আজকের খবর ২০২৬

হারানো নামজারি খতিয়ান নিয়ে বড় সুখবর, প্রমাণ থাকলেই পুনঃসৃজন করবে ভূমি অফিস

অনেক বছর আগে জমির নামজারি বা খারিজ সম্পন্ন করেছেন, কিন্তু বাড়িতে সেই খারিজ খতিয়ানের কপি নেই—এমনকি ভূমি অফিসেও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না? এ অবস্থায় জমির মালিকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দিয়েছে ভূমি মন্ত্রণালয়। এখন খতিয়ানের মূল কপি পাওয়া না গেলেও, নামজারি সম্পন্ন হওয়ার নির্ভরযোগ্য দাপ্তরিক প্রমাণ থাকলে নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় সেই নামজারি খতিয়ান পুনঃসৃজন করে অটোমেটেড ভূমিসেবা সিস্টেমে এন্ট্রি দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

ভূমি মন্ত্রণালয়ের ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখের পরিপত্রে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরসহ বিভিন্ন এলাকার ভূমি অফিসে ডেটা এন্ট্রির সময় পাওয়া যাওয়া অনুপস্থিত নামজারি খতিয়ান নিয়ে এই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের লক্ষ্য—আগে বৈধভাবে নামজারি সম্পন্ন হলেও বর্তমানে খতিয়ান পাওয়া যাচ্ছে না বা সংরক্ষিত নেই, এমন রেকর্ডকে বিদ্যমান তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে পুনরায় তৈরি করে ডিজিটাল ভূমিসেবা ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করা।

যাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই নির্দেশনা

ধরা যাক, একজন ব্যক্তি ১০, ১৫ বা ২০ বছর আগে জমি কিনে নামজারি করেছিলেন। তার কাছে পুরোনো খারিজ খতিয়ানের কোনো কপি নেই। পরে ভূমি অফিসে গিয়ে খোঁজ করেও সেই খতিয়ানের কপি পাওয়া গেল না।

এমন অবস্থায় শুধু খতিয়ানের কপি না থাকার কারণে নামজারির পুরোনো রেকর্ড অকার্যকর হয়ে যাবে—এমন নয়।

ভূমি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী, নামজারি সম্পন্ন হওয়ার প্রমাণ হিসেবে রেজিস্টার-২, রেজিস্টার-৯, নামজারি প্রস্তাবপত্র, মামলার আদেশপত্র বা সংশ্লিষ্ট নথির কোনোটি নির্ভরযোগ্যভাবে পাওয়া গেলে, সেসব তথ্য যাচাই করে খতিয়ান পুনঃসৃজনের ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।

অর্থাৎ, সাধারণ মানুষের জন্য বিষয়টি সহজভাবে বললে—পুরোনো খারিজ খতিয়ানের কাগজ হারিয়ে গেলেও, সরকারি রেকর্ডে নামজারি হওয়ার প্রমাণ থাকলে সেই খতিয়ান পুনরায় তৈরি করার পথ এখন নির্ধারিত হয়েছে।


রেজিস্টার-২ ও রেজিস্টার-৯ কেন গুরুত্বপূর্ণ?

পুরোনো নামজারি রেকর্ড যাচাইয়ের ক্ষেত্রে ভূমি অফিসে সংরক্ষিত রেজিস্টার-২ (হোল্ডিং রেজিস্টার) এবং রেজিস্টার-৯ (নামজারি রেজিস্টার) গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

পরিপত্রে বলা হয়েছে, কোনো নির্দিষ্ট নামজারি খতিয়ান পাওয়া না গেলেও সংশ্লিষ্ট নামজারি কার্যক্রম সম্পন্ন হওয়ার প্রমাণ হিসেবে রেজিস্টার-২ ও ৯ এবং সংশ্লিষ্ট নথি থাকলে নির্ধারিত পদ্ধতিতে খতিয়ান পুনঃসৃজন করতে হবে।

অর্থাৎ আপনার ক্ষেত্রে যদি—

১. খতিয়ানের কপি নেই, কিন্তু রেজিস্টার-২ ও ৯ আছে
→ তথ্য যাচাই করে খতিয়ান পুনঃসৃজন করা যাবে।

২. নামজারি নথি ও প্রস্তাবপত্র আছে, রেজিস্টার-৯ আছে, কিন্তু রেজিস্টার-২ নেই
→ নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে কাজ সম্পন্ন করে রেজিস্টার-২ হালনাগাদ করতে হবে।

৩. খতিয়ান ও নামজারি নথি নেই, কিন্তু রেজিস্টার-২ ও ৯ আছে
→ দুই রেজিস্টারের তথ্য যাচাই করে খতিয়ান পুনঃসৃজন করা যাবে।

৪. রেজিস্টার-২ নেই, শুধু রেজিস্টার-৯ আছে
→ রেজিস্টার-৯-এর তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে হবে। প্রয়োজনে ভূমি মালিককে নোটিশ দিয়ে খতিয়ানের কপি দাখিল করতে বলা যেতে পারে।

৫. রেজিস্টার-৯ নেই, শুধু রেজিস্টার-২ আছে
→ রেজিস্টার-২-এর তথ্য যাচাই করতে হবে। প্রয়োজন হলে ভূমি মালিকের কাছ থেকে খতিয়ানের কপি ও ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের তথ্য চাওয়া যেতে পারে।


কীভাবে পুনরায় তৈরি হবে খারিজ খতিয়ান?

পরিপত্রে খতিয়ান পুনঃসৃজনের ক্ষেত্রে একাধিক ধাপ নির্ধারণ করা হয়েছে।

প্রথমে সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসে পুরোনো নামজারি নথি, প্রস্তাবপত্র ও রেজিস্টারের তথ্য খুঁজে বের করা হবে। এরপর নামজারি মামলার আদেশপত্র, রেজিস্টার-৯ এবং প্রয়োজন হলে রেজিস্টার-২-এর হোল্ডিংয়ের তথ্য পরস্পরের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হবে।

তথ্যের মধ্যে কোনো অসঙ্গতি থাকলে আরও যাচাই করতে হবে। সব তথ্য সঠিক ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণিত হলে নির্ধারিত ছক অনুযায়ী খতিয়ানটি অটোমেটেড ভূমিসেবা সিস্টেমে এন্ট্রি, যাচাই ও ভ্যালিডেট করতে হবে। সংশ্লিষ্ট রেজিস্টার ও নামজারি প্রস্তাবপত্রের অংশ স্ক্যান করে সিস্টেমে সংরক্ষণেরও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

এরপর পুনঃসৃজিত খতিয়ানের প্রিন্ট কপি আবার যাচাই করতে হবে এবং বর্তমানে কর্মরত সহকারী কমিশনার (ভূমি) সেটিতে প্রত্যয়ন দিয়ে স্বাক্ষর করবেন। একটি কপি সংশ্লিষ্ট নামজারি নথিতে সংরক্ষণ করতে হবে।


শুধু খতিয়ানের কপি হারিয়েছে—এমন ক্ষেত্রে কী হবে?

এখানেই সাধারণ জমির মালিকদের জন্য নির্দেশনাটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে।

যদি কারও পুরোনো খারিজ খতিয়ানের কপি না থাকে, কিন্তু ভূমি অফিসে নামজারি নথি, স্বাক্ষরিত প্রস্তাবপত্র এবং রেজিস্টার-২ ও ৯ থাকে, তাহলে এসব দলিলের তথ্য মিলিয়ে খতিয়ান পুনঃসৃজন করা যাবে।

প্রথমে নামজারি মামলার আদেশপত্র ও রেজিস্টার-৯-এর তথ্য মিলিয়ে দেখা হবে। কোনো সন্দেহ দেখা দিলে ইউনিয়ন বা পৌর ভূমি অফিসে থাকা রেজিস্টার-২-এর সংশ্লিষ্ট হোল্ডিংয়ের সঙ্গে মিলিয়ে তথ্য যাচাই করা হবে। এরপর রেজিস্টার-২ থেকে খতিয়ান নম্বর সংগ্রহ করে নির্ধারিত ছকে খতিয়ান তৈরি করা হবে।


খতিয়ান পুনঃসৃজন মানে নতুন করে নামজারি নয়

এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা জরুরি।

ভূমি মন্ত্রণালয়ের এই উদ্যোগের মাধ্যমে নতুন করে কোনো নামজারি অনুমোদন বা নতুন মালিকানা সৃষ্টি করা হবে না। এটি কেবল আগে সম্পন্ন হওয়া নামজারির অনুপস্থিত খতিয়ান পুনঃসৃজনের কার্যক্রম।

অর্থাৎ, কোনো ব্যক্তি এখন নতুন করে মালিকানা দাবি করে পুরোনো খতিয়ান বানিয়ে নিতে পারবেন—বিষয়টি এমন নয়। আগে নামজারি অনুমোদিত হয়েছিল—এমন নির্ভরযোগ্য সরকারি তথ্য-প্রমাণ থাকতে হবে।

আর কোনো তথ্য নিয়ে সন্দেহ, অসামঞ্জস্যতা বা ঘাটতি থাকলে অনুমান করে খতিয়ান তৈরি করা যাবে না। সংশ্লিষ্ট নথি ও রেজিস্টার পুনরায় যাচাই করতে হবে। নির্ভরযোগ্য তথ্য না পাওয়া গেলে পুনঃসৃজনের কাজ বন্ধ রাখতে হবে।


মূল খতিয়ান ভবিষ্যতে পাওয়া গেলে কী হবে?

পুনঃসৃজন করা খতিয়ানটি মূল খতিয়ানের বিকল্প হিসেবে স্থায়ীভাবে নতুন কোনো রেকর্ড সৃষ্টি করবে না। পরিপত্রে বলা হয়েছে, খতিয়ান পাওয়া না যাওয়ায় বিদ্যমান রেকর্ডপত্র ও রেজিস্টারের ভিত্তিতে খতিয়ানটি পুনঃসৃজন করা হলে ভবিষ্যতে মূল খতিয়ান পাওয়া গেলে সেটিই প্রতিস্থাপিত হবে

এ কারণে পুনঃসৃজিত খতিয়ানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রমাণপত্র সংরক্ষণ এবং সিস্টেমে স্ক্যান কপি আপলোডের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।


খতিয়ান নম্বর না পাওয়া গেলে কী হবে?

কোনো ক্ষেত্রে পুরোনো খতিয়ানের নম্বরই খুঁজে পাওয়া না গেলে, মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় নির্ধারিত আগের পরিপত্র অনুসরণ করে খতিয়ান নম্বর দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তবে তার আগে নিশ্চিত হতে হবে যে একই নামজারি অন্য কোনো নম্বরের খতিয়ান হিসেবে ইতোমধ্যে অটোমেটেড ভূমিসেবা সিস্টেমে অন্তর্ভুক্ত হয়নি।

এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ একই জমির জন্য ভুলভাবে একাধিক খতিয়ান তৈরি হয়ে গেলে ভবিষ্যতে মালিকানা, কর, বিক্রয় বা রেকর্ড সংশোধনের ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হতে পারে।


জমির মালিকদের এখন কী করা উচিত?

যাদের পুরোনো নামজারি বা খারিজ খতিয়ানের কপি হারিয়ে গেছে, তারা প্রথমেই আতঙ্কিত না হয়ে সংশ্লিষ্ট উপজেলা/সার্কেল ভূমি অফিসে যোগাযোগ করতে পারেন।

সঙ্গে থাকলে পুরোনো—

  • নামজারি মামলা নম্বর;
  • খারিজের আনুমানিক সাল;
  • দাগ নম্বর;
  • মৌজা ও জে.এল. নম্বর;
  • পুরোনো খতিয়ান নম্বর;
  • রেজিস্ট্রি দলিলের তথ্য;
  • ভূমি উন্নয়ন করের দাখিলা;
  • নামজারি প্রস্তাব বা আদেশের কপি;
  • পূর্বের খতিয়ানের কোনো ফটোকপি/ছবি

নিয়ে গেলে সংশ্লিষ্ট রেকর্ড খুঁজে বের করার কাজে সুবিধা হতে পারে।

তবে নিজে থেকে নতুন করে নামজারি আবেদন করে বসার আগে সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসে পুরোনো রেকর্ডের অবস্থা যাচাই করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মন্ত্রণালয়ের এই নির্দেশনা মূলত আগে সম্পন্ন হওয়া কিন্তু বর্তমানে অনুপস্থিত নামজারি খতিয়ান পুনঃসৃজনের জন্য।


দুই মাসের ‘ক্র্যাশ প্রোগ্রাম’

ভূমি মন্ত্রণালয় এই কাজকে দ্রুত শেষ করতে সংশ্লিষ্ট সহকারী কমিশনার (ভূমি)কে নিজ নিজ উপজেলা/সার্কেল এবং আওতাধীন ইউনিয়ন বা পৌর ভূমি অফিসে কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে।

পরিপত্র জারির দুই মাসের মধ্যে ক্র্যাশ প্রোগ্রাম হিসেবে খতিয়ান পুনঃসৃজনের কাজ শেষ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) জেলার বিভিন্ন ভূমি অফিসে পরিচালিত কার্যক্রমের সার্বিক তদারকি করবেন।

এ ছাড়া প্রয়োজন অনুযায়ী অতিরিক্ত জনবল সাময়িকভাবে সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসে পদায়নের সুযোগ রাখা হয়েছে। প্রকল্প পরিচালক, ভূমি ব্যবস্থাপনা অটোমেশন প্রকল্পকে খতিয়ান পুনঃসৃজনের জন্য প্রয়োজনীয় সিস্টেম পরিবর্তন বা নতুন ফিচার যুক্ত করার ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।


কেন এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ?

বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে ভূমি ব্যবস্থাপনার বড় একটি সমস্যা হলো পুরোনো কাগজপত্রের সংরক্ষণ, স্থানান্তর ও ডিজিটাল ডেটাবেজে অন্তর্ভুক্তির ঘাটতি। ফলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে নাগরিকের দাবি অনুযায়ী বহু বছর আগে নামজারি সম্পন্ন হলেও পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট খতিয়ানের কপি খুঁজে পাওয়া যায় না।

এতে জমি বিক্রি, উত্তরাধিকার, ভূমি উন্নয়ন কর, রেকর্ড যাচাই কিংবা অন্যান্য ভূমিসেবা নিতে গিয়ে নাগরিককে জটিলতার মুখে পড়তে হয়।

নতুন এই নির্দেশনার ফলে মূল খতিয়ান অনুপস্থিত হলেও সরকারি রেজিস্টার ও নামজারি-সংক্রান্ত নথিতে থাকা প্রমাণকে কাজে লাগিয়ে পুরোনো রেকর্ড পুনর্গঠনের একটি প্রশাসনিক পথ তৈরি হলো। ফলে হারিয়ে যাওয়া বা অনুপস্থিত নামজারি খতিয়ানগুলো ধাপে ধাপে ডিজিটাল ভূমিসেবা ব্যবস্থায় ফিরিয়ে আনার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

এক কথায়

বাড়িতে পুরোনো খারিজ খতিয়ানের কপি নেই, ভূমি অফিসেও খতিয়ান পাওয়া যাচ্ছে না—তবু যদি রেজিস্টার-২/৯, নামজারি নথি, প্রস্তাবপত্র বা অন্য কোনো নির্ভরযোগ্য সরকারি প্রমাণে আগের নামজারির তথ্য পাওয়া যায়, তাহলে নির্ধারিত যাচাই-বাছাই শেষে সেই খতিয়ান পুনঃসৃজন করে অটোমেটেড ভূমিসেবা সিস্টেমে অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ এখন রয়েছে।

এটি নতুন মালিকানা তৈরি নয়, বরং আগে অনুমোদিত নামজারির হারিয়ে যাওয়া/অনুপস্থিত রেকর্ড পুনরায় তৈরি ও ডিজিটালভাবে সংরক্ষণের উদ্যোগ।

Source File

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *