সরকারি চাকরিতে কর্মরত অবস্থায় বিসিএসে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার পর নতুন ক্যাডার পদে যোগদানের ক্ষেত্রে চাকরিকাল সংরক্ষণ, অব্যাহতি গ্রহণ এবং পূর্বে উত্তোলিত বেতন-ভাতা ফেরত দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই নানা প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষ করে একই ব্যক্তি এক সরকারি পদ থেকে অব্যাহতি নিয়ে অন্য সরকারি পদে যোগ দিলে পূর্বের চাকরির সময়কাল গণনা হবে কি না এবং এ কারণে এক মাসের বেতন ফেরত দিতে হবে কি না—এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা মতামত দেখা যাচ্ছে।
সম্প্রতি ৪৯তম বিসিএসের মাধ্যমে শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত একজন সরকারি কর্মচারীর প্রশ্নকে কেন্দ্র করে বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তিনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)-এর একটি সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ১০ম গ্রেডে কর্মরত। বিসিএস পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সময় তিনি যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে NOC (অনাপত্তি সনদ) গ্রহণ করেছিলেন। এখন শিক্ষা ক্যাডারে যোগদানের জন্য বর্তমান সরকারি চাকরি থেকে অব্যাহতি নিয়ে সরকারি কলেজে যোগদানের ক্ষেত্রে চাকরিকাল সংরক্ষণ করা হলে এক মাসের বেসিক বেতন ফেরত দিতে হবে কি না—এটাই মূল প্রশ্ন।
চাকরিকাল সংরক্ষণ কেন গুরুত্বপূর্ণ?
সরকারি চাকরিতে কর্মরত কোনো ব্যক্তি যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে অন্য সরকারি পদে নিয়োগ লাভ করলে অনেক ক্ষেত্রে পূর্বের চাকরির ধারাবাহিকতা বা চাকরিকাল সংরক্ষণের সুযোগ সৃষ্টি হয়। তবে এটি স্বয়ংক্রিয় কোনো অধিকার নয়; সংশ্লিষ্ট নিয়োগবিধি, সার্ভিস রুলস, নিয়োগের ধরন এবং কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের ওপর বিষয়টি নির্ভর করে।
বিশেষ করে একজন কর্মচারী যদি বর্তমান পদ থেকে নিয়ম মেনে অব্যাহতি নিয়ে নতুন সরকারি পদে যোগ দেন এবং তার পূর্বের চাকরি চাকরিকাল সংরক্ষণ বা lien/continuity-এর আওতায় আসে, তাহলে পূর্বের চাকরির সময়কাল সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি নাও হতে পারে।
তবে চাকরিকাল সংরক্ষণ এবং বেতন ফেরত দেওয়ার প্রশ্ন দুটি একই বিষয় নয়—এটি বোঝা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এক মাসের বেসিক ফেরত দেওয়ার প্রশ্নটি কোথা থেকে আসে?
সরকারি চাকরিতে একজন কর্মচারী যখন নতুন পদে যোগদানের জন্য পুরোনো পদ থেকে অব্যাহতি নেন, তখন অব্যাহতির তারিখ ও সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
উদাহরণ হিসেবে, কোনো কর্মচারী যদি কোনো নির্দিষ্ট তারিখের অপরাহ্ণে (দুপুরের পর/কার্যালয় সময় শেষে) বর্তমান পদ থেকে অব্যাহতি পান, তাহলে ওই দিন পর্যন্ত তার পূর্বের পদে দায়িত্ব পালন এবং প্রাপ্য বেতন-ভাতার হিসাব করার সুযোগ থাকে। অর্থাৎ শুধু নতুন চাকরিতে যোগদানের কারণে পূর্বে বৈধভাবে উত্তোলিত বেতনকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অবৈধ বা ফেরতযোগ্য ধরে নেওয়া যায় না।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ বিষয়ে যে মতামতটি ছড়িয়েছে, তার সারকথা হলো—অপরাহ্ণে অব্যাহতি প্রদান করা হলে ওই দিন পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মচারী পূর্বের চাকরির বেতন ও ভাতা পাওয়ার অধিকারী এবং পূর্বে বৈধভাবে উত্তোলিত বেতন-ভাতা ফেরত দেওয়ার প্রয়োজন হয় না।
তবে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির ক্ষেত্রে এই সিদ্ধান্ত প্রয়োগ করার আগে সংশ্লিষ্ট অফিস আদেশ, অব্যাহতির তারিখ ও সময় এবং নতুন পদে যোগদানের তারিখ পরীক্ষা করা জরুরি।
NOC নেওয়া থাকলে অবস্থান কিছুটা পরিষ্কার
এখানে আলোচ্য কর্মচারীর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—তিনি ৪৯তম বিসিএসের ভাইভায় অংশগ্রহণের আগে মাউশি থেকে NOC নিয়েছিলেন।
NOC থাকার অর্থ হলো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তার বিসিএস পরীক্ষায় অংশগ্রহণের বিষয়ে আপত্তি করেনি। তবে শুধু NOC থাকলেই নতুন চাকরিতে যোগদানের সময় পূর্বের চাকরিকাল স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংরক্ষিত হবে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না।
কারণ পরীক্ষায় অংশগ্রহণের অনুমতি, বিসিএসে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার পর অব্যাহতি এবং চাকরিকাল সংরক্ষণ—প্রতিটি ধাপের জন্য আলাদা প্রশাসনিক প্রক্রিয়া থাকতে পারে।
তাই নতুন ক্যাডার পদে যোগদানের আগে বর্তমান দপ্তর থেকে যথাযথ অব্যাহতি/রিলিজ অর্ডার নেওয়া এবং প্রয়োজন হলে চাকরিকাল সংরক্ষণের বিষয়টি স্পষ্টভাবে আদেশে উল্লেখ করানো গুরুত্বপূর্ণ।
গেজেট ও নন-গেজেট পদ নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে
আলোচনায় আরেকটি বক্তব্য এসেছে—“গেজেটেড ও নন-গেজেটেড আলাদা, তাই চাকরিকাল কাউন্ট হবে না।”
এখানেও বিষয়টি সরলভাবে দেখার সুযোগ নেই।
একটি পদ গেজেটেড বা নন-গেজেটেড হওয়া এবং পূর্বের চাকরিকাল নতুন সরকারি চাকরিতে গণনা হবে কি না—দুটি আলাদা প্রশাসনিক ও আইনগত প্রশ্ন। শুধু পদটি গেজেটেড বা নন-গেজেটেড হওয়ার কারণে পূর্বের সরকারি চাকরির সময়কাল স্বয়ংক্রিয়ভাবে গণনা হবে না বা অবশ্যই গণনা হবে—এমন সার্বজনীন নিয়ম ধরে নেওয়া নিরাপদ নয়।
বরং দেখতে হবে—
- পূর্বের চাকরিটি কোন কর্তৃপক্ষের অধীন;
- নতুন চাকরিটি কোন ক্যাডার/সার্ভিসের অধীন;
- নিয়োগের ধরন কী;
- বর্তমান চাকরি থেকে কীভাবে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে;
- নতুন পদে যোগদানের আগে যথাযথ অনুমতি ছিল কি না;
- চাকরিকাল সংরক্ষণের বিষয়ে কোনো বিধান বা অফিস আদেশ প্রযোজ্য কি না;
- এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত দিয়েছে।
একই দিনে অব্যাহতি ও যোগদানের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ
সরকারি চাকরিতে এক পদ থেকে অন্য পদে যাওয়ার ক্ষেত্রে release date এবং joining date অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক তথ্য।
ধরা যাক, একজন কর্মচারী ১৪ অক্টোবর বর্তমান পদ থেকে অপরাহ্ণে অব্যাহতি পেলেন এবং এরপর নতুন সরকারি পদে যোগদানের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করলেন। সেক্ষেত্রে ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত পূর্বের চাকরিতে তার প্রাপ্যতা কী হবে, সেটি অব্যাহতি আদেশের ভাষা ও সময়ের ওপর নির্ভর করবে।
অন্যদিকে যদি কোনো কর্মচারীকে পূর্বের পদ থেকে কার্যকর তারিখের আগেই অব্যাহতি দেওয়া হয়, তাহলে ওই সময়ের বেতন-ভাতার হিসাব ভিন্ন হতে পারে।
অর্থাৎ “এক মাসের বেতন ফেরত দিতে হবে”—এমন একটি সাধারণ নিয়ম ধরে সব ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত দেওয়া ঠিক নয়।
পূর্বে উত্তোলিত বেতন কখন ফেরত দেওয়ার প্রশ্ন উঠতে পারে?
কোনো সরকারি কর্মচারী যে সময়ের জন্য বৈধভাবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং নিয়ম অনুযায়ী বেতন-ভাতা উত্তোলন করেছেন, শুধুমাত্র পরবর্তী সময়ে অন্য সরকারি চাকরিতে যোগদানের কারণে সেই বেতন-ভাতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফেরতযোগ্য হয়ে যায় না।
তবে যদি দেখা যায়—
১. কোনো সময়ের জন্য তিনি আর চাকরিতে ছিলেন না,
২. অব্যাহতির কার্যকর তারিখের পরও পূর্বের পদ থেকে বেতন উত্তোলন করেছেন,
৩. একই সময়ের জন্য দুই জায়গা থেকে বেতন-ভাতা গ্রহণ করেছেন, অথবা
৪. কোনো প্রশাসনিক আদেশে অতিরিক্ত অর্থ উত্তোলনের বিষয়টি নির্ধারিত হয়েছে,
তাহলে অতিরিক্ত বা অনিয়মিতভাবে উত্তোলিত অর্থ সমন্বয়/ফেরতের প্রশ্ন আসতে পারে।
তাই “চাকরিকাল সংরক্ষণ করলেই এক মাসের বেসিক ফেরত”—এমন ধারণাকে সাধারণ নিয়ম হিসেবে গ্রহণ করা ঠিক হবে না।
চাকরিকাল সংরক্ষণ আর নতুন চাকরিতে বেতন নির্ধারণ এক বিষয় নয়
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পূর্বের চাকরিকাল সংরক্ষণ এবং নতুন পদে বেতন নির্ধারণ একই বিষয় নয়।
কোনো কর্মচারীর পূর্বের সরকারি চাকরির সময়কাল কোনো উদ্দেশ্যে গণনা হতে পারে, আবার নতুন পদে তার বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিধি অনুযায়ী আলাদা হিসাব হতে পারে।
একইভাবে পূর্বের চাকরির অভিজ্ঞতা, জ্যেষ্ঠতা, পেনশনযোগ্য চাকরিকাল এবং নতুন ক্যাডারে পদায়ন—প্রতিটির নিয়ম আলাদা হতে পারে।
সুতরাং শুধু চাকরিকাল সংরক্ষণের সুযোগ পাওয়া মানেই নতুন ক্যাডারে সব সুবিধা পূর্বের মতো বহাল থাকবে—এমন ধারণাও সঠিক নয়।
সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর করণীয়
৪৯তম বিসিএসে শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত কোনো সরকারি কর্মচারী যদি বর্তমানে মাউশির অধীন সরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত থাকেন, তাহলে নতুন পদে যোগদানের আগে কয়েকটি বিষয় লিখিতভাবে নিশ্চিত করা সবচেয়ে নিরাপদ।
প্রথমত, বর্তমান দপ্তর থেকে যথাযথ অব্যাহতি/রিলিজ আদেশ নিতে হবে।
দ্বিতীয়ত, অব্যাহতির আদেশে কার্যকর তারিখ ও সময় স্পষ্ট আছে কি না দেখতে হবে।
তৃতীয়ত, চাকরিকাল সংরক্ষণের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে লিখিতভাবে নিশ্চিত করা ভালো।
চতুর্থত, পূর্বের চাকরি থেকে কোনো বেতন-ভাতা সমন্বয় বা ফেরতের নির্দেশ আছে কি না তা যাচাই করতে হবে।
পঞ্চমত, নতুন কর্মস্থলে যোগদানের সময় পূর্বের চাকরির NOC, অব্যাহতি আদেশ, নিয়োগ/সুপারিশ সংক্রান্ত কাগজপত্র এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় নথি সঙ্গে রাখা উচিত।
মূল কথা
৪৯তম বিসিএসে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়ে সরকারি কলেজে যোগদানের ক্ষেত্রে বর্তমানে মাউশির অধীন ১০ম গ্রেডের সরকারি চাকরি থেকে অব্যাহতি নেওয়ার সময় চাকরিকাল সংরক্ষণ করা যাবে কি না এবং এক মাসের বেতন ফেরত দিতে হবে কি না—এ দুটি প্রশ্নের উত্তর একই নয়।
চাকরিকাল সংরক্ষণ নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট চাকরি ও নতুন ক্যাডার সার্ভিসের প্রযোজ্য বিধান এবং কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের ওপর। অন্যদিকে পূর্বে বৈধভাবে উত্তোলিত বেতন-ভাতা কেবল নতুন চাকরিতে যোগদানের কারণে ফেরত দিতে হবে—এমন সাধারণ সিদ্ধান্তও দেওয়া যায় না।
বিশেষ করে অপরাহ্ণে অব্যাহতি, অব্যাহতির কার্যকর তারিখ, নতুন পদে যোগদানের তারিখ এবং কোনো সময়ের জন্য দ্বৈত বেতন গ্রহণ হয়েছে কি না—এসব বিষয় বেতন ফেরতের প্রশ্ন নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ।
তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচলিত “গেজেট-ননগেজেট আলাদা বলে চাকরিকাল কাউন্ট হবে না” কিংবা “চাকরিকাল সংরক্ষণ করলে এক মাসের বেসিক ফেরত দিতে হবে”—এই দুই বক্তব্যের কোনোটিকেই প্রাসঙ্গিক বিধি ও অফিস আদেশ যাচাই ছাড়া চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে নেওয়া উচিত নয়।
সবচেয়ে নিরাপদ অবস্থান হলো—ব্যক্তিগত চাকরির ফাইল, NOC, অব্যাহতি আদেশ এবং নতুন নিয়োগের কাগজপত্র দেখে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক/হিসাব কর্তৃপক্ষের লিখিত সিদ্ধান্ত নেওয়া।

