আজকের খবর ২০২৬

চেকের মামলায় সাজা ভোগ করলেই কি টাকার দায় শেষ? দ্বিতীয়বার গ্রেপ্তারের আইন কী বলে

চেক ডিজঅনারের মামলায় আদালত কারাদণ্ড দিলে অনেকের ধারণা থাকে—আসামি যদি সেই কারাদণ্ডের পুরো সময় জেল খেটে বের হয়ে আসেন, তাহলে চেকে লেখা টাকার দায়ও বুঝি শেষ। বাস্তবে বিষয়টি এতটা সরল নয়। কারাদণ্ড ভোগ করা এবং চেকের টাকা আদায়—দুটি বিষয়কে একই হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

বাংলাদেশে চেক প্রত্যাখ্যানের অপরাধ মূলত Negotiable Instruments Act, 1881-এর ১৩৮ ধারায় পরিচালিত হয়। এই ধারায় সর্বোচ্চ এক বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড, অথবা চেকের অঙ্কের সর্বোচ্চ তিনগুণ পর্যন্ত জরিমানা, অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। একই সঙ্গে আইনে বলা হয়েছে, জরিমানা আদায় হলে সেই জরিমানার অর্থ থেকে চেকের ধারকের পাওনা, চেকের মূল অঙ্ক পর্যন্ত, পরিশোধ করা হবে।

সাজা ভোগ করলেই কি চেকের টাকা মাফ হয়ে যায়?

না, স্বয়ংক্রিয়ভাবে মাফ হয়ে যায় না।

আইনের ১৩৮(২) ধারার মূল বক্তব্য হলো—আদালত জরিমানা আদায় করতে পারলে সেই আদায়কৃত অর্থ থেকে চেকের ধারককে চেকের অঙ্ক পর্যন্ত অর্থ দেওয়ার ব্যবস্থা থাকবে। অর্থাৎ, কারাদণ্ডের পাশাপাশি জরিমানা আরোপিত হয়ে থাকলে সেই জরিমানা আদায়ের বিষয়টি আলাদা।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ১৩৮(৩) ধারায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে—জরিমানার মাধ্যমে চেকের পুরো মূল্য উদ্ধার না হলে চেকের ধারকের দেওয়ানি আদালতের মাধ্যমে নিজের দাবি প্রতিষ্ঠার অধিকার অক্ষুণ্ন থাকবে।

অর্থাৎ, আসামি জেল খেটেছেন বলে চেকের পাওনা টাকা আইনগতভাবে ‘মাফ’ হয়ে গেছে—এমন ধারণা সঠিক নয়।

তাহলে আসামি কি দ্বিতীয়বার গ্রেপ্তার হতে পারেন?

এখানেই সবচেয়ে বেশি ভুল বোঝাবুঝি হয়।

দণ্ডবিধির সাধারণ কাঠামোয় একই অপরাধে একই কারাদণ্ডের জন্য একজনকে আবার নতুন করে সাজা দেওয়ার বিষয় নয়। তবে আদালতের আরোপ করা জরিমানা আদায়ের জন্য আলাদা আইনগত প্রক্রিয়া থাকতে পারে।

ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৮৬ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো অপরাধে জরিমানা আরোপ হলে আদালত তা আদায়ের জন্য আসামির অস্থাবর সম্পত্তি ক্রোক ও বিক্রির মাধ্যমে অর্থ আদায়ের ব্যবস্থা করতে পারে। আবার জেলা কালেক্টরকে এ বিষয়ে ক্ষমতা দিয়ে স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তির বিরুদ্ধে দেওয়ানি প্রক্রিয়ায় জরিমানা আদায়ের ব্যবস্থাও করা যায়।

তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। জরিমানা অনাদায়ে কারাদণ্ডের বিধান থাকলে এবং আসামি সেই ‘default imprisonment’-এর পুরো সময় ভোগ করে ফেললে, সাধারণ নিয়মে শুধু সেই জরিমানা আদায়ের জন্য পুনরায় ওয়ারেন্ট জারি করা যাবে না। তবে বিশেষ কারণ থাকলে আদালত লিখিতভাবে কারণ উল্লেখ করে ব্যতিক্রমী ব্যবস্থা নিতে পারে।

তাই ‘সাজা শেষ হলেই আবার চেকের টাকার জন্য অবশ্যই গ্রেপ্তার করা হবে’—এ কথাও সঠিক নয়।

জরিমানা আদায়ের প্রক্রিয়া কী?

আদালতের রায়ে যদি জরিমানা থাকে এবং সেই জরিমানা আদায়যোগ্য অবস্থায় থাকে, তাহলে আইন অনুযায়ী জরিমানা আদায়ের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।

ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৮৬ ধারায় দুটি গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতির কথা বলা হয়েছে—

প্রথমত, আসামির অস্থাবর সম্পত্তি ক্রোক করে বিক্রি করে জরিমানা আদায় করা যেতে পারে।

দ্বিতীয়ত, জেলা কালেক্টরের মাধ্যমে আসামির স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তি থেকে দেওয়ানি প্রক্রিয়ায় অর্থ আদায় করা যেতে পারে।

এ কারণে প্রচলিতভাবে যে বিষয়টিকে অনেকে ‘জরিমানা আদালত’ বলে উল্লেখ করেন, সেটিকে সরাসরি একটি স্বতন্ত্র নতুন ফৌজদারি মামলা হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। রায়ের ধরন, জরিমানার আদেশ এবং আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী জরিমানা আদায়ের নির্দিষ্ট execution/recovery প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়।

সম্পত্তি ক্রোক করে কি চেকের টাকা পাওয়া যেতে পারে?

আইনের নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় সম্পত্তি ক্রোক ও বিক্রির মাধ্যমে আদালতের আরোপিত জরিমানা আদায় করা সম্ভব। ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৮৬ ধারায় এ ধরনের attachment and sale-এর বিধান রয়েছে।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য মনে রাখতে হবে—জরিমানা আদায় এবং চেকের সম্পূর্ণ বকেয়া টাকা আদায় সবসময় একই বিষয় নয়।

কারণ, Negotiable Instruments Act-এর ১৩৮(৩) ধারা নিজেই বলছে, জরিমানার মাধ্যমে চেকের পুরো মূল্য উদ্ধার না হলে ধারক দেওয়ানি আদালতে নিজের দাবি প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন।

অর্থাৎ, চেকের অঙ্ক যদি বড় হয় কিন্তু আদালতে আদায়কৃত জরিমানা বা তার মাধ্যমে পাওয়া অর্থ দিয়ে পুরো পাওনা মেটে না, তাহলে অবশিষ্ট দাবির জন্য দেওয়ানি প্রতিকারের প্রশ্ন আসতে পারে।

একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে

ধরা যাক, একজন ব্যক্তি ১০ লাখ টাকার একটি চেক দিলেন। ব্যাংকে পর্যাপ্ত টাকা না থাকায় চেকটি ডিজঅনার হলো এবং ১৩৮ ধারায় মামলা হলো।

আদালত তাকে কারাদণ্ড ও জরিমানার সাজা দিলেন।

এখন আসামি কারাদণ্ডের পুরো সময় ভোগ করলেন।

এর অর্থ এই নয় যে—

‘১০ লাখ টাকার চেকটি বাতিল হয়ে গেল’ অথবা ‘বাদীর ১০ লাখ টাকা আর পাওনা নেই।’

বরং আইনের দৃষ্টিতে জরিমানা আদায়ের বিষয়টি আলাদাভাবে চলতে পারে। জরিমানা আদায় হলে আইন অনুযায়ী চেকের ধারককে চেকের অঙ্ক পর্যন্ত অর্থ দেওয়ার বিধান রয়েছে। আর পুরো অর্থ উদ্ধার না হলে দেওয়ানি আদালতের মাধ্যমে দাবি প্রতিষ্ঠার অধিকারও থাকে।

বাদীর করণীয় কী?

চেকের মামলায় রায় পাওয়ার পর বাদীর প্রথম কাজ হওয়া উচিত রায়ের প্রকৃত ভাষা ও আদালতের আরোপিত দণ্ড ভালোভাবে যাচাই করা

বিশেষ করে দেখতে হবে—

  • আদালত শুধু কারাদণ্ড দিয়েছেন, নাকি জরিমানাও করেছেন;
  • জরিমানার পরিমাণ কত;
  • জরিমানা অনাদায়ে অতিরিক্ত কারাদণ্ডের নির্দেশ আছে কি না;
  • রায়ে চেকের ধারকের অনুকূলে অর্থ প্রদানের বিষয়ে কী বলা হয়েছে;
  • জরিমানা আদায়ের জন্য কোনো ওয়ারেন্ট বা নির্দেশ দেওয়া হয়েছে কি না;
  • চেকের পুরো অর্থ উদ্ধার হয়েছে কি না।

এরপর সংশ্লিষ্ট আদালতের আইনজীবীর মাধ্যমে রায়ের execution/recovery-এর উপযুক্ত আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।

‘জেলে গেছে, তাই টাকা দিতে হবে না’—এই ধারণা কেন ভুল?

কারাদণ্ড মূলত অপরাধের জন্য রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দেওয়া শাস্তি। অন্যদিকে চেকের অর্থ পাওয়ার বিষয়টি হচ্ছে আর্থিক দাবি

এই দুইয়ের মধ্যে আইনি সম্পর্ক থাকলেও দুটিকে এক করে দেখা ঠিক নয়।

এ কারণেই Negotiable Instruments Act-এর ১৩৮ ধারায় একদিকে শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে, অন্যদিকে জরিমানা আদায় হলে চেকের ধারককে অর্থ দেওয়ার বিধান এবং টাকা পুরোপুরি উদ্ধার না হলে দেওয়ানি আদালতে দাবি করার অধিকার রাখা হয়েছে।

তবে দ্বিতীয়বার গ্রেপ্তারের বিষয়ে সতর্কতা জরুরি

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক সময় বলা হয়—‘চেকের মামলায় জেল খাটার পরও বাদী জরিমানা আদালতে মামলা করলে আসামিকে আবার গ্রেপ্তার করা যাবে এবং সম্পত্তি বিক্রি করে টাকা আদায় হবে।’

এ বক্তব্যকে সরাসরি সার্বজনীন নিয়ম হিসেবে প্রচার করা ঠিক নয়।

কারণ, দ্বিতীয়বার গ্রেপ্তার করা যাবে কি না তা নির্ভর করবে কোন আদেশের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, জরিমানা আদায়ের অবস্থা কী, default sentence ভোগ করা হয়েছে কি না এবং সংশ্লিষ্ট আদালতের আদেশ কী—এসব বিষয়ের ওপর।

বিশেষ করে ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৮৬ ধারায় default imprisonment পুরোপুরি ভোগ করার পর জরিমানা আদায়ের জন্য নতুন করে warrant জারির বিষয়ে স্পষ্ট সীমাবদ্ধতা রয়েছে; বিশেষ কারণ থাকলে লিখিত কারণ দেখিয়ে ব্যতিক্রমী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগও রাখা হয়েছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা

চেকের মামলায় ‘কারাদণ্ড ভোগ = চেকের টাকা মাফ’—এটি সঠিক আইনি ধারণা নয়।

আবার ‘কারাদণ্ড শেষ = অবশ্যই দ্বিতীয়বার গ্রেপ্তার’—এটিও সঠিক নয়।

আইন অনুযায়ী বিষয়টি কয়েকটি ধাপে দেখতে হবে—

চেক ডিজঅনার → ১৩৮ ধারায় মামলা → আদালতের রায় → কারাদণ্ড/জরিমানা → জরিমানা আদায় → আদায়কৃত অর্থ থেকে ধারকের পাওনা → পুরো অর্থ উদ্ধার না হলে দেওয়ানি প্রতিকার।

বিশেষ করে Negotiable Instruments Act-এর ১৩৮(৩) ধারাটি বাদীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সেখানে জরিমানার মাধ্যমে পুরো চেকের মূল্য উদ্ধার না হলে দেওয়ানি আদালতে দাবি প্রতিষ্ঠার অধিকার সংরক্ষণ করা হয়েছে।

আইনজীবীদের পরামর্শ

চেকের মামলায় রায় পাওয়ার পর শুধু আসামি জেলে গেছে কি না—এটি দেখেই বসে থাকা উচিত নয়। রায়ের certified copy সংগ্রহ করে আদালতের আদেশে কারাদণ্ড, জরিমানা ও জরিমানা অনাদায়ের default sentence কীভাবে নির্ধারিত হয়েছে তা যাচাই করা জরুরি।

এরপর কোন recovery mechanism প্রযোজ্য হবে—জরিমানা আদায়ের প্রক্রিয়া, আদালতের execution, নাকি অবশিষ্ট পাওনার জন্য দেওয়ানি মামলা—তা মামলার রায় ও নির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে আইনজীবীর মাধ্যমে নির্ধারণ করা উচিত।

সুতরাং, চেকের মামলায় আসামি সম্পূর্ণ সাজা ভোগ করলেই বাদীর টাকা স্বয়ংক্রিয়ভাবে মাফ হয়ে যায় না; কিন্তু একই সঙ্গে সাজা শেষ হওয়ার পর তাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে দ্বিতীয়বার গ্রেপ্তার করা যাবে—এমন সরল নিয়মও নেই। বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে টাকা আদায়ের পথ নির্ভর করে আদালতের রায়, জরিমানার আদেশ এবং পরবর্তী আইনগত recovery প্রক্রিয়ার ওপর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *