রির তথ্য জানার পর দেরি না করে আইন অনুযায়ী দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে জমি কেনাবেচার আগে ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়েরই মালিকানা, শরিকানা এবং প্রযোজ্য আইন সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া উচিত, যাতে ভবিষ্যতে দীর্ঘমেয়াদি আইনি জটিলতায় পড়তে না হয়।

উল্লেখ্য, প্রতিটি মামলার বাস্তব পরিস্থিতি ও নথিপত্র ভিন্ন হতে পারে। তাই অগ্রক্রয় মামলা দায়েরের আগে সংশ্লিষ্ট আইন ও সর্বশেষ বিচারিক সিদ্ধান্ত বিবেচনা করে অভিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া বাঞ্ছনীয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *