জমির দলিল, খতিয়ান, নামজারি ও ভূমি উন্নয়ন করের কাগজপত্র থাকার পরও যদি কোনো ব্যক্তি আদালত বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আদেশ ছাড়া জোরপূর্বক কাউকে তার দখলীয় জমি থেকে উচ্ছেদ বা বেদখল করেন, তাহলে ভুক্তভোগীর জন্য প্রশাসনিকভাবে দখল পুনরুদ্ধারের একটি বিশেষ আইনি ব্যবস্থা রয়েছে। ‘ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৩’-এর ৮ ধারার পাশাপাশি ‘ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিধিমালা, ২০২৪’-এর অধীনে নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় দায়িত্বপ্রাপ্ত এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে আবেদন করা যায়।
কোন পরিস্থিতিতে এই আইনের আশ্রয় নেওয়া যাবে
আইনের ৮ ধারার মূল বিষয় হলো—কোনো ব্যক্তিকে উপযুক্ত আদালত বা কর্তৃপক্ষের আদেশ ছাড়া তার দখলীয় ভূমি থেকে উচ্ছেদ বা দখলচ্যুত করা হলে তিনি দখল পুনরুদ্ধারের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে আবেদন করতে পারবেন। ২০২৪ সালের বিধিমালায় এ আবেদনের পদ্ধতি ও নিষ্পত্তির কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে।
অর্থাৎ শুধু জমির মালিকানার কাগজ থাকলেই বিষয়টি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ৮ ধারার আবেদন হিসেবে গ্রহণ হবে—এমন নয়। এখানে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলো আবেদনকারীর পূর্ববর্তী বৈধ দখল এবং বেআইনিভাবে সেই দখলচ্যুত হওয়ার বিষয়টি প্রমাণ করা। এ কারণেই আবেদনপত্রে জমির কাগজপত্রের পাশাপাশি দখলের ইতিহাস, দখলচ্যুত করার ঘটনা ও সংশ্লিষ্ট প্রমাণ দিতে বলা হয়েছে।
কোথায় আবেদন করতে হবে
ভুক্তভোগীকে দায়িত্বপ্রাপ্ত এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে আবেদন করতে হবে। ২০২৪ সালের বিধিমালা অনুযায়ী, অবৈধভাবে দখলচ্যুত ব্যক্তির দখল পুনরুদ্ধারের জন্য প্রয়োজনীয় দলিলাদিসহ আবেদন করার সুযোগ রয়েছে।
সরকার ২০২৪ সালের ২৪ অক্টোবর ‘ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিধিমালা, ২০২৪’ জারি করে। একই বিধিমালার অধীনে দখল পুনরুদ্ধারের আবেদন ও নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া নির্ধারণ করা হয়েছে।
নির্ধারিত ফরমেই করতে হবে আবেদন
আপলোড করা বাংলাদেশ গেজেটের ২৪ অক্টোবর ২০২৪-এর নথিতে ‘পরিশিষ্ট-৫’ হিসেবে ‘দখল পুনরুদ্ধারের আবেদন’ শিরোনামে নির্ধারিত ফরম দেওয়া হয়েছে। সেখানে আবেদনকারীর পরিচয়, প্রতিপক্ষের তথ্য, জমির তফসিল, মালিকানা ও দখলের তথ্য এবং দখলচ্যুত হওয়ার বিস্তারিত বিবরণ দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।
বিধিমালার নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় এই ফরম ব্যবহার করে আবেদন করলে প্রশাসনের কাছে বিরোধের প্রকৃতি ও প্রমাণগুলো সুসংগঠিতভাবে উপস্থাপন করা সম্ভব হয়।
আবেদনে যেসব তথ্য দিতে হবে
গেজেটে প্রকাশিত পরিশিষ্ট-৫-এর ফরম অনুযায়ী, আবেদনকারীকে জমি ও দখলসংক্রান্ত বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে—
- জমির পূর্ণ তফসিল—জেলা, থানা, মৌজা, জে.এল. নম্বর, খতিয়ান নম্বর, দাগ নম্বর ও জমির পরিমাণ;
- সর্বশেষ জরিপে প্রকাশিত খতিয়ান নম্বর ও সংশ্লিষ্ট রেকর্ডীয় মালিকের নাম;
- সর্বশেষ নামজারি খতিয়ান নম্বর ও সংশ্লিষ্ট মালিকের নাম;
- নামজারি খতিয়ানের রেকর্ড বা খতিয়ানসংক্রান্ত তথ্য;
- সর্বশেষ রেকর্ডীয় মালিকের কাছ থেকে আবেদনকারীর মালিকানা বা দখলে আসার ধারাবাহিকতার বিবরণ;
- আদালতের আদেশে মালিকানা বা দখল লাভ করে থাকলে তার বিবরণ;
- আবেদনকারী আনুমানিক কত সময় ধরে এবং কীভাবে জমিটি দখলে রেখেছিলেন;
- জমিতে কোনো স্থাপনা থাকলে তার বিবরণ;
- প্রতিপক্ষ কখন এবং কীভাবে জমিটি দখল করেছে বা দখলচ্যুত করেছে;
- জমিটি যৌথভাবে/এজমালি দখলে ছিল কি না;
- একই জমি নিয়ে কোনো দেওয়ানি মামলা চলমান থাকলে তার বিবরণ ও বর্তমান অবস্থা;
- দাবির পক্ষে অন্যান্য প্রমাণ ও তথ্য।
এ কারণে আবেদন করার আগে শুধু মূল দলিল নয়, জমির মালিকানা ও পূর্বদখলের সম্পূর্ণ ধারাবাহিক কাগজপত্র প্রস্তুত রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
আবেদনের সঙ্গে কী কী কাগজপত্র লাগতে পারে
পরিশিষ্ট-৫-এর সঙ্গে সংযুক্ত করার জন্য যে ধরনের দলিলপত্রের কথা বলা হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে—
১. সর্বশেষ জরিপে প্রকাশিত খতিয়ান ও সংশ্লিষ্ট মালিকের তথ্য।
২. সর্বশেষ নামজারি খতিয়ান, ডিসিআর ও দাখিলা।
৩. প্রযোজ্য ক্ষেত্রে জমি হস্তান্তরের দলিল।
৪. উত্তরাধিকার সূত্রে মালিকানা হলে উত্তরাধিকার সনদ।
৫. উত্তরাধিকারসূত্রে বা অন্য কোনোভাবে পাওয়া জমির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রমাণপত্র।
৬. আদালতের রায়, ডিক্রি বা আদেশের কপি—যদি মালিকানা বা দখলের সঙ্গে আদালতের আদেশ সংশ্লিষ্ট থাকে।
৭. প্রতিপক্ষের নাম, বর্তমান ঠিকানা ও মোবাইল নম্বরসহ প্রয়োজনীয় তথ্য।
৮. দখলচ্যুত হওয়ার ঘটনা প্রমাণের জন্য ছবি, ভিডিও, সাক্ষ্য বা অন্যান্য তথ্য-উপাত্ত—যদি থাকে।
৯. আবেদনের প্রয়োজনীয় সংখ্যক ফটোকপি এবং প্রযোজ্য ফি।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন ভূমিসেবা নির্দেশনাতেও জমির মালিকানা ও নামজারির ক্ষেত্রে খতিয়ান, দলিল, দাখিলা এবং সংশ্লিষ্ট প্রমাণপত্র সংরক্ষণ ও দাখিলের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে।
৩ মাসের বিষয়টি কীভাবে বুঝতে হবে
এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় রয়েছে। প্রচলিতভাবে বলা হচ্ছে, ‘৩ মাসের মধ্যে জমি ফেরত পাওয়া যাবে’। তবে আইনের ভাষা আরও নির্দিষ্ট।
আইনের ৮ ধারার অধীনে আবেদন পাওয়ার পর ৩ মাসের মধ্যে আবেদনটি নিষ্পত্তি করতে হবে এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে দখল পুনরুদ্ধার করতে হবে। অর্থাৎ ৩ মাস হলো আবেদন নিষ্পত্তির আইনগত সময়সীমা; প্রতিটি মামলায় কোনো শর্ত ছাড়াই ঠিক ৯০ দিনের মধ্যে জমি হাতে তুলে দেওয়ার নিশ্চয়তা হিসেবে বিষয়টি ব্যাখ্যা করা ঠিক হবে না।
আবেদন গ্রহণের পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ঘটনা, দখল, দলিলপত্র ও উভয় পক্ষের বক্তব্য বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারেন।
প্রতিপক্ষকে আদেশ দেওয়ার পরও দখল না ছাড়লে কী হবে
২০২৪ সালের বিধিমালায় এ বিষয়েও গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। নালিশী ভূমির দখল হস্তান্তরের জন্য প্রতিপক্ষকে আদেশ দেওয়ার পর ১৫ দিনের মধ্যে তিনি দখল হস্তান্তর না করলে, এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট আবেদনকারীকে দখলে পুনর্বহালের জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তার আদেশ দিতে পারেন।
অর্থাৎ শুধু আদেশ দেওয়ার মধ্যেই প্রক্রিয়াটি শেষ নয়; প্রতিপক্ষ আদেশ অমান্য করলে নির্ধারিত আইনি প্রক্রিয়ায় পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তায় দখল পুনর্বহালের ব্যবস্থাও নেওয়া যেতে পারে।
জোর করে উচ্ছেদের আশঙ্কা থাকলেও আবেদন করা যায়
শুধু বেদখল হওয়ার পরই ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ নেই। বিধিমালায় অবৈধ দখল প্রতিরোধের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
কোনো আইনানুগ দখলদারকে আদালত বা কর্তৃপক্ষের আদেশ ছাড়া তার দখলীয় ভূমি থেকে উচ্ছেদ করার চেষ্টা করা হলে, উচ্ছেদের হুমকি দেওয়া হলে কিংবা তাকে জমিতে প্রবেশ বা দখলে বাধা দেওয়া হলে, প্রয়োজনীয় দলিলপত্রসহ দায়িত্বপ্রাপ্ত এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আবেদন করা যায়।
অর্থাৎ জমি পুরোপুরি হাতছাড়া হওয়ার অপেক্ষা না করে, বেআইনি উচ্ছেদের চেষ্টা বা হুমকির পর্যায়েও আইনগত প্রতিকার চাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
দেওয়ানি মামলা চলমান থাকলে গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা
তবে এই আইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা মনে রাখা জরুরি। একই বিষয়ে কোনো দেওয়ানি আদালতে দখল পুনরুদ্ধার সংক্রান্ত মামলা বিচারাধীন থাকলে ৮ ধারার অধীনে একই বিষয়ে প্রশাসনিক প্রতিকার গ্রহণের ক্ষেত্রে বাধা রয়েছে।
তাই একই জমি নিয়ে আগে থেকেই দেওয়ানি মামলা চললে নতুন করে ৮ ধারায় আবেদন করার আগে আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একই বিষয়ে একাধিক ফোরামে সমান্তরাল কার্যক্রম পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
মালিকানার কাগজপত্র গুছিয়ে রাখাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
জমি নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে অনেকেই শুধু রেজিস্ট্রি দলিলকে মালিকানার একমাত্র প্রমাণ মনে করেন। বাস্তবে জমির ইতিহাস ও দখল প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে দলিলের পাশাপাশি খতিয়ান, নামজারি, দাখিলা, ডিসিআর, পূর্ববর্তী মালিকানা হস্তান্তরের দলিল, উত্তরাধিকার সনদ, আদালতের আদেশ এবং বাস্তব দখলের প্রমাণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের অনলাইন মিউটেশন নির্দেশনাতেও মালিকানা-সংক্রান্ত ধারাবাহিকতা, দলিল, খতিয়ান, ভূমি উন্নয়ন করের দাখিলা এবং অন্যান্য প্রমাণপত্রের গুরুত্ব উল্লেখ করা হয়েছে।
তাই জমির মালিকদের উচিত দলিলপত্র নিরাপদে সংরক্ষণের পাশাপাশি খতিয়ান, নামজারি, ভূমি উন্নয়ন করের রশিদ এবং দখলসংক্রান্ত প্রমাণ নিয়মিত হালনাগাদ রাখা।
শেষ কথা
জমির বৈধ মালিক বা আইনানুগ দখলদারকে আদালত বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আদেশ ছাড়া জোরপূর্বক উচ্ছেদ করা হলে এখন প্রতিকারের একটি নির্দিষ্ট প্রশাসনিক পথ রয়েছে। ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৩-এর ৮ ধারা এবং ২০২৪ সালের বিধিমালার নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুযায়ী দায়িত্বপ্রাপ্ত এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে দখল পুনরুদ্ধারের আবেদন করা যায়।
তবে মনে রাখতে হবে—৩ মাসের বিধানটি আবেদন নিষ্পত্তির সময়সীমা; এটি প্রতিটি ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ৯০ দিনের মধ্যে জমি ফেরত পাওয়ার নিশ্চয়তা নয়। আবেদনের সাফল্য নির্ভর করবে পূর্বদখল, দলিলপত্র, খতিয়ান, নামজারি, দাখিলা, উচ্ছেদের ঘটনা এবং অন্যান্য প্রমাণের ওপর। একই বিষয়ে দেওয়ানি মামলা বিচারাধীন থাকলেও বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন।
ভুক্তভোগী চাইলে আপলোড করা গেজেটে থাকা ‘পরিশিষ্ট-৫: দখল পুনরুদ্ধারের আবেদন’ ফরমের কাঠামো অনুসরণ করে প্রয়োজনীয় তথ্য ও দলিল সংযুক্ত করে আবেদন প্রস্তুত করতে পারেন। জটিল মালিকানা বিরোধ, একাধিক ওয়ারিশ, জাল দলিল বা চলমান মামলার ক্ষেত্রে আবেদন করার আগে ভূমি আইন বিষয়ে অভিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া নিরাপদ।
ভূমি-সংক্রান্ত সরকারি সহায়তার জন্য ভূমি মন্ত্রণালয়ের ১৬১২২ হটলাইনেও যোগাযোগ করা যায়।

