আজকের খবর ২০২৬

যৌথ মালিকানার জমিতে বণ্টননামা করে আলাদা নামজারি ও ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের নতুন নির্দেশনা

যৌথ মালিকানার খতিয়ানে থাকা জমির এক বা একাধিক মালিক বণ্টননামা দলিলের ভিত্তিতে পৃথক নামজারি করে নিজেদের অংশের ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ করতে পারবেন। তবে শুধু খতিয়ানে অংশীদার হিসেবে নাম থাকলেই একজন মালিক নিজের অংশের ভূমি উন্নয়ন কর আলাদাভাবে পরিশোধ করতে পারবেন না। এ ক্ষেত্রে নিবন্ধিত বণ্টননামা বা আদালতের মাধ্যমে বণ্টনের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

সম্প্রতি এ বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা জারি করেছে ভূমি মন্ত্রণালয়ের ভূমি সংস্কার ও ভূমি ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত কর্তৃপক্ষ। ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে জারি করা পরিপত্রে যৌথ মালিকানার খতিয়ানের এক বা একাধিক মালিক কর্তৃক বণ্টননামার ভিত্তিতে নামজারি করে ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের পদ্ধতি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

ভূমি উন্নয়ন কর আইন, ২০২৩-এর বিধানের সঙ্গেও নির্দেশনাটি সামঞ্জস্যপূর্ণ। আইনে একাধিক মালিকের খতিয়ানে প্রত্যেকের অংশ অনুযায়ী ভূমি উন্নয়ন কর নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে এবং মালিকের অংশ পৃথকভাবে উল্লেখ না থাকলে বণ্টননামার ভিত্তিতে নামজারির মাধ্যমে কর নির্ধারণের ব্যবস্থা রয়েছে।

কেন নতুন নির্দেশনা

পরিপত্রে বলা হয়েছে, বর্তমানে যৌথ মালিকানার খতিয়ানের ক্ষেত্রে খতিয়ানের সম্পূর্ণ জমির ভূমি উন্নয়ন কর একসঙ্গে পরিশোধের বাধ্যবাধকতা থাকায় কোনো কোনো মালিক নিজের অংশের ভূমি উন্নয়ন কর আলাদাভাবে পরিশোধ করার সুযোগ পাচ্ছেন না।

ফলে যৌথ খতিয়ানে থাকা জমির মালিকদের মধ্যে কেউ তার নিজস্ব অংশের কর দিতে চাইলেও বাস্তবে তা পৃথকভাবে পরিশোধের ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হচ্ছে।

এই জটিলতা দূর করতেই বণ্টননামার মাধ্যমে অংশ পৃথক করে নামজারি এবং পরবর্তী সময়ে পৃথকভাবে ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের পথ স্পষ্ট করেছে ভূমি মন্ত্রণালয়।

ভূমি উন্নয়ন কর আইনেও বিষয়টি স্পষ্ট

পরিপত্রে ভূমি উন্নয়ন কর আইন, ২০২৩-এর ৬(৩) ধারা উল্লেখ করে বলা হয়েছে, উত্তরাধিকারসূত্রে বা অন্য কোনোভাবে হস্তান্তরের ফলে কোনো ভূমির মালিকানা একাধিক ব্যক্তির ওপর বর্তালে এবং তারা জমাভাগ করে পৃথক নামজারি না করলে সেই ভূমিকে একই খতিয়ানভুক্ত হিসেবে বিবেচনা করে ভূমি উন্নয়ন কর নির্ধারণ করা হবে।

অর্থাৎ, যৌথ মালিকানা বহাল থাকলে সাধারণভাবে জমিটি একই খতিয়ানের আওতায় থাকবে। পৃথকভাবে মালিকানা ও কর ব্যবস্থাপনা করতে হলে আইনসম্মতভাবে অংশ পৃথক করার প্রয়োজন হবে।

এ ধরনের বিধানের মূল উদ্দেশ্য হলো সরকারি ভূমি রেকর্ড ও কর ব্যবস্থাপনায় প্রকৃত মালিকানা ও অংশের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।

বণ্টননামা থাকলে কীভাবে পৃথক নামজারি হবে

নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, কোনো কারণে যৌথ মালিকানার খতিয়ানের সম্পূর্ণ জমির ভূমি উন্নয়ন কর একসঙ্গে প্রদান করা সম্ভব না হলে রেজিস্টার্ড বণ্টননামা দলিল অথবা আদালতের মাধ্যমে বণ্টননামা সম্পাদনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে।

অর্থাৎ, যৌথ মালিকরা নিজেদের মধ্যে আইনসম্মতভাবে সম্পত্তির অংশ নির্ধারণ করে নিবন্ধিত বণ্টননামা করলে সেই দলিলের ভিত্তিতে পৃথক নামজারির সুযোগ তৈরি হবে।

এক্ষেত্রে বণ্টননামায় কে কোন অংশের জমির মালিক—তা স্পষ্টভাবে নির্ধারিত থাকবে। এরপর সংশ্লিষ্ট অংশ অনুযায়ী পৃথক খতিয়ান বা নামজারি সৃষ্টির মাধ্যমে ভূমি উন্নয়ন কর পৃথকভাবে পরিশোধ করা যাবে।

শুধু যৌথ খতিয়ানে নাম থাকলেই আলাদা কর দেওয়া যাবে না

নির্দেশনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—যৌথ খতিয়ানে একজন বা একাধিক মালিকের নাম থাকা এবং তার হিস্যা উল্লেখ থাকা মাত্রই তিনি নিজের অংশের ভূমি উন্নয়ন কর আলাদাভাবে পরিশোধ করতে পারবেন না।

অর্থাৎ, একটি খতিয়ানে পাঁচজন মালিক থাকলে এবং প্রত্যেকের অংশ নির্ধারিত থাকলেও, শুধু ওই হিস্যার ভিত্তিতে একজন মালিক নিজের অংশের কর আলাদা করে দেওয়ার সুযোগ পাবেন না—যদি না আইনসম্মতভাবে তার অংশ পৃথক খতিয়ান বা নামজারির মাধ্যমে সৃষ্টি করা হয়।

এ ক্ষেত্রে বণ্টননামা হবে গুরুত্বপূর্ণ দলিল।

বণ্টননামার মাধ্যমে পৃথক খতিয়ান হলে করও আলাদা

নির্দেশনায় বলা হয়েছে, বণ্টননামার ভিত্তিতে যৌথ মালিকানার খতিয়ানের এক বা একাধিক মালিক ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের জন্য পৃথক খতিয়ান সৃজনের আবেদন করতে পারবেন।

এর ফলে একজন মালিক তার অংশের জমির জন্য পৃথক নামজারি করতে পারবেন এবং পরবর্তী সময়ে সেই পৃথক মালিকানার ভিত্তিতে ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ করতে পারবেন।

এটি বিশেষ করে তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, যারা যৌথ সম্পত্তির অংশীদার হলেও নিজেদের অংশের কর নিজেরাই নিয়মিত পরিশোধ করতে চান।

সহকারী কমিশনার (ভূমি) কী করতে পারবেন

নতুন নির্দেশনায় সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর ভূমিকার বিষয়টিও স্পষ্ট করা হয়েছে।

মালিকানার সঠিকতা যাচাই করে সহকারী কমিশনার (ভূমি) ভূমি উন্নয়ন কর আদায় বা দাখিলা ছাড়াই নামজারির আবেদন মঞ্জুর করতে পারবেন—যেখানে প্রযোজ্য আইনগত ও দলিলগত শর্ত পূরণ হয়েছে।

অর্থাৎ, নামজারি আবেদনের ক্ষেত্রে শুধু পুরোনো ভূমি উন্নয়ন করের দাখিলা না থাকার কারণে প্রক্রিয়াটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে আটকে থাকবে—এমন নয়; বরং মালিকানা ও প্রয়োজনীয় দলিল যাচাই করে আইন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

নতুন খতিয়ানে বকেয়া করও পরিশোধ করতে হবে

বণ্টননামার মাধ্যমে নতুন পৃথক খতিয়ান সৃষ্টি হলে সংশ্লিষ্ট খতিয়ানের মালিককে পূর্বের যৌথ খতিয়ানের ভূমি উন্নয়ন করের বকেয়া অংশ, প্রযোজ্য ক্ষেত্রে, এবং হালনাগাদ ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ করে দাখিলা গ্রহণ করতে হবে।

অর্থাৎ, যৌথ খতিয়ান থেকে পৃথক খতিয়ানে যাওয়ার সময় পুরোনো কর-দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

নতুন খতিয়ানে মালিকানার অংশ অনুযায়ী ভূমি উন্নয়ন করের হিসাবও সঠিকভাবে নির্ধারণ করতে হবে।

একজন মালিক নিজের অংশ একতরফাভাবে আলাদা করতে পারবেন না

পরিপত্রে আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় বলা হয়েছে—যৌথ খতিয়ান থেকে বণ্টননামা করে পৃথক খতিয়ান সৃজন করা ছাড়া কোনো মালিক একতরফাভাবে তার অংশের ভূমি উন্নয়ন কর প্রদান করতে পারবেন না।

অর্থাৎ, যৌথ খতিয়ানের অন্য মালিকদের অংশ বাদ দিয়ে একজন মালিক শুধু নিজের পছন্দমতো অংশ নির্ধারণ করে আলাদা কর দেওয়ার ব্যবস্থা করতে পারবেন না।

প্রথমে আইনসম্মতভাবে অংশ নির্ধারণ ও পৃথক নামজারির প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। এরপর সেই পৃথক খতিয়ানের ভিত্তিতে ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ করা যাবে।

অনলাইন ভূমিসেবা ব্যবস্থায় পরিবর্তন

নির্দেশনাটি বাস্তবায়নের জন্য অনলাইন/অটোমেটেড ভূমিসেবা সিস্টেমে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা বা মডিউল সংযোজন করার কথাও বলা হয়েছে।

এর অর্থ হলো, ভবিষ্যতে নামজারি, খতিয়ান সৃষ্টি এবং ভূমি উন্নয়ন কর নির্ধারণ ও পরিশোধের ডিজিটাল ব্যবস্থায় বণ্টননামার মাধ্যমে পৃথক খতিয়ানের বিষয়টি আরও কাঠামোবদ্ধভাবে পরিচালনা করা হবে।

সাধারণ জমির মালিকদের জন্য এর অর্থ কী

নতুন নির্দেশনাটি সহজভাবে দেখলে বিষয়টি দাঁড়ায়—

যৌথ খতিয়ান → বণ্টননামা → পৃথক নামজারি → পৃথক খতিয়ান → পৃথক ভূমি উন্নয়ন কর।

অন্যদিকে,

যৌথ খতিয়ান → কোনো বণ্টননামা নেই → যৌথ মালিকানা বহাল → শুধু নিজের হিস্যা দেখিয়ে আলাদা ভূমি উন্নয়ন কর নয়।

এ কারণে যৌথ মালিকানার জমির কোনো অংশীদার যদি নিজের অংশের ভূমি উন্নয়ন কর নিয়মিত আলাদাভাবে পরিশোধ করতে চান, তাহলে প্রথমে তার মালিকানার অংশ আইনসম্মতভাবে পৃথক করার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।

উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমির ক্ষেত্রেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ

উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমির ক্ষেত্রে যৌথ নামজারি এবং পৃথক নামজারির মধ্যে পার্থক্যটি এখানে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

যদি উত্তরাধিকারীরা জমি ভাগ না করেন, তাহলে একই খতিয়ানে তাদের যৌথ মালিকানা থাকতে পারে। ভূমি উন্নয়ন করের ব্যবস্থাও সেই যৌথ মালিকানার ভিত্তিতে হবে।

কিন্তু উত্তরাধিকারীরা যদি নিজেদের অংশ নির্দিষ্ট করে পৃথক মালিকানা প্রতিষ্ঠা করতে চান, তাহলে নিবন্ধিত বণ্টননামার ভিত্তিতে পৃথক নামজারি ও খতিয়ান সৃষ্টির পথ গ্রহণ করতে হবে। সাম্প্রতিক ভূমি মন্ত্রণালয়ের নামজারি-সংক্রান্ত ব্যাখ্যাতেও যৌথ নামজারি ও বণ্টননামার ভিত্তিতে পৃথক নামজারির এই পার্থক্যটি গুরুত্ব পেয়েছে।

মালিকদের করণীয়

যৌথ মালিকানার জমির কোনো মালিক পৃথকভাবে ভূমি উন্নয়ন কর দিতে চাইলে তার জন্য মূলত কয়েকটি বিষয় নিশ্চিত করা জরুরি—

১. মালিকানার বৈধ দলিল যাচাই করতে হবে।

২. যৌথ সম্পত্তি ভাগ করা হলে নিবন্ধিত বণ্টননামা সম্পাদন করতে হবে।

৩. প্রয়োজন অনুযায়ী বণ্টননামার ভিত্তিতে পৃথক নামজারির আবেদন করতে হবে।

৪. পৃথক খতিয়ান সৃষ্টি হলে সংশ্লিষ্ট অংশের ভূমি উন্নয়ন কর ও প্রযোজ্য বকেয়া পরিশোধ করতে হবে।

৫. এরপর পৃথক খতিয়ানের ভিত্তিতে নিয়মিত ভূমি উন্নয়ন করের দাখিলা সংগ্রহ করতে হবে।

এক কথায়

ভূমি মন্ত্রণালয়ের নতুন নির্দেশনার মূল বার্তা হলো—যৌথ মালিকানার খতিয়ানে শুধু হিস্যা উল্লেখ থাকলেই পৃথকভাবে ভূমি উন্নয়ন কর দেওয়ার সুযোগ নেই; পৃথকভাবে কর দিতে হলে আইনসম্মত বণ্টননামার ভিত্তিতে পৃথক নামজারি ও খতিয়ান সৃষ্টি করতে হবে।

এর ফলে যৌথ মালিকানাধীন জমির মালিকানা, নামজারি ও ভূমি উন্নয়ন কর আদায়ের মধ্যে সমন্বয় আরও স্পষ্ট হবে এবং কে কোন অংশের জন্য কর দিচ্ছেন—তা সরকারি রেকর্ডে পরিষ্কারভাবে প্রতিফলিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

Source File

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *