পিতার মৃত্যুর পর রেখে যাওয়া জমি-জমা সন্তানদের মধ্যে কীভাবে ভাগ হবে—এটি বাংলাদেশের পরিবারগুলোর মধ্যে বহুল আলোচিত একটি বিষয়। বিশেষ করে কোনো পরিবারে একজন ছেলে ও একজন মেয়ে থাকলে কে কতটুকু সম্পত্তি পাবেন, তা নিয়ে অনেকের মধ্যেই বিভ্রান্তি রয়েছে।
২০২৬ সালের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি বুঝতে হলে প্রথমেই জানতে হবে—উত্তরাধিকারীর ধর্ম, পিতার মৃত্যুর সময় জীবিত অন্যান্য ওয়ারিশ এবং সম্পত্তির ধরন—এই তিনটি বিষয় সম্পত্তির চূড়ান্ত বণ্টনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
মুসলিম পরিবারে ১ ছেলে ও ১ মেয়ের ক্ষেত্রে কী হয়?
বাংলাদেশে মুসলিমদের অন্তঃস্বত্ব উত্তরাধিকার বিষয়ে মুসলিম ব্যক্তিগত আইন (শরিয়ত) প্রযোজ্য। ১৯৩৭ সালের মুসলিম ব্যক্তিগত আইন (শরিয়ত) প্রয়োগ আইনের ২ ধারায় উত্তরাধিকারসহ বিভিন্ন বিষয়ে মুসলিম ব্যক্তিগত আইন প্রয়োগের কথা বলা হয়েছে। তবে একই ধারায় কৃষিজমি বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যতিক্রম রাখা হয়েছে।
সাধারণ মুসলিম উত্তরাধিকার হিসাবের ক্ষেত্রে একই স্তরের একজন ছেলে ও একজন মেয়ে থাকলে ছেলের অংশ মেয়ের দ্বিগুণ হয়।
অর্থাৎ, যদি পিতার মৃত্যুর সময় কেবল—
- ১ ছেলে
- ১ মেয়ে
উত্তরাধিকারী হিসেবে থাকেন এবং অন্য কোনো বৈধ ওয়ারিশের দাবি না থাকে, তাহলে হিসাব হবে ২ : ১।
সহজ হিসাব
মোট সম্পত্তিকে ৩টি সমান অংশ হিসেবে ধরা হলে—
| উত্তরাধিকারী | প্রাপ্য অংশ | শতাংশ |
|---|---|---|
| ছেলে | ২ অংশ | ৬৬.৬৭% |
| মেয়ে | ১ অংশ | ৩৩.৩৩% |
| মোট | ৩ অংশ | ১০০% |
উদাহরণ
ধরা যাক, পিতা ১২ শতাংশ জমি রেখে মারা গেলেন এবং উপরোক্ত শর্ত অনুযায়ী শুধু একজন ছেলে ও একজন মেয়ে ওয়ারিশ।
তাহলে—
ছেলের অংশ: ১২ × ২/৩ = ৮ শতাংশ
মেয়ের অংশ: ১২ × ১/৩ = ৪ শতাংশ
অর্থাৎ ১২ শতাংশ জমিতে ছেলে ৮ শতাংশ এবং মেয়ে ৪ শতাংশ পাবেন।
আবার মোট জমি যদি ৯ শতাংশ হয়, তাহলে ছেলে পাবেন ৬ শতাংশ এবং মেয়ে পাবেন ৩ শতাংশ।
কিন্তু ‘শুধু ১ ছেলে ও ১ মেয়ে’ বললেই চূড়ান্ত হিসাব করা যায় না
এখানেই সবচেয়ে বেশি ভুল হয়। পিতার মৃত্যুর সময় তাঁর স্ত্রী, মা, বাবা বা অন্য কোনো বৈধ উত্তরাধিকারী জীবিত থাকলে সম্পত্তির হিসাব পরিবর্তিত হতে পারে।
তাই শুধু ছেলে-মেয়ের সংখ্যা দিয়ে জমির চূড়ান্ত হিসাব করা নিরাপদ নয়।
উদাহরণস্বরূপ, পিতার স্ত্রী জীবিত থাকলে তিনি উত্তরাধিকারী হিসেবে অংশ পেতে পারেন। একইভাবে পিতার বাবা-মা জীবিত থাকলেও তাঁদের অধিকার বিবেচনায় আসতে পারে। এরপর অবশিষ্ট সম্পত্তি সন্তানদের মধ্যে প্রযোজ্য নিয়ম অনুযায়ী বণ্টন করতে হয়।
এ কারণে বাস্তবে জমি ভাগ করার আগে মৃত ব্যক্তির সম্পূর্ণ ওয়ারিশ তালিকা তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ।
পিতা জীবিত থাকলে বিষয়টি আবার আলাদা
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য হলো—উত্তরাধিকার কার্যকর হয় মৃত্যুর পর।
পিতা জীবিত থাকা অবস্থায় তাঁর সম্পত্তি সন্তানদের মধ্যে ‘উত্তরাধিকার’ হিসেবে ভাগ হয়ে যায় না। জীবদ্দশায় তিনি বৈধভাবে দান, হেবা, বিক্রয় বা অন্যান্য আইনসম্মত উপায়ে সম্পত্তি হস্তান্তর করলে সেটি উত্তরাধিকার বণ্টনের হিসাব থেকে আলাদা বিষয় হতে পারে।
অতএব, ‘বাবার জমি’ বললেই সেটি বর্তমানে ছেলে-মেয়ের উত্তরাধিকার সম্পত্তি—এমনটি ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
পিতা মারা যাওয়ার আগেই কোনো ছেলে বা মেয়ে মারা গেলে?
এ ক্ষেত্রেও বিশেষ বিধান রয়েছে।
মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১-এর ৪ ধারায় বলা হয়েছে, উত্তরাধিকার খোলার আগে কোনো ছেলে বা মেয়ে মারা গেলে তাঁর জীবিত সন্তানরা নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সেই ছেলে বা মেয়ের প্রাপ্য অংশের সমপরিমাণ অংশ পেতে পারে।
অর্থাৎ, পরিবারের কোনো সন্তান পিতার আগেই মারা গেছেন কি না—এই তথ্যও উত্তরাধিকার হিসাবের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কৃষিজমির ক্ষেত্রে কেন সতর্ক হতে হবে?
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি বিষয় রয়েছে, যা অনেক সাধারণ হিসাবের মধ্যে বাদ পড়ে যায়।
১৯৩৭ সালের মুসলিম ব্যক্তিগত আইন (শরিয়ত) প্রয়োগ আইনের ২ ধারায় মুসলিমদের অন্তঃস্বত্ব উত্তরাধিকার বিষয়ে শরিয়ত আইনের প্রয়োগের কথা বলা হলেও ‘agricultural land’ বা কৃষিজমিকে ওই ধারার সরাসরি প্রয়োগ থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
ফলে বাড়ির জমি, অকৃষি জমি এবং কৃষিজমির ক্ষেত্রে একই সূত্র যান্ত্রিকভাবে প্রয়োগ করা উচিত নয়।
কোন জমি কৃষিজমি হিসেবে গণ্য হবে, জমির শ্রেণি কী, খতিয়ানে কীভাবে রেকর্ড আছে এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ভূমি আইন কী বলছে—এসব যাচাই করা প্রয়োজন।
ভাই-বোন নিজেরা সমঝোতা করে জমি ভাগ করতে পারবেন?
উত্তরাধিকার সূত্রে প্রত্যেকের আইনগত অংশ নির্ধারিত হওয়ার পর উত্তরাধিকারীরা পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে জমির বাস্তব দখল বা পৃথক অংশ নির্ধারণ করতে পারেন। তবে শুধু মৌখিক সমঝোতার ওপর নির্ভর না করে প্রয়োজনীয় দলিল, ওয়ারিশান সনদ, খতিয়ান, নামজারি ও রেজিস্ট্রেশন-সংক্রান্ত বিষয় সঠিকভাবে সম্পন্ন করা গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ উত্তরাধিকার সূত্রে অংশ পাওয়া এবং নির্দিষ্ট দাগের নির্দিষ্ট জমি নিজের নামে পৃথকভাবে রেকর্ড হওয়া—দুটি একই বিষয় নয়।
জমি ভাগ করার আগে যে তথ্যগুলো যাচাই করবেন
পিতার সম্পত্তি ভাগের সময় অন্তত নিচের বিষয়গুলো যাচাই করা উচিত—
১. পিতার মৃত্যুর তারিখ
২. মৃত্যুর সময় জীবিত সব উত্তরাধিকারীর তালিকা
৩. স্ত্রী জীবিত ছিলেন কি না
৪. পিতার বাবা-মা জীবিত ছিলেন কি না
৫. মোট ছেলে ও মেয়ের সংখ্যা
৬. কোনো ছেলে বা মেয়ে পিতার আগে মারা গেছেন কি না
৭. মৃত সন্তানের সন্তান রয়েছে কি না
৮. জমি কৃষিজমি নাকি অকৃষি জমি
৯. খতিয়ান ও দাগ নম্বর
১০. জমির মোট পরিমাণ
১১. আগের কোনো দান, হেবা, বিক্রয় বা বণ্টন হয়েছে কি না
১২. ঋণ বা অন্যান্য আইনগত দায় ছিল কি না
১ ভাই ও ১ বোনের সবচেয়ে সহজ হিসাব
যদি মুসলিম পরিবারের ক্ষেত্রে ধরে নেওয়া হয় যে পিতার মৃত্যুর পর অন্য কোনো ওয়ারিশ নেই এবং সম্পত্তিটি এমন ধরনের সম্পত্তি যার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মুসলিম উত্তরাধিকার নিয়ম প্রযোজ্য, তাহলে—
১ ভাই : ১ বোন = ২ : ১
অর্থাৎ মোট ৩ ভাগের মধ্যে—
ভাই = ২ ভাগ
বোন = ১ ভাগ
তবে এটিকে সব পরিবারের জন্য একই চূড়ান্ত নিয়ম হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। কারণ বাংলাদেশের উত্তরাধিকার আইন ধর্মভেদে ভিন্ন এবং মুসলিম উত্তরাধিকারেও জীবিত অন্যান্য ওয়ারিশ ও সম্পত্তির ধরন অনুযায়ী হিসাব পরিবর্তিত হতে পারে। মুসলিমদের ক্ষেত্রে ১৯৩৭ সালের আইনের পাশাপাশি ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের বিশেষ বিধানও প্রাসঙ্গিক।
শেষ কথা
পিতার সম্পত্তি ভাগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভুল হলো শুধু “ছেলে দ্বিগুণ, মেয়ে অর্ধেক”—এই একটি সূত্র ধরে পুরো জমির হিসাব করে ফেলা। বাস্তবে প্রথমে মৃত ব্যক্তির সম্পূর্ণ ওয়ারিশ তালিকা, এরপর সম্পত্তির ধরন, তারপর প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী প্রত্যেকের অংশ নির্ধারণ করতে হয়।
বিশেষ করে কৃষিজমি হলে অতিরিক্ত সতর্কতা প্রয়োজন, কারণ মুসলিম ব্যক্তিগত আইন (শরিয়ত) প্রয়োগ আইনের ২ ধারাতেই কৃষিজমি নিয়ে পৃথক ব্যতিক্রম রয়েছে।
তাই বড় পরিমাণ জমি বা বিরোধপূর্ণ সম্পত্তির ক্ষেত্রে স্থানীয় ভূমি অফিসের রেকর্ড এবং প্রয়োজন হলে আইনজীবীর পরামর্শ নিয়ে ওয়ারিশ নির্ধারণ, হিস্যা নির্ধারণ, নামজারি ও বণ্টন সম্পন্ন করাই নিরাপদ পদ্ধতি।

