বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘সেকশন অফিসার’ পদটি নিয়ে চাকরিপ্রত্যাশী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে আগ্রহ রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই জানতে চান—এই পদের প্রকৃত দায়িত্ব কী, কোথায় কাজ করতে হয় এবং ভবিষ্যতে পদোন্নতির সুযোগ কতটা।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, সেকশন অফিসারের কাজ শুধু সাধারণ দাপ্তরিক কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তিনি যে শাখা বা সেকশনে দায়িত্ব পালন করেন, সেই শাখার নথি, প্রশাসনিক কার্যক্রম, চিঠিপত্র, সভা, রেকর্ড এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার নির্দেশনা বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তবে দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয়, শাখা ও সংশ্লিষ্ট চাকরির বিধিমালা অনুযায়ী পরিবর্তিত হতে পারে।
সেকশন অফিসারের মূল কাজ কী?
সাধারণভাবে একজন সেকশন অফিসারের দায়িত্বকে কয়েকটি ভাগে দেখা যায়—
১. নথি ও ফাইল পরিচালনা
বিভিন্ন আবেদন, চিঠি, অফিস আদেশ, নোটশিট ও সংশ্লিষ্ট নথি গ্রহণ, যাচাই, উপস্থাপন এবং সংরক্ষণ করা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ। জরুরি ও অমীমাংসিত কাজ চিহ্নিত করে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নজরে আনাও দায়িত্বের অংশ।
২. প্রশাসনিক কাজ সম্পাদন
রেজিস্ট্রার, ডেপুটি রেজিস্ট্রার, সহকারী রেজিস্ট্রার বা সংশ্লিষ্ট শাখাপ্রধানের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রশাসনিক কার্যক্রম সম্পন্ন করতে হয়। নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি, বিভিন্ন কমিটি, অফিস আদেশ, বিজ্ঞপ্তি ইত্যাদি বিষয়েও সেকশনভেদে কাজ করতে হতে পারে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি নথিতে সেকশন অফিসারের দায়িত্বের মধ্যে নিয়োগসংক্রান্ত কাজ, সার্ভিস রুলস, কমিটির কাজ, ফাইল নোট ও প্রশাসনিক জরুরি কাজের কথা উল্লেখ রয়েছে।
৩. চিঠিপত্র ও অফিস আদেশ
অফিসে আসা ও বাইরে পাঠানো চিঠিপত্রের ব্যবস্থাপনা, প্রশাসনিক নোটিশ, সার্কুলার ও অফিস আদেশ প্রস্তুত ও বিতরণ/সার্কুলেশনও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হতে পারে।
৪. সভা ও কমিটির কাজে সহায়তা
বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট, একাডেমিক কাউন্সিল ও বিভিন্ন কমিটির সভার জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত, সংশ্লিষ্ট নথি সংরক্ষণ এবং সভার কার্যক্রমে প্রশাসনিক সহায়তা দিতে হয় অনেক ক্ষেত্রে।
৫. রেকর্ড সংরক্ষণ
শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক বিষয়ের গুরুত্বপূর্ণ রেকর্ড ও ফাইল হালনাগাদ রাখা সেকশন অফিসারের দায়িত্বের মধ্যে থাকতে পারে।
৬. বিভিন্ন দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয়
বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগ, অনুষদ, দপ্তর ও শাখার মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক সমন্বয় করতেও সেকশন অফিসারকে কাজ করতে হয়।
সব সেকশন অফিসারের কাজ কি একই?
না। এটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
একজন সেকশন অফিসার রেজিস্ট্রার অফিসে থাকলে তাঁর কাজ এক ধরনের হতে পারে, আবার পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের দপ্তর, জনসংযোগ অফিস, পরিকল্পনা ও উন্নয়ন শাখা, একাডেমিক শাখা কিংবা প্রশাসন শাখায় দায়িত্ব পেলে কাজের ধরন ভিন্ন হতে পারে।
উদাহরণ হিসেবে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে জনসংযোগ দপ্তরের সেকশন অফিসার পদ গ্রেড-৯ (২২,০০০–৫৩,০৬০ টাকা) হিসেবে দেখানো হয়েছে। অর্থাৎ একই ‘সেকশন অফিসার’ পদ হলেও দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট অফিসের কাজের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে।
আবার বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তাদের তালিকায় বিভিন্ন ইউনিটে সেকশন অফিসারের পদ রয়েছে, যা দেখায় যে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক প্রশাসনিক ইউনিটেই এ পদ থাকতে পারে।
তাহলে কি এটি শুধু ‘টেবিল ওয়ার্ক’?
সাধারণত অফিসভিত্তিক বা ডেস্কভিত্তিক প্রশাসনিক কাজই বেশি। তবে এটিকে শুধুই কাগজপত্র সাজানোর কাজ ভাবলে ভুল হবে।
একজন দক্ষ সেকশন অফিসারকে—
- ফাইলের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে হয়;
- গুরুত্বপূর্ণ ও জরুরি নথি চিহ্নিত করতে হয়;
- সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কাছে বিষয় উপস্থাপন করতে হয়;
- চিঠিপত্র ও অফিস আদেশ প্রস্তুত করতে হয়;
- রেকর্ড সংরক্ষণ করতে হয়;
- বিভিন্ন দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে হয়;
- নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ নিষ্পত্তিতে ভূমিকা রাখতে হয়;
- প্রয়োজনে গোপনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কাজও সামলাতে হয়।
পদোন্নতির সুযোগ আছে কি?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মন্তব্যে ‘সেকশন অফিসার থেকে রেজিস্ট্রার পর্যন্ত পদোন্নতি হয়’—এমন দাবি দেখা যায়। বিষয়টি অবশ্যই সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি বিধিমালা, পদোন্নতি বিধি, অনুমোদিত অর্গানোগ্রাম ও শূন্য পদের ওপর নির্ভর করে।
অর্থাৎ শুধু সেকশন অফিসার পদে যোগদান করলেই সরাসরি রেজিস্ট্রার হওয়া নিশ্চিত—এমন কথা বলা ঠিক নয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ভেদে কর্মকর্তা কাঠামোয় সেকশন অফিসার → সহকারী রেজিস্ট্রার → উপ-রেজিস্ট্রার → রেজিস্ট্রার ধরনের বিভিন্ন পদ থাকতে পারে; তবে এগুলোর মধ্যে পদোন্নতির যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, গ্রেড, নিয়োগবিধি ও অন্যান্য শর্ত আলাদা হতে পারে। তাই নির্দিষ্ট কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট Statutes/Service Rules না দেখে পদোন্নতির সুনির্দিষ্ট পথ নিশ্চিত করা যাবে না।
কেন পদটি আকর্ষণীয়?
সেকশন অফিসার পদটি মূলত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ মধ্যম স্তরের কর্মকর্তা পদ। কাজের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, ফাইল ব্যবস্থাপনা, বিধি-বিধান, সভা, নিয়োগ, একাডেমিক প্রশাসন ও অফিস পরিচালনার বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ থাকে।
বিশেষ করে প্রশাসনিক ক্যাডারে আগ্রহী চাকরিপ্রার্থীদের জন্য এ ধরনের পদে দাপ্তরিক নথি, বিশ্ববিদ্যালয় আইন ও বিধি, অফিসিয়াল যোগাযোগ এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতা তৈরি হতে পারে।
তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি
‘সেকশন অফিসার’ একটি একক ও অভিন্ন দায়িত্বের পদ নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম, কোন শাখায় পদায়ন করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট চাকরি বিধিমালার ওপর দায়িত্ব নির্ভর করে।
তাই কেউ যদি নির্দিষ্টভাবে জানতে চান—“অমুক বিশ্ববিদ্যালয়ের সেকশন অফিসারের দায়িত্ব কী এবং সেখান থেকে কোন কোন পদে পদোন্নতি হয়?”—তাহলে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি বিধিমালা/সার্ভিস রুলস/অর্গানোগ্রাম এবং সংশ্লিষ্ট নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেখা সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উপায়।
সারকথা: বিশ্ববিদ্যালয়ের সেকশন অফিসার মূলত সংশ্লিষ্ট শাখার প্রশাসনিক কাজের গুরুত্বপূর্ণ সমন্বয়কারী। ফাইল-নথি, চিঠিপত্র, রেকর্ড, সভা, অফিস আদেশ, নিয়োগ বা একাডেমিক প্রশাসন—যে শাখায় দায়িত্ব, সেই অনুযায়ী কাজের পরিধি নির্ধারিত হয়। তাই এটি শুধু ‘কাগজপত্রের চাকরি’ নয়; বরং বিশ্ববিদ্যালয়ের দৈনন্দিন প্রশাসনিক কার্যক্রম সচল রাখার গুরুত্বপূর্ণ একটি কর্মকর্তা পদ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি পোর্টাল — সাম্প্রতিক সেকশন অফিসার নিয়োগের উদাহরণ ও গ্রেড দেখার জন্য।

