আজকের খবর ২০২৬

সম্পত্তি দানের নতুন নিয়ম: মালিকানা যাবে সন্তানের কাছে, তবে আমৃত্যু ভোগ করবেন বাবা-মা

সম্পত্তি দানের ক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে বাংলাদেশে। নতুন আইনি ব্যবস্থায় বাবা-মা সন্তান বা নাতি-নাতনির নামে সম্পত্তি দান করলেও, দলিলে নির্দিষ্টভাবে জীবনকালীন ভোগাধিকার সংরক্ষণ করতে পারবেন। অর্থাৎ সম্পত্তির মালিকানা অন্যের কাছে হস্তান্তর হলেও দাতা জীবিত থাকা পর্যন্ত ওই সম্পত্তি ব্যবহার, বসবাস ও ভোগ করার অধিকার নিজের কাছে রাখতে পারবেন।

সম্প্রতি জাতীয় সংসদে ‘সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ পাস হয়েছে। এর মাধ্যমে ১৮৮২ সালের Transfer of Property Act-এ নতুন ১২২এ ও ১২২বি ধারা যুক্ত করার ব্যবস্থা করা হয়েছে। নতুন বিধানের মূল লক্ষ্য হলো নিকটাত্মীয়কে সম্পত্তি দান করার পরও দাতার জীবনকালীন নিরাপত্তা ও ভোগের অধিকার নিশ্চিত করা।

কারা কাকে এই পদ্ধতিতে সম্পত্তি দিতে পারবেন?

নতুন বিধানটি সব ধরনের ব্যক্তির মধ্যে প্রযোজ্য নয়; নির্দিষ্ট পারিবারিক সম্পর্কের মধ্যে এই সুবিধা রাখা হয়েছে। যেমন—

  • বাবা-মা সন্তানকে সম্পত্তি দান করতে পারবেন।
  • বাবা-মা নাতি-নাতনিকে সম্পত্তি দিতে পারবেন।
  • দাদা-দাদি বা নানা-নানি নাতি-নাতনিকে সম্পত্তি দিতে পারবেন।
  • সন্তান বা নাতি-নাতনিও বাবা-মা, দাদা-দাদি বা নানা-নানিকে সম্পত্তি দিতে পারবেন।
  • স্বামী ও স্ত্রী পরস্পরকে এভাবে সম্পত্তি দান করতে পারবেন।

অর্থাৎ, নতুন ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—সম্পত্তি দান করা যাবে, কিন্তু দাতা চাইলে নিজের জীবনকাল পর্যন্ত সেই সম্পত্তি ভোগ করার অধিকার সংরক্ষণ করতে পারবেন।

কীভাবে কাজ করবে নতুন ব্যবস্থা?

বিষয়টি একটি উদাহরণ দিয়ে সহজভাবে বোঝা যায়।

ধরা যাক, একজন বাবা তার একটি বাড়ি ছেলের নামে দান করলেন। দলিলে যদি জীবনকালীন ভোগাধিকার সংরক্ষণ করা হয়, তাহলে নিবন্ধনের মাধ্যমে বাড়িটির মালিকানা ছেলের কাছে চলে যাবে। কিন্তু বাবা জীবিত থাকা পর্যন্ত ওই বাড়িতে বসবাস বা সম্পত্তিটি ভোগ করার অধিকার রাখবেন।

অর্থাৎ এখানে ‘মালিকানা’ এবং ‘ভোগাধিকার’কে আলাদা করে দেখা হচ্ছে।

সাধারণভাবে সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে মালিকানা হস্তান্তরের সঙ্গে সম্পত্তির ওপর দাতার নিয়ন্ত্রণ বা ব্যবহারিক অধিকারও শেষ হয়ে যেতে পারে। নতুন ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট শর্তে দাতা সেই জীবনকালীন ভোগাধিকার নিজের কাছে রাখার আইনি সুযোগ পাচ্ছেন।

বৃদ্ধ বাবা-মায়ের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ?

নতুন বিধানের সবচেয়ে বড় বাস্তব গুরুত্ব দেখা যেতে পারে বৃদ্ধ বাবা-মায়ের ক্ষেত্রে।

অনেক বাবা-মা জীবদ্দশায় সন্তানদের মধ্যে সম্পত্তি ভাগ করে দিতে চান। কিন্তু সম্পত্তি পুরোপুরি সন্তানের নামে দিয়ে দেওয়ার পর ভবিষ্যতে নিজের বসবাস বা ব্যবহারিক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ থাকে।

নতুন ব্যবস্থায় বাবা-মা চাইলে সন্তানকে সম্পত্তির মালিকানা দিয়ে দিতে পারবেন, আবার দলিলে নিজের আমৃত্যু ভোগাধিকার সংরক্ষণ করতে পারবেন।

ফলে সম্পত্তি সন্তানকে দেওয়ার পরও বাবা-মায়ের বসবাস বা ভোগের অধিকার সরাসরি হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমবে। সরকারও নতুন বিধান আনার অন্যতম কারণ হিসেবে দাতার স্বার্থ ও জীবনকালীন নিরাপত্তা সুরক্ষার কথা বলেছে।

শুধু মৌখিক ঘোষণা করলেই হবে না

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, স্থাবর সম্পত্তির ক্ষেত্রে শুধু পারিবারিক সমঝোতা বা মুখে ঘোষণা করলেই এই আইনি সুবিধা কার্যকর হবে না।

এ ধরনের দান নিবন্ধিত দলিলের মাধ্যমে করতে হবে। অর্থাৎ বাড়ি, জমি বা অন্যান্য স্থাবর সম্পত্তির ক্ষেত্রে যথাযথ রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।

তাই দলিল করার সময় জীবনকালীন ভোগাধিকার সংরক্ষণের বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

গ্রহীতা আগে মারা গেলে কী হবে?

নতুন আইনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—সম্পত্তি গ্রহণকারী ব্যক্তি দাতার আগে মারা গেলেও দান বাতিল হয়ে যাবে না।

ধরা যাক, বাবা ছেলেকে সম্পত্তি দান করেছেন এবং বাবা নিজের জীবনকালীন ভোগাধিকার সংরক্ষণ করেছেন। পরে ছেলে বাবার জীবদ্দশায় মারা গেলেন।

এ অবস্থায় দানকৃত সম্পত্তি আইন অনুযায়ী ছেলের উত্তরাধিকারীদের কাছে যাবে। কিন্তু বাবা যে জীবনকালীন ভোগাধিকার সংরক্ষণ করেছিলেন, সেটি বহাল থাকবে। অর্থাৎ ছেলের উত্তরাধিকারীরা মালিক হলেও বাবা জীবিত থাকা পর্যন্ত তার সংরক্ষিত ভোগাধিকার থাকবে।

এটি নতুন বিধানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা।

দান করার পর কি ইচ্ছামতো সম্পত্তি ফিরিয়ে নেওয়া যাবে?

না। নতুন ব্যবস্থায় দান নিবন্ধনের পর দাতা একতরফাভাবে ইচ্ছামতো সম্পত্তি ফেরত নিতে পারবেন—এমন সুযোগ রাখা হয়নি।

১২২বি ধারার প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী, এ ধরনের নিবন্ধিত দান সাধারণভাবে অপরিবর্তনীয় থাকবে। তবে দাতা ও গ্রহীতা পারস্পরিক সম্মতিতে নিবন্ধিত নতুন দলিলের মাধ্যমে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে দান পরিবর্তন বা বাতিল করতে পারবেন।

যেমন—আর্থিক প্রয়োজন, চিকিৎসা, শিক্ষা, পারিবারিক প্রয়োজন বা অন্য কোনো প্রকৃত প্রয়োজন দেখা দিলে উভয়ের সম্মতিতে ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।

একজন পক্ষ সম্মতি না দিলে?

বিশেষ পরিস্থিতিতে আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার সুযোগও রাখা হয়েছে।

যদি দাতা বা গ্রহীতার একজন—

  • অপ্রাপ্তবয়স্ক হন,
  • নিখোঁজ থাকেন,
  • আইনগতভাবে অক্ষম হন,
  • মানসিকভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অবস্থায় না থাকেন,
  • অথবা অন্য কোনো যথেষ্ট কারণে সম্মতি দিতে না পারেন,

তাহলে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে জেলা জজের কাছে আবেদন করা যাবে।

আদালত প্রয়োজনীয় অনুসন্ধান ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নোটিশ দেওয়ার পর দান পরিবর্তন বা বাতিলের বিষয়ে আদেশ দিতে পারবেন। আবেদনটি সৎ উদ্দেশ্যে করা হয়েছে কি না, সেটিও বিবেচনায় নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

হেবা বা প্রচলিত দান কি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে?

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভুল ধারণা এড়িয়ে চলা দরকার। নতুন ব্যবস্থা সাধারণ দান বা মুসলিম আইনের হেবা বাতিল করছে না।

সরকারের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, জীবনকালীন ভোগাধিকার সংরক্ষণপূর্বক দান হবে সম্পত্তি হস্তান্তরের একটি পৃথক ও স্বতন্ত্র পদ্ধতি। প্রচলিত সাধারণ দান, মুসলিম আইনের হেবা কিংবা আইনসম্মত অন্যান্য সম্পত্তি হস্তান্তরের বৈধতা এতে ক্ষুণ্ন হবে না।

তবে এ নিয়ে ইসলামি আইন ও হেবা ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য নিয়ে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় মহলে প্রশ্নও উঠেছে। কিছু পক্ষের দাবি, আইনটি কার্যকর করার আগে হেবা, ফারায়েজ ও শরিয়াহ বিশেষজ্ঞদের মতামত আরও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা প্রয়োজন ছিল।

নতুন আইনের মূল পরিবর্তন এক নজরে

বিষয়নতুন ব্যবস্থায় কী হবে
সম্পত্তি দাননির্দিষ্ট নিকটাত্মীয়দের মধ্যে করা যাবে
মালিকানাগ্রহীতার কাছে হস্তান্তর হবে
দাতার ভোগাধিকারদলিলে সংরক্ষণ করা যাবে
দাতা কতদিন ভোগ করবেনজীবিত থাকা পর্যন্ত
স্থাবর সম্পত্তিনিবন্ধিত দলিল প্রয়োজন
গ্রহীতা আগে মারা গেলেতার উত্তরাধিকারীদের কাছে সম্পত্তি যাবে
দাতার ভোগাধিকারবহাল থাকবে
দান একতরফাভাবে বাতিলসাধারণভাবে করা যাবে না
পারস্পরিক সম্মতিতে পরিবর্তননিবন্ধিত দলিলে সম্ভব
বিশেষ পরিস্থিতিজেলা জজের কাছে যাওয়ার সুযোগ থাকবে

সাধারণ মানুষের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা

নতুন আইনটি অনেক পরিবারের জন্য সুবিধাজনক হলেও সম্পত্তি দানের ক্ষেত্রে দলিলের ভাষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধু সন্তানকে সম্পত্তি দিয়ে পরে মৌখিকভাবে ‘আমি জীবিত থাকা পর্যন্ত ব্যবহার করব’ বললে নতুন আইনের কাঙ্ক্ষিত সুরক্ষা পাওয়া যাবে—এমন ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।

জীবনকালীন ভোগাধিকার রাখতে চাইলে দলিল প্রস্তুতের সময় বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা, সম্পত্তির মালিকানা ও ভোগাধিকারের শর্ত পরিষ্কার করা এবং যথাযথ নিবন্ধন সম্পন্ন করা জরুরি। বাস্তব কোনো সম্পত্তি হস্তান্তরের আগে সংশ্লিষ্ট দলিল লেখক/রেজিস্ট্রেশন কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি যোগ্য আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া নিরাপদ।

সারকথা

নতুন ব্যবস্থার মূল ধারণা হলো—‘সম্পত্তি এখনই দান, কিন্তু দাতার ভোগাধিকার আমৃত্যু।’ বাবা-মা বা দাদা-দাদি-নানা-নানি সন্তান বা নাতি-নাতনির নামে সম্পত্তির মালিকানা দিয়ে দিতে পারবেন, কিন্তু দলিলে জীবনকালীন ভোগাধিকার সংরক্ষণ করলে জীবিত থাকা পর্যন্ত সেই সম্পত্তি ব্যবহার ও ভোগ করতে পারবেন। এমনকি গ্রহীতা আগে মারা গেলেও দাতার এই অধিকার বহাল থাকবে।

তবে একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা জরুরি: নতুন আইন সংসদে পাস হয়েছে; বাস্তবে কোনো নির্দিষ্ট সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে সংশোধিত আইনের কার্যকর বিধান, প্রযোজ্য নিবন্ধন প্রক্রিয়া এবং দলিলের শর্ত যাচাই করে তবেই পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। বর্তমান মূল আইনে স্থাবর সম্পত্তির দানের জন্য নিবন্ধিত দলিলের বিধান রয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *