সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বহুল প্রতীক্ষিত নবম জাতীয় বেতন কাঠামো (৯ম পে স্কেল) বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া এখন শেষ ধাপে পৌঁছেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, সচিব কমিটির কারিগরি পর্যালোচনা, মন্ত্রিসভার অনুমোদন এবং আইনি ভেটিং শেষে আগামী আগস্ট মাসের মাঝামাঝি নতুন পে স্কেলের গেজেট প্রকাশ হতে পারে। যদিও গেজেট প্রকাশের সময় আগস্ট ধরা হচ্ছে, তবে নতুন বেতন কাঠামো ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকেই কার্যকর হিসেবে গণ্য করার পরিকল্পনা রয়েছে।
চূড়ান্ত পর্যায়ে প্রশাসনিক প্রক্রিয়া
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত ইতোমধ্যে নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বাধীন সচিব কমিটি প্রস্তাবের বিভিন্ন কারিগরি ও প্রশাসনিক বিষয় পর্যালোচনা করছে। আগামী দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে এই পর্যালোচনার কাজ শেষ হতে পারে বলে জানা গেছে।
এরপর সচিব কমিটির সুপারিশ চলতি মাসের শেষ দিকে অথবা আগস্টের প্রথম সপ্তাহে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে উপস্থাপন করা হবে। ওই বৈঠকে নতুন বেতন কাঠামোর রূপরেখা, বাস্তবায়নের সময়সূচি এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক নির্দেশনা নিয়ে সিদ্ধান্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
অনুমোদনের পর কী হবে?
মন্ত্রিসভার অনুমোদন পাওয়ার পর প্রস্তাবটি আইনি ভেটিংয়ের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। সেখানে প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই সম্পন্ন হলে প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের পর অর্থ মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিক গেজেট প্রকাশ করবে। এরপর নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো প্রয়োজনীয় নির্দেশনা জারি করবে এবং সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন পুনর্নির্ধারণের কাজ শুরু হবে।
১ জুলাই থেকেই কার্যকারিতা
প্রশাসনিক আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হতে কিছুটা সময় লাগলেও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, নতুন পে স্কেলের কার্যকারিতা ১ জুলাই ২০২৬ থেকেই গণনা করা হবে। অর্থাৎ গেজেট আগস্টে প্রকাশ হলেও কার্যকর হওয়ার তারিখ পিছিয়ে যাবে না। ফলে গেজেট প্রকাশের পর কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বিধি অনুযায়ী প্রাপ্য বকেয়া বেতন ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধা পেতে পারেন।
বেতন কমিশনের সুপারিশ
২০২৫ সালে গঠিত জাতীয় বেতন কমিশন সরকারি কর্মচারীদের মূল বেতন ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির সুপারিশ করেছিল। কমিশনের প্রস্তাবে বলা হয়েছিল—
- সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করা হয়।
- সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়।
তবে বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা, মূল্যস্ফীতি, বাজেট সক্ষমতা এবং সামগ্রিক আর্থিক পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকার কমিশনের সুপারিশের আলোকে একটি সংশোধিত খসড়া প্রস্তুত করছে বলে জানা গেছে।
উচ্চপর্যায়ের কমিটির ভূমিকা
মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বে গঠিত ১০ সদস্যের উচ্চপর্যায়ের পর্যালোচনা কমিটি জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশগুলো বিশ্লেষণ করে বাস্তবসম্মত মতামত প্রস্তুত করছে। এই কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতেই মন্ত্রিসভা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে এবং পরবর্তী প্রশাসনিক কার্যক্রম এগিয়ে যাবে।
কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রত্যাশা
প্রায় এক যুগ পর নতুন জাতীয় বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়ায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ব্যাপক প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি এবং বিদ্যমান বেতন কাঠামোর সঙ্গে বাস্তবতার ব্যবধান কমাতে নতুন পে স্কেল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, গেজেট প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত বেতন বৃদ্ধি, গ্রেড কাঠামো, ভাতা বা অন্যান্য সুবিধা সম্পর্কে কোনো বিষয়ই চূড়ান্ত বলে ধরে নেওয়া উচিত নয়। সরকারিভাবে গেজেট প্রকাশের পরই নতুন জাতীয় বেতন কাঠামোর পূর্ণাঙ্গ রূপ, বেতন হার, বাস্তবায়ন পদ্ধতি এবং সংশ্লিষ্ট সব নির্দেশনা স্পষ্ট হবে।
সংক্ষেপে
- নবম জাতীয় পে স্কেল বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া শেষ ধাপে।
- সচিব কমিটির পর্যালোচনার পর বিষয়টি যাবে মন্ত্রিসভায়।
- অনুমোদনের পর হবে আইনি ভেটিং ও প্রধানমন্ত্রীর সম্মতি।
- আগস্টের মাঝামাঝি গেজেট প্রকাশের সম্ভাবনা রয়েছে।
- কার্যকারিতা ধরা হচ্ছে ১ জুলাই ২০২৬ থেকে।
- গেজেট প্রকাশের পর প্রাপ্য বকেয়া আর্থিক সুবিধা পরিশোধের সুযোগ তৈরি হতে পারে, যদি চূড়ান্ত বিধানে সে ব্যবস্থা রাখা হয়।
