পে স্কেল নিউজ ২০২৬

নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নে খসড়া প্রস্তাব চূড়ান্ত, ২০২৮ সালের মধ্যে পুরো কাঠামো কার্যকরের লক্ষ্য

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বহুল প্রতীক্ষিত নবম জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়নের খসড়া প্রস্তাবনা নীতিগতভাবে চূড়ান্ত করেছে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বাধীন কমিটি। প্রস্তাব অনুযায়ী, চলতি বছরের জুলাই থেকেই নতুন বেতন কাঠামোর আংশিক বাস্তবায়ন শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। এরপর ধাপে ধাপে বেতন কাঠামোর বাকি অংশ কার্যকর করে ২০২৮ সালের জানুয়ারির মধ্যে পুরো পে-স্কেল বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

তবে নতুন পে-স্কেল ঠিক কত ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে, সেটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার মন্ত্রিসভার। বুধবার (১২ আগস্ট) সচিবদের কমিটির বৈঠকে খসড়া প্রস্তাবটি মন্ত্রিসভায় উপস্থাপনের জন্য নীতিগতভাবে চূড়ান্ত করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

কমিটির একজন সদস্যের ভাষ্য অনুযায়ী, বাস্তবায়নের ধাপসংখ্যা নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত মন্ত্রিসভাই নেবে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তাও বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

জুলাই থেকেই আংশিক বাস্তবায়নের পরিকল্পনা

নতুন প্রস্তাবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—২০২৬ সালের জুলাই থেকে পে-স্কেলের বাস্তবায়ন শুরু করার পরিকল্পনা। তবে পুরো বেতন কাঠামো একবারে কার্যকর না করে পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের প্রস্তাব করা হয়েছে।

খসড়া পরিকল্পনা অনুযায়ী, চলতি অর্থবছর থেকে বর্ধিত বেতনের একটি অংশ কার্যকর হতে পারে। এরপর সরকারি আর্থিক সক্ষমতা, রাজস্ব পরিস্থিতি এবং অতিরিক্ত ব্যয়ের বিষয় বিবেচনা করে পরবর্তী ধাপগুলো বাস্তবায়ন করা হবে। লক্ষ্য হলো ২০২৮ সালের জানুয়ারির মধ্যে নতুন কাঠামোর পূর্ণ বাস্তবায়ন সম্পন্ন করা।

এ ধরনের ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনার পেছনে মূল কারণ হিসেবে সরকারের আর্থিক সক্ষমতা ও বিপুল অতিরিক্ত ব্যয়ের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। এর আগে পে-স্কেল বাস্তবায়ন নিয়ে আলোচনায়ও একসঙ্গে পুরো বেতন বৃদ্ধি করলে সরকারি ব্যয়ের ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা উঠে এসেছে।

মন্ত্রিসভার অনুমোদনের অপেক্ষা

সচিব কমিটির প্রস্তাব চূড়ান্ত হলেও এটিকে এখনো চূড়ান্ত সরকারি সিদ্ধান্ত হিসেবে ধরা যাচ্ছে না। কারণ, খসড়া প্রস্তাবটি মন্ত্রিসভায় উপস্থাপনের পর প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তন, সংযোজন বা বিয়োজন করা হতে পারে।

বিশেষ করে কত ধাপে বেতন বৃদ্ধি কার্যকর হবে, কোন গ্রেডে কত শতাংশ বাড়বে এবং কোন ভাতা কখন কার্যকর হবে—এসব বিষয়ে মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

এরপর মন্ত্রিসভার অনুমোদনের ভিত্তিতে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে প্রয়োজনীয় প্রজ্ঞাপন বা গেজেট জারি করা হবে। অর্থাৎ সচিব কমিটির খসড়া চূড়ান্ত হওয়া গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হলেও এখনো কয়েকটি প্রশাসনিক ও নীতিগত ধাপ বাকি রয়েছে।

এর আগেও সচিব কমিটির বৈঠকে নতুন বেতন কাঠামো নিয়ে গ্রেডভিত্তিক বেতন বৃদ্ধি, ভাতা, পেনশন এবং নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের তুলনামূলক বেশি সুবিধা দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।

নিম্ন গ্রেডে বেশি বেতন বাড়ানোর পরিকল্পনা

নবম পে-স্কেলের আলোচনায় এবার বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে নিম্ন গ্রেডের সরকারি কর্মচারীরা। উচ্চ গ্রেডের কর্মকর্তা ও নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির হার সমান না রেখে নিম্ন গ্রেডে তুলনামূলক বেশি সুবিধা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক অতিরিক্ত সচিব ফিরোজ মিয়া মনে করেন, নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের বেতন ধাপে ধাপে না বাড়িয়ে একবারে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হলে তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় সামাল দেওয়া সহজ হবে। তার মতে, উচ্চ গ্রেডের কর্মকর্তারা মূল বেতনের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের সুযোগ-সুবিধা পেয়ে থাকেন; কিন্তু নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের আর্থিক চাপ তুলনামূলক বেশি।

এর আগে সচিব কমিটির আলোচনাতেও নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের বেশি সুবিধা দেওয়ার নীতিগত অবস্থান উঠে এসেছিল। একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, ১ থেকে ৯ম গ্রেড পর্যন্ত বেতন বৃদ্ধির হার ৬০–৭০ শতাংশ এবং ১০ম থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত ৯০–১০০ শতাংশ পর্যন্ত হওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়েছিল।

তবে এগুলো এখনো চূড়ান্ত অনুমোদিত বেতনহার নয়। মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তের পরই কোন গ্রেডে কত বেতন নির্ধারিত হবে তা নিশ্চিত হবে।

সর্বনিম্ন বেতন ২০ হাজার, সর্বোচ্চ ১ লাখ ৬০ হাজার টাকার প্রস্তাব

জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মূল বেতন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছিল। আলোচিত প্রস্তাব অনুযায়ী, বর্তমান সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার সুপারিশ রয়েছে।

অর্থাৎ সর্বনিম্ন বেতনের ক্ষেত্রে বৃদ্ধি দাঁড়ায় প্রায় ১৪২ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ বেতনের ক্ষেত্রে প্রায় ১০৫ শতাংশ।

তবে কমিশনের সুপারিশ আর সরকারের চূড়ান্ত বেতন কাঠামো এক বিষয় নয়। সরকার ইতোমধ্যে এসব সুপারিশ পর্যালোচনা করে বাস্তবায়নযোগ্য কাঠামো তৈরির কাজ করছে। ফলে শেষ পর্যন্ত বেতনহার কমিশনের সুপারিশের তুলনায় কম বা বেশি হতে পারে।

বিচার বিভাগ নিয়ে আলাদা জটিলতা

নবম পে-স্কেল চূড়ান্ত করার শেষ পর্যায়ে বিচার বিভাগ-সংক্রান্ত কিছু জটিলতা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। এসব বিষয় সমাধানের জন্য গত ৬ আগস্ট অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে সাত সদস্যের একটি মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করা হয়েছে।

বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন কাঠামো এবং নতুন পে-স্কেলের সঙ্গে তাদের কাঠামোগত সামঞ্জস্য কীভাবে করা হবে—এসব বিষয় ওই কমিটির আলোচনায় আসতে পারে।

বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) অর্থ মন্ত্রণালয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। কমিটির সুপারিশের পর পে-স্কেলের চূড়ান্ত খসড়া মন্ত্রিসভায় উপস্থাপনের প্রক্রিয়া এগোবে।

২০২৮ সালের জানুয়ারির মধ্যে পুরো বাস্তবায়ন

বর্তমান খসড়া প্রস্তাবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বাস্তবায়নের সময়সীমা। একবারে পুরো পে-স্কেল কার্যকর করার পরিবর্তে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের মাধ্যমে সরকারি ব্যয়ের চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

প্রস্তাবটি মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত হলে ২০২৬ সালের জুলাই থেকে আংশিক বাস্তবায়ন শুরু হতে পারে। এরপর পর্যায়ক্রমে বাকি বেতন বৃদ্ধি ও সংশ্লিষ্ট সুবিধা কার্যকর করে ২০২৮ সালের জানুয়ারির মধ্যে পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন সম্পন্ন করার লক্ষ্য থাকবে।

তবে বাস্তবায়নের সুনির্দিষ্ট ধাপ, প্রতিটি ধাপে কত শতাংশ বেতন বাড়বে এবং কোন সময়ে কোন ভাতা কার্যকর হবে—এসব এখনো মন্ত্রিসভার অনুমোদনের ওপর নির্ভর করছে।

আগে থেকেই ছিল অর্থনৈতিক চাপের প্রশ্ন

নবম পে-স্কেল বাস্তবায়ন নিয়ে এর আগেও সরকারের সামনে বড় আর্থিক প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। জুলাইয়ের শেষ দিকে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে সরকারের ঋণ কর্মসূচির আলোচনার প্রেক্ষাপটে নতুন পে-স্কেলের অতিরিক্ত ব্যয় নিয়ে সতর্কতা তৈরি হয়েছে।

২৮ জুলাই প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, রাজস্ব ঘাটতি ও দুর্বল রাজস্ব আহরণের কারণে আইএমএফ নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন অন্তত দুই বছর পিছিয়ে দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে এবং অক্টোবরে ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার ফলাফলের ওপর সিদ্ধান্ত অনেকটা নির্ভর করতে পারে।

এ কারণে বর্তমান খসড়ায় ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলার একটি সম্ভাব্য পথ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

২০১৫ সালের পর প্রথম বড় পরিবর্তনের অপেক্ষা

বাংলাদেশে সর্বশেষ জাতীয় পে-স্কেল কার্যকর হয়েছিল ২০১৫ সালে। এরপর সরকারি চাকরিজীবীদের মূল বেতন নির্ধারিত হারে প্রতিবছর বাড়লেও নতুন জাতীয় বেতন কাঠামো ঘোষণা হয়নি।

এ সময়ে মূল্যস্ফীতি, খাদ্য, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা ও পরিবহনসহ জীবনযাত্রার বিভিন্ন খাতে ব্যয় বেড়েছে। ফলে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে নতুন পে-স্কেলের দাবি দীর্ঘদিন ধরেই জোরালো ছিল।

২০২৫ সালে গঠিত জাতীয় বেতন কমিশন পরে বেতন-ভাতা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর সুপারিশ করে। কমিশনের সুপারিশ পর্যালোচনার জন্য পরবর্তী সময়ে সচিব পর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়। সেই পর্যালোচনা প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতায় এখন খসড়া প্রস্তাব মন্ত্রিসভায় তোলার পর্যায়ে এসেছে।

এখন কী হতে পারে

সব মিলিয়ে নবম জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বর্তমানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তিনটি ধাপ হলো—বিচার বিভাগ-সংক্রান্ত জটিলতার সমাধান, মন্ত্রিসভার অনুমোদন এবং পরবর্তী গেজেট/প্রজ্ঞাপন জারি

সচিব কমিটির খসড়া প্রস্তাব নীতিগতভাবে চূড়ান্ত হওয়ায় পে-স্কেল বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে। তবে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য মূল প্রশ্ন এখন—মন্ত্রিসভা শেষ পর্যন্ত কত শতাংশ বেতন বাড়ানোর অনুমোদন দেয় এবং কয় ধাপে তা কার্যকর করে।

বর্তমান প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে ২০২৬ সালের জুলাই থেকে আংশিক সুবিধা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে এবং ২০২৮ সালের জানুয়ারির মধ্যে পুরো নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর করার লক্ষ্য থাকবে। তবে মন্ত্রিসভার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও সরকারি প্রজ্ঞাপন প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত প্রস্তাবিত বেতনহার ও বাস্তবায়নসূচিকে চূড়ান্ত হিসেবে গণ্য করা যাবে না

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *