সরকারি চাকুরিজীবীদের জন্য ‘নৈমিত্তিক ছুটি’ একটি সাধারণ বিষয় মনে হলেও এর পেছনে রয়েছে সুনির্দিষ্ট আইনি কাঠামো ও সীমাবদ্ধতা। বাংলাদেশ চাকরি বিধিমালা (BSR) অনুযায়ী, নৈমিত্তিক ছুটি কোনো স্বীকৃত ছুটি নয় এবং এই ছুটিতে থাকাকালীন কর্মস্থল ত্যাগের ক্ষেত্রে রয়েছে কঠোর বিধিনিষেধ। বিশেষ করে, নৈমিত্তিক ছুটিতে থাকা অবস্থায় কোনো অবস্থাতেই বিদেশে গমন করা যাবে না।
নৈমিত্তিক ছুটি কেন স্বীকৃত ছুটি নয়?
বাংলাদেশ সার্ভিস রুলস (BSR) এর প্রথম খণ্ডের ১৯৫ নম্বর বিধির নোট-২ অনুযায়ী, নৈমিত্তিক ছুটি ভোগকালীন সময়ে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীকে ‘ডিউটি’ বা ‘কর্মরত’ হিসেবে গণ্য করা হয়। যেহেতু এই সময়ে তিনি অফিশিয়ালি ছুটিতে নেই বরং বিশেষ প্রয়োজনে কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার অনুমতি পেয়েছেন মাত্র, তাই এর জন্য কোনো যোগদানের পত্র (Joining Letter) দাখিল করতে হয় না।
বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা ও আইনি কারণ
সরবরাহকৃত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, নৈমিত্তিক ছুটির মৌলিক কিছু শর্ত বিদেশ গমনের সম্পূর্ণ পরিপন্থী:
বিদেশে গমন নিষিদ্ধ: বিধিমালার ৯ নম্বর অনুচ্ছেদে স্পষ্ট বলা হয়েছে, “নৈমিত্তিক ছুটিতে থাকার সময়ে বিদেশে গমন করা যাইবে না।” এটি একটি নিরঙ্কুশ নিষেধাজ্ঞা।
৪৮ ঘণ্টার বাধ্যবাধকতা: বিধিমালার ৭ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সদর দপ্তর ত্যাগের অনুমতি থাকলেও সংশ্লিষ্ট কর্মচারীকে এমন দূরত্বে থাকতে হবে যাতে জরুরি তলব পাওয়া মাত্র সর্বোচ্চ ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তিনি কাজে যোগ দিতে পারেন। বিদেশ ভ্রমণে এই শর্ত পূরণ করা প্রায় অসম্ভব বিধায় এটি নিষিদ্ধ।
বিশেষ পরিস্থিতি ব্যতীত নিরুৎসাহিতকরণ: সরকারি কাজে বা প্রশিক্ষণে বিদেশে অবস্থানরত কর্মকর্তাদেরও নৈমিত্তিক ছুটি প্রদানে নিরুৎসাহিত করা হয়। বিশেষ পরিস্থিতিতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সুনির্দিষ্ট প্রজ্ঞাপন (১৯৮২ ও ১৯৯৪ সালের আদেশ) সাপেক্ষে এটি বিবেচনা করা হতে পারে, যা সাধারণ কর্মীদের জন্য প্রযোজ্য নয়।
নৈমিত্তিক ছুটির গুরুত্বপূর্ণ নিয়মাবলী
১. বার্ষিক কোটা: একজন সরকারি কর্মচারী ক্যালেন্ডার বছরে মোট ২০ দিন নৈমিত্তিক ছুটি ভোগ করতে পারেন।
২. এককালীন সীমাবদ্ধতা: সাধারণত এক সঙ্গে ১০ দিনের বেশি নৈমিত্তিক ছুটি মঞ্জুর করা যায় না। তবে পার্বত্য জেলায় কর্মরতদের ক্ষেত্রে এক সঙ্গে ২০ দিন মঞ্জুর করা হতে পারে।
৩. ছুটি সংযুক্তি: ছুটির আগে বা পরে সাপ্তাহিক বা সরকারি ছুটি সংযুক্ত করতে হলে সুনির্দিষ্ট অনুমতির প্রয়োজন হয়। অনুমতি ছাড়া সংযুক্ত করলে ওই সরকারি ছুটির দিনগুলোও নৈমিত্তিক ছুটির অংশ হিসেবে গণ্য হবে।
৪. ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা: এই ছুটিতে থাকাকালীন কোনো বদলি ব্যবস্থা থাকে না। ফলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার অনুপস্থিতিতে যদি জনস্বার্থ বিঘ্নিত হয়, তবে ছুটি গ্রহণকারী এবং মঞ্জুরকারী উভয়ই দায়ী থাকবেন।
উপসংহার
নৈমিত্তিক ছুটি মূলত হঠাৎ উদ্ভূত সমস্যা যেমন—সামান্য অসুস্থতা (জ্বর, সর্দি) বা জরুরি পারিবারিক প্রয়োজনে ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত। যেহেতু এই ছুটিতে থাকাকালীন সময়ে কর্মচারীকে ‘অন ডিউটি’ গণ্য করা হয়, তাই অনুমতি ব্যতিরেকে সদর দপ্তর ত্যাগ বা দেশের বাইরে যাওয়া সম্পূর্ণ বিধি বহির্ভূত। বিদেশ ভ্রমণের প্রয়োজন হলে লিয়েন, অর্জিত ছুটি বা বহিঃবাংলাদেশ ছুটির জন্য আবেদন করাই বিধিসম্মত।
