আজকের খবর ২০২৬

যৌতুকের মামলায় নতুন নিয়ম, আগে লিগ্যাল এইডে মধ্যস্থতা—তারপর আদালত

যৌতুকসংক্রান্ত বিরোধে সরাসরি আদালতে মামলা করার সুযোগে নতুন পরিবর্তন এসেছে। যৌতুক নিরোধ আইন, ২০১৮-এর ৩ ও ৪ ধারার অভিযোগের ক্ষেত্রে নির্ধারিত এলাকায় আদালতে মামলা দায়েরের আগে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসে মামলাপূর্ব বাধ্যতামূলক মধ্যস্থতার উদ্যোগ নিতে হবে। অর্থাৎ, অভিযোগ উঠলেই সরাসরি আদালতে মামলা করার পরিবর্তে প্রথমে লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির চেষ্টা করতে হবে। মধ্যস্থতা ব্যর্থ হলে এরপর আদালতে মামলা করার সুযোগ থাকবে।

সাম্প্রতিক সময়ে বিচারব্যবস্থার ওপর মামলার চাপ কমানো এবং দ্রুত ও কম খরচে বিরোধ নিষ্পত্তির লক্ষ্যে সরকার মামলাপূর্ব বাধ্যতামূলক মধ্যস্থতা বা প্রি-কেস মেডিয়েশন কার্যক্রম সম্প্রসারণ করছে। এর আওতায় যৌতুক নিরোধ আইনের ৩ ও ৪ ধারার অভিযোগও রাখা হয়েছে।

কী পরিবর্তন হলো?

নতুন ব্যবস্থার মূল বিষয় হলো—যৌতুকের অভিযোগ থাকলেই প্রথম ধাপে আদালতে মামলা নয়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা ভুক্তভোগীকে আগে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসে মধ্যস্থতার জন্য আবেদন করতে হবে। সেখানে উভয় পক্ষকে নিয়ে বিরোধের বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করা হবে।

মধ্যস্থতার মাধ্যমে সমঝোতা হলে আদালতে নতুন করে মামলা করার প্রয়োজন নাও হতে পারে। আর সমঝোতা না হলে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ হিসেবে আদালতে মামলা করার পথ খোলা থাকবে। লিগ্যাল এইড অফিস নিজে আদালতের মতো মামলার বিচার করে না; মধ্যস্থতার ফলাফল সংশ্লিষ্ট আদালতে জানানো হয় এবং আইন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

কোন অভিযোগগুলো এর আওতায়?

যৌতুক নিরোধ আইন, ২০১৮-এর ধারা ৩ যৌতুক দাবি করার শাস্তির সঙ্গে সম্পর্কিত। আর ধারা ৪ যৌতুক দেওয়া, নেওয়া বা এ-সংক্রান্ত কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পর্কিত। এই দুই ধারার অভিযোগই মামলাপূর্ব মধ্যস্থতার আওতায় আনা হয়েছে।

ফলে যৌতুক নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হলে সংশ্লিষ্ট পক্ষকে প্রথমে লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে আলোচনার সুযোগ নিতে হবে—এটাই নতুন ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ দিক।

তবে কি দেশের সব আদালতেই সরাসরি মামলা বন্ধ?

এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এটি এমন নয় যে দেশের সব আদালতে সব ধরনের যৌতুকের মামলা সরাসরি করা একেবারে বন্ধ হয়ে গেছে। মামলাপূর্ব বাধ্যতামূলক মধ্যস্থতার ব্যবস্থা ধাপে ধাপে নির্দিষ্ট জেলা ও নির্ধারিত আইনি বিধানের আওতায় কার্যকর করা হচ্ছে।

২০২৬ সালের ২১ জুলাই আরও ১০ জেলায় এই কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হয়েছে। নতুন করে যুক্ত হওয়া জেলাগুলো হলো—বগুড়া, ঠাকুরগাঁও, পটুয়াখালী, ভোলা, নাটোর, যশোর, শরীয়তপুর, কক্সবাজার, পঞ্চগড় ও টাঙ্গাইল। এসব জেলায় নির্ধারিত সাতটি আইনের ক্ষেত্রে আদালতে মামলা করার আগে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসে মধ্যস্থতার উদ্যোগ নেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

এর আগে আরও কয়েকটি জেলায় একই ধরনের ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল। ফলে এখন বিষয়টি ধাপে ধাপে আরও বিস্তৃত হচ্ছে।

কেন এই ব্যবস্থা?

সরকারের অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে আদালতে নতুন মামলার প্রবাহ কমানো এবং দীর্ঘদিনের মামলাজট মোকাবিলা করা। আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান জানিয়েছেন, দেশে প্রায় ৪৫ লাখ মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে মামলা আদালতে যাওয়ার আগেই আলোচনার মাধ্যমে নিষ্পত্তির সুযোগ তৈরি হলে বিচারপ্রার্থীদের সময়, অর্থ ও ভোগান্তি কমতে পারে।

পাইলট প্রকল্পের ফলাফলও এ উদ্যোগের পক্ষে ইতিবাচক চিত্র তুলে ধরেছে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি-মে সময়ের সঙ্গে ২০২৬ সালের একই সময়ের তুলনায় ২০টি জেলায় বিভিন্ন আইনে নতুন মামলা দায়েরের সংখ্যা গড়ে ৬২ দশমিক ০২ শতাংশ কমেছে বলে আইনমন্ত্রী জানিয়েছেন।

এর মধ্যে যৌতুক নিরোধ আইনের মামলা ৫ হাজার ৬০৫টি থেকে কমে ১ হাজার ৮১০টিতে নেমেছে। অর্থাৎ, এ ক্ষেত্রে মামলা দায়েরের সংখ্যা প্রায় ৬৭ দশমিক ৭১ শতাংশ কমেছে

সমঝোতা হলে কী হবে?

লিগ্যাল এইডের মধ্যস্থতায় দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা হলে সেটি নির্ধারিত আইনগত প্রক্রিয়ায় প্রত্যায়িত হতে পারে। সংশ্লিষ্ট বিধান অনুযায়ী চিফ লিগ্যাল এইড অফিসার কর্তৃক প্রত্যায়িত মধ্যস্থতা চুক্তি চূড়ান্ত, কার্যকর ও পক্ষগুলোর জন্য বাধ্যতামূলক হওয়ার বিধান রয়েছে এবং তা আদালতের ডিক্রি বা চূড়ান্ত আদেশ হিসেবে গণ্য হতে পারে।

তবে মধ্যস্থতার উদ্দেশ্য কোনো গুরুতর অপরাধকে আড়াল করা নয়। গুরুতর ও অমীমাংসাযোগ্য অপরাধ—যেমন হত্যা, ধর্ষণ বা নির্দিষ্ট গুরুতর অপরাধ—এই ধরনের মধ্যস্থতার আওতার বাইরে রাখা হয়েছে।

ভুক্তভোগীদের জন্য কী জানা জরুরি?

নতুন ব্যবস্থায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো লিগ্যাল এইডে যাওয়ার অর্থ এই নয় যে ভুক্তভোগীর আদালতে যাওয়ার অধিকার শেষ হয়ে গেছে। বরং নির্ধারিত ক্ষেত্রে আদালতে যাওয়ার আগে মধ্যস্থতার একটি বাধ্যতামূলক ধাপ যুক্ত হয়েছে। মধ্যস্থতা সফল না হলে আইন অনুযায়ী পরবর্তী সময়ে আদালতে মামলা করা যাবে।

অন্যদিকে, লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে মধ্যস্থতা সরকারের অর্থায়নে পরিচালিত হওয়ায় আর্থিকভাবে অসচ্ছল ও প্রান্তিক মানুষের জন্য এটি তুলনামূলক কম ব্যয়ে বিরোধ নিষ্পত্তির সুযোগ তৈরি করতে পারে। আইনমন্ত্রীও গণমাধ্যমকে এ কার্যক্রম সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করার আহ্বান জানিয়েছেন।

মামলাজট কমানোর নতুন কৌশল

বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে, আদালতে মামলা যাওয়ার আগেই সমঝোতার সুযোগ তৈরি করা গেলে ছোট ও আলোচনার মাধ্যমে নিষ্পত্তিযোগ্য বিরোধের ক্ষেত্রে দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া এড়ানো সম্ভব। তবে একই সঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে, মধ্যস্থতার নামে যেন কোনো ভুক্তভোগীকে তার আইনগত অধিকার থেকে বঞ্চিত করা না হয় এবং জোরপূর্বক সমঝোতার পরিবেশ তৈরি না হয়।

সরকারের সাম্প্রতিক উদ্যোগে সেই ভারসাম্য কতটা বজায় থাকে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ। কারণ যৌতুকের মতো সামাজিক ও পারিবারিক বিরোধে একদিকে দ্রুত সমাধান প্রয়োজন, অন্যদিকে ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার ও স্বাধীনভাবে আইনি প্রতিকার পাওয়ার অধিকারও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

সব মিলিয়ে, যৌতুক নিরোধ আইনের ৩ ও ৪ ধারার অভিযোগে নির্ধারিত এলাকায় এখন আদালতে যাওয়ার আগে লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে মধ্যস্থতার ধাপ পার হতে হবে। মধ্যস্থতায় সমাধান না হলে আদালতে মামলা করার সুযোগ থাকবে। সরকারের লক্ষ্য—মামলার সংখ্যা ও বিচারপ্রার্থীর ভোগান্তি কমিয়ে দ্রুত, সহজ ও জনবান্ধব বিচারব্যবস্থা গড়ে তোলা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *