উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমির নামজারি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিভ্রান্তি দূর করতে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দিয়েছে ভূমি মন্ত্রণালয়। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, কোনো জমির মালিক মারা গেলে তাঁর রেখে যাওয়া সম্পত্তির নামজারির আবেদনে মৃত ব্যক্তির সব বৈধ ওয়ারিশের নাম একসঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। ওয়ারিশদের মধ্যে জমি ভাগ-বাটোয়ারা না হয়ে থাকলে একই খতিয়ানে তাঁদের যৌথ মালিক বা কো-শেয়ারার হিসেবে নামজারি করতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্রত্যেক ওয়ারিশের অংশ বা হিস্যা উল্লেখ থাকবে, কিন্তু আলাদা আলাদা খতিয়ান তৈরি করা হবে না।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের ২০২৫ সালের ১১ ফেব্রুয়ারির পরিপত্রের মাধ্যমে উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত জমি বা স্থাবর সম্পত্তির নামজারি বিষয়ে বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়। এর ফলে শুধু একজন বা কয়েকজন ওয়ারিশের নামে নামজারি করে অন্য ওয়ারিশদের বাদ দেওয়ার সুযোগ সীমিত হয়েছে।
নামজারিতে এখন কী করতে হবে
নতুন নিয়মের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—মৃত ব্যক্তির সম্পত্তির উত্তরাধিকারী যতজনই থাকুন, নামজারির আবেদনে সব ওয়ারিশের তথ্য একসঙ্গে দিতে হবে। অর্থাৎ, কোনো মৃত ব্যক্তির স্ত্রী, সন্তান বা আইন অনুযায়ী অন্যান্য উত্তরাধিকারী থাকলে তাঁদের কাউকে বাদ দিয়ে শুধু একজন বা কয়েকজনের নামে নামজারি করার পরিবর্তে সংশ্লিষ্ট সব ওয়ারিশকে আবেদনের আওতায় আনতে হবে।
এ ক্ষেত্রে আবেদনকারীদের প্রয়োজনীয় ওয়ারিশ সনদ এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক কাগজপত্র দাখিল করতে হবে। ভূমি মন্ত্রণালয়ের বিদ্যমান নির্দেশনাতেও উত্তরাধিকারসূত্রে মালিকানা পরিবর্তনের ক্ষেত্রে ওয়ারিশান সনদ যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ভাগ-বাটোয়ারা না হলে আলাদা খতিয়ান নয়
ধরা যাক, একজন ব্যক্তি মারা যাওয়ার পর তাঁর নামে থাকা জমির উত্তরাধিকারী হয়েছেন চারজন। এই চার ওয়ারিশ নিজেদের মধ্যে জমি ভাগ করে নেননি। এমন পরিস্থিতিতে প্রত্যেকের জন্য আলাদা আলাদা খতিয়ান করার নিয়ম নয়।
বরং একই খতিয়ানে চারজনের নাম যৌথভাবে অন্তর্ভুক্ত হবে এবং উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী প্রত্যেকের প্রাপ্য হিস্যা উল্লেখ থাকবে। অর্থাৎ, জমিটি এজমালি বা যৌথ অবস্থায় থাকলে খতিয়ানও যৌথ থাকবে।
ভূমি প্রশাসনের পুরোনো নির্দেশনাতেও আপোষ-বণ্টন বা আদালতের বাটোয়ারা ডিক্রি ছাড়া এজমালি সম্পত্তির অংশীদারদের পৃথক খতিয়ান না করার নীতির উল্লেখ রয়েছে।
বণ্টন হয়ে গেলে আলাদা নামজারির সুযোগ
তবে ওয়ারিশদের মধ্যে জমির বৈধ বণ্টন হয়ে থাকলে পরিস্থিতি ভিন্ন। ওয়ারিশরা নিজেদের মধ্যে সম্পত্তি ভাগ করে নিয়ে বণ্টননামা বা সমঝোতা দলিল সম্পাদন করলে সেই দলিলের ভিত্তিতে পৃথকভাবে নামজারি করা যেতে পারে।
অর্থাৎ নিয়মটির মূল কাঠামো হলো—
বণ্টন নেই → সব ওয়ারিশের যৌথ নামজারি → একই খতিয়ান।
বৈধ বণ্টন আছে → বণ্টননামা অনুযায়ী পৃথক নামজারি → প্রয়োজন অনুযায়ী পৃথক খতিয়ান।
এ কারণে শুধু মৌখিকভাবে ভাই-বোন বা অন্যান্য ওয়ারিশের মধ্যে জমি ভাগ করে নেওয়া হয়েছে—এমন দাবি করলেই আলাদা খতিয়ান করার সুযোগ তৈরি হবে না। বৈধ দলিল বা আদালতের বাটোয়ারা ডিক্রির মতো গ্রহণযোগ্য ভিত্তি প্রয়োজন হতে পারে।
বণ্টননামা না থাকার কারণে যৌথ নামজারি বাতিল করা যাবে না
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সব ওয়ারিশ যৌথভাবে নামজারির আবেদন করলে শুধু বণ্টননামা নেই—এই কারণ দেখিয়ে আবেদন বাতিল করার সুযোগ নেই। ভূমি মন্ত্রণালয়ের পরিপত্রের ব্যাখ্যায় বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে।
অর্থাৎ, ওয়ারিশদের মধ্যে এখনো জমি ভাগ হয়নি—এটি যৌথ নামজারির ক্ষেত্রে বাধা নয়। বরং বণ্টন না হওয়াই যৌথ খতিয়ানে নাম অন্তর্ভুক্ত করার স্বাভাবিক ভিত্তি।
কেন এই নিয়ম গুরুত্বপূর্ণ
জমির মালিক মারা যাওয়ার পর অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, উত্তরাধিকারীদের সবাইকে অন্তর্ভুক্ত না করে একজন বা কয়েকজনের নামে নামজারি করা হয়। এতে পরবর্তীতে বাদ পড়া ওয়ারিশদের দাবি, জমি বিক্রি, উত্তরাধিকার নির্ধারণ কিংবা দখল নিয়ে বিরোধ তৈরি হতে পারে।
ভূমি প্রশাসনের নির্দেশনাতেও রেকর্ড হালনাগাদ রাখার গুরুত্ব উল্লেখ করা হয়েছে। রেকর্ড যথাযথভাবে হালনাগাদ না থাকলে একই জমি একাধিক ব্যক্তির নামে নামজারি হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।
তাই নতুন ব্যবস্থায় উত্তরাধিকারসূত্রে মালিকানা পরিবর্তনের সময় কারা প্রকৃত ওয়ারিশ এবং প্রত্যেকের আইনগত হিস্যা কত—তা একসঙ্গে রেকর্ডে আনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
নারীর উত্তরাধিকারও বাদ দেওয়ার সুযোগ নেই
উত্তরাধিকারভিত্তিক নামজারির ক্ষেত্রে শুধু ছেলে বা পুরুষ উত্তরাধিকারীদের নাম দেওয়ার সুযোগ নেই। প্রযোজ্য উত্তরাধিকার আইনে কোনো কন্যা, স্ত্রী বা অন্য নারী উত্তরাধিকারী হলে তাঁর প্রাপ্য অংশও রেকর্ডে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের জরিপ নির্দেশিকায়ও মৃত মালিকের উত্তরাধিকারীদের মধ্যে প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী নারী উত্তরাধিকারীদের অংশ রেকর্ড করার কথা উল্লেখ রয়েছে।
ফলে কোনো পরিবারে জমির মালিক মারা গেলে শুধু ছেলেদের নামে নামজারি করে মেয়েদের বাদ দেওয়া আইনগতভাবে নিরাপদ পদ্ধতি নয়।
আবেদন করার আগে যেসব বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে
নামজারির আবেদন করার সময় কয়েকটি বিষয়ে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন।
প্রথমত, মৃত ব্যক্তির সব বৈধ ওয়ারিশের তালিকা সঠিকভাবে প্রস্তুত করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, ওয়ারিশ সনদে নামের বানান, জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্মনিবন্ধনের তথ্য এবং অন্যান্য দলিলের তথ্যের মধ্যে সামঞ্জস্য আছে কি না, তা যাচাই করা উচিত। ভূমি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় নামের পার্থক্য থাকলে প্রয়োজনীয় পরিচয়পত্রের ভিত্তিতে বিষয়টি সংশোধন বা ব্যাখ্যা করার সুযোগ রাখার কথা বলা হয়েছে।
তৃতীয়ত, জমির খতিয়ান, দাগ নম্বর, জমির পরিমাণ এবং পূর্ববর্তী মালিকের তথ্য ভালোভাবে যাচাই করতে হবে।
চতুর্থত, ওয়ারিশদের মধ্যে বণ্টন না হলে আলাদা খতিয়ানের জন্য জোর না দিয়ে যৌথ নামজারির আবেদন করা উচিত।
পঞ্চমত, বণ্টন হয়ে থাকলে পৃথক নামজারির ভিত্তি হিসেবে বৈধ বণ্টননামা বা আদালতের আদেশসহ প্রয়োজনীয় দলিল সংরক্ষণ করতে হবে।
অনলাইনে নামজারির সুযোগও রয়েছে
বর্তমানে ভূমি সেবার বড় একটি অংশ অনলাইনে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। সরকারি ভূমি তথ্য বাতায়নের তথ্য অনুযায়ী নাগরিকরা অনলাইনে নামজারি, জমাভাগ ও জমা একত্রীকরণসহ বিভিন্ন ভূমিসেবার জন্য আবেদন করতে পারেন।
এতে আবেদন প্রক্রিয়া আগের তুলনায় সহজ হলেও ভুল ওয়ারিশের তথ্য দেওয়া, কোনো ওয়ারিশকে বাদ দেওয়া কিংবা জমির হিস্যা ভুল উল্লেখ করা ভবিষ্যতে জটিলতা তৈরি করতে পারে। তাই অনলাইনে আবেদন করলেও তথ্য ও কাগজপত্র যথাযথভাবে যাচাই করা জরুরি।
পুরোনো মালিকের মৃত্যুর পর নামজারি কেন জরুরি
নামজারি মূলত ভূমির রেকর্ডে মালিকানার পরিবর্তন হালনাগাদ করার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া। ভূমি প্রশাসন ম্যানুয়ালে উত্তরাধিকার বা নিবন্ধিত দলিলের মাধ্যমে মালিকানা পরিবর্তিত হলে খতিয়ানে পরিবর্তন আনার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে।
মালিক মারা যাওয়ার পর দীর্ঘদিন নামজারি না করলে পরবর্তী সময়ে জমি বিক্রি, উত্তরাধিকার নির্ধারণ, ভূমি উন্নয়ন কর, দখল, বণ্টন বা অন্য কোনো লেনদেনের সময় জটিলতা দেখা দিতে পারে। তাই উত্তরাধিকার নিশ্চিত হওয়ার পর রেকর্ড দ্রুত হালনাগাদ রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
সহজ ভাষায় নতুন নিয়মের সারাংশ
মৃত ব্যক্তির জমির নামজারি করতে হলে—
- সব বৈধ ওয়ারিশের নাম একসঙ্গে আবেদনে দিতে হবে;
- ওয়ারিশদের মধ্যে বণ্টন না হলে একই খতিয়ানে যৌথভাবে নামজারি হবে;
- প্রত্যেক ওয়ারিশের আইনগত হিস্যা রেকর্ডে থাকবে;
- শুধু বণ্টননামা নেই—এই কারণে যৌথ নামজারি বাতিল করা যাবে না;
- বৈধ বণ্টননামা বা আদালতের বাটোয়ারা থাকলে পৃথক নামজারি করা সম্ভব;
- কোনো ওয়ারিশ, বিশেষ করে আইনগতভাবে প্রাপ্য নারী উত্তরাধিকারীকে বাদ দিয়ে নামজারি করা উচিত নয়;
- আবেদন করার আগে ওয়ারিশ সনদ, পরিচয়পত্র, খতিয়ান ও অন্যান্য দলিলের তথ্য মিলিয়ে নেওয়া জরুরি।
সারকথা, উত্তরাধিকারসূত্রে জমির নামজারিতে এখন মূল গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে সব ওয়ারিশকে রেকর্ডে আনা এবং তাঁদের আইনগত হিস্যা সঠিকভাবে সংরক্ষণ করার ওপর। জমি ভাগ না হলে যৌথ খতিয়ানই হবে স্বাভাবিক পদ্ধতি; আর বৈধভাবে বণ্টন সম্পন্ন হলে সেই ভিত্তিতে পৃথক নামজারি করা যাবে। এর ফলে একই জমি নিয়ে ভবিষ্যৎ বিরোধ, ওয়ারিশ বাদ পড়া এবং ভুল রেকর্ড তৈরির ঝুঁকি কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।

