দীর্ঘ এক দশকের অপেক্ষার পর অবশেষে আলোর মুখ দেখতে পাচ্ছে নবম জাতীয় বেতন কাঠামো। ২০১৫ সালে অষ্টম পে স্কেল কার্যকর হওয়ার পর থেকে সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা নতুন বেতন কাঠামোর অপেক্ষায় ছিলেন। করোনা মহামারি এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের কারণে বারবার পিছিয়ে যাওয়া এই প্রক্রিয়া এখন সুনির্দিষ্ট রূপ নিচ্ছে বলে সচিবালয়ের একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করেছে।
উচ্চপর্যায়ের কমিটিতে চলছে চূড়ান্ত পর্যালোচনা
সরকারের নীতিনির্ধারণী মহলের সূত্রমতে, নবম পে স্কেল প্রণয়নের লক্ষ্যে গঠিত ১০ সদস্যের একটি বিশেষ উচ্চপর্যায়ের কমিটি বর্তমানে পূর্ণ গতিতে কাজ করছে। কমিটিটি বিভিন্ন সুপারিশ এবং আর্থিক দিকসমূহ বিশ্লেষণ করে চূড়ান্ত মতামত তৈরির কাজ করে যাচ্ছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং চলমান মুদ্রাস্ফীতির সঙ্গে সংগতি রেখে সরকারি কর্মচারীদের জীবনমান উন্নয়নের বিষয়টিকে কমিটিতে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে। সচিবালয় সূত্র আরও জানিয়েছে, কমিটি অচিরেই তাদের পূর্ণাঙ্গ সুপারিশমালা সরকারের কাছে পেশ করবে।
প্রস্তাবিত বেতন কাঠামোর সম্ভাব্য খসড়া
সরকারি মহলে ঘুরছে একটি প্রাথমিক খসড়ার কথা, যা নিয়ে ইতিমধ্যেই ব্যাপক কৌতূহল ও আলোচনার জন্ম হয়েছে। যদিও এটি এখনো চূড়ান্ত নয়, তবে সম্ভাব্য বেতন কাঠামোর তালিকাটি নিম্নরূপ:
| গ্রেড | প্রস্তাবিত বেতন স্কেল (টাকা) |
|---|---|
| ০১ | ১,৬০,০০০/- (নির্ধারিত) |
| ০২ | ১,৩২,০০০ – ১,৫৩,০০০ |
| ০৩ | ১,১৩,০০০ – ১,৪৮,৮০০ |
| ০৪ | ১,০০,০০০ – ১,৪২,৪০০ |
| ০৫ | ৮৬,০০০ – ১,৩৯,৭০০ |
| ০৬ | ৭১,০০০ – ১,৩৪,০০০ |
| ০৭ | ৫৮,০০০ – ১,২৬,৮০০ |
| ০৮ | ৪৭,২০০ – ১,১৩,৭০০ |
| ০৯ | ৪৫,১০০ – ১,০৮,৮০০ |
| ১০ | ৩২,০০০ – ৭৭,৩০০ |
| ১১ | ২৫,০০০ – ৬০,৫০০ |
| ১২ | ২৪,৩০০ – ৫৮,৭০০ |
| ১৩ | ২৪,০০০ – ৫৮,০০০ |
| ১৪ | ২৩,৫০০ – ৫৬,৮০০ |
| ১৫ | ২২,৮০০ – ৫৫,২০০ |
| ১৬ | ২১,৯০০ – ৫২,৯০০ |
| ১৭ | ২১,৪০০ – ৫১,৯০০ |
| ১৮ | ২১,০০০ – ৫০,৯০০ |
| ১৯ | ২০,৫০০ – ৪৯,৬০০ |
| ২০ | ২০,০০০ – ৪৮,৪০০ |
প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী, সর্বোচ্চ গ্রেডে (গ্রেড-১) বেতন নির্ধারিত থাকবে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকায়, যেখানে সর্বনিম্ন গ্রেডে (গ্রেড-২০) ন্যূনতম বেতন শুরু হবে ২০ হাজার টাকা থেকে। মধ্যবর্তী গ্রেড-৯-এর ক্ষেত্রে বেতন ৪৫ হাজার ১০০ থেকে ১ লাখ ৮ হাজার ৮০০ টাকার মধ্যে রাখার প্রস্তাব রয়েছে।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশে প্রথম জাতীয় বেতন স্কেল কার্যকর হয়। এরপর থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত মোট আটটি বেতন কাঠামো প্রণয়ন করা হয়েছে। সাধারণত প্রতি পাঁচ বছর অন্তর নতুন পে স্কেল ঘোষণার রীতি থাকলেও ২০২০ সালের পর থেকে বৈশ্বিক মহামারি পরিস্থিতি এবং অর্থনৈতিক চাপের কারণে এই প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়।
চ্যালেঞ্জ ও প্রত্যাশা
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করা সরকারের জন্য নিঃসন্দেহে একটি বড় আর্থিক চ্যালেঞ্জ। তবে ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে সরকারি কর্মচারীদের জন্য একটি সংশোধিত বেতন কাঠামো এখন অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।
গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা
উল্লেখ্য, প্রকাশিত এই বেতন তালিকাটি সম্পূর্ণ প্রাথমিক এবং অনানুষ্ঠানিক। সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ থেকে আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন বা সরকারি গেজেট প্রকাশিত হওয়ার আগ পর্যন্ত এটি চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে না। তাই সরকারি কর্মচারীদের অনুরোধ করা হচ্ছে, কেবলমাত্র সরকারি ঘোষণার জন্য অপেক্ষা করতে এবং গুজব বা অনুমানের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত না নিতে।
নবম পে স্কেলের চূড়ান্ত ঘোষণা এলে এটি হবে বাংলাদেশের সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় আর্থিক স্বস্তির খবর।
সূত্র: সচিবালয় সংশ্লিষ্ট সূত্র ও সরকারি নীতিনির্ধারণী মহল
