পে স্কেল নিউজ ২০২৬

নবম পে-স্কেল ২০২৬: বাড়ি ভাড়া ভাতায় বড় পরিবর্তন, কমছে হার—তবে বাড়তে পারে টাকার অঙ্ক

নবম জাতীয় পে-স্কেল ২০২৬ ঘিরে সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনার বিষয়গুলোর একটি হলো বাড়ি ভাড়া ভাতা। নতুন বেতন কাঠামোয় মূল বেতন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর প্রস্তাব থাকলেও বাড়ি ভাতার ক্ষেত্রে আগের মতো একই শতাংশ বহাল রাখা হচ্ছে না। বরং গ্রেড ও কর্মস্থলের এলাকা অনুযায়ী বাড়ি ভাতার হার কমিয়ে নতুন কাঠামো নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে

সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, নতুন কাঠামোয় বাড়ি ভাড়া ভাতা সর্বোচ্চ ৬০ শতাংশ এবং সর্বনিম্ন ২৫ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—শতাংশ কমলেও নতুন পে-স্কেলে মূল বেতন বড় হওয়ায় অনেক কর্মচারীর হাতে পাওয়া বাড়ি ভাতার টাকার পরিমাণ আগের তুলনায় বাড়তে পারে।

নতুন বাড়ি ভাড়ার হার কত?

সচিব কমিটির সুপারিশে গ্রেড ও এলাকা অনুযায়ী বাড়ি ভাতার চারটি স্তর করা হয়েছে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী কাঠামোটি হলো—

গ্রেডঢাকা সিটি করপোরেশনঅন্যান্য বড় শহর ও সাভারঅন্যান্য এলাকা
১৬–২০ গ্রেড৬০%৫০%৪৫%
১০–১৫ গ্রেড৫০%৪০%৩৫%
৫–৯ গ্রেড৪৫%৩৫%৩০%
১–৪ গ্রেড৪০%৩০%২৫%

অর্থাৎ, নতুন কাঠামোয় গ্রেড যত ওপরে উঠবে, মূল বেতনের শতাংশ হিসেবে বাড়ি ভাতার হার তত কমবে। বিপরীতে নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য বাড়ি ভাতার শতাংশ তুলনামূলক বেশি রাখা হয়েছে।

বর্তমানে কী আছে?

বর্তমান কাঠামোয় ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকায় গ্রেডভেদে বাড়ি ভাড়া ভাতার হার প্রায় ৫০ থেকে ৬৫ শতাংশ পর্যন্ত। অন্যান্য সিটি করপোরেশন ও সাভারে তা ৪০ থেকে ৫৫ শতাংশ, আর অন্যান্য এলাকায় ৩৫ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত রয়েছে।

নতুন কাঠামোয় এই সীমা কমিয়ে ঢাকায় ৪০–৬০ শতাংশ, অন্যান্য বড় শহর ও সাভারে ৩০–৫০ শতাংশ এবং অন্যান্য এলাকায় ২৫–৪৫ শতাংশ করার প্রস্তাব এসেছে।

ফলে প্রথম দেখায় মনে হতে পারে, সরকারি চাকরিজীবীদের বাড়ি ভাতা কমে যাচ্ছে। কিন্তু বাস্তব হিসাব করতে হলে শুধু শতাংশ নয়, নতুন মূল বেতন কত হচ্ছে—সেটিও বিবেচনা করতে হবে।

শতাংশ কমলেও টাকার অঙ্ক কেন বাড়তে পারে?

ধরা যাক, কোনো কর্মচারীর বর্তমান মূল বেতন ৩০ হাজার টাকা এবং তিনি ৫০ শতাংশ বাড়ি ভাতা পান। তাহলে বাড়ি ভাতা হচ্ছে—

৩০,০০০ × ৫০% = ১৫,০০০ টাকা।

অন্যদিকে নতুন পে-স্কেলে যদি তাঁর মূল বেতন বেড়ে ৫০ হাজার টাকা হয় এবং বাড়ি ভাতার হার ৪৫ শতাংশ নির্ধারিত হয়, তাহলে বাড়ি ভাতা হবে—

৫০,০০০ × ৪৫% = ২২,৫০০ টাকা।

অর্থাৎ শতাংশ ৫০ থেকে ৪৫ শতাংশে কমলেও, বাড়ি ভাতার টাকার পরিমাণ ১৫ হাজার থেকে ২২ হাজার ৫০০ টাকা হতে পারে।

এই কারণেই নতুন পে-স্কেলের বাড়ি ভাতা বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে শুধু ‘শতাংশ কমেছে’—এমন হিসাব করলে পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না।

৯ম গ্রেডের চাকরিজীবীদের জন্য কী হতে পারে?

নতুন কাঠামো অনুযায়ী ৫ম থেকে ৯ম গ্রেড একই শ্রেণিতে রাখা হয়েছে।

ফলে ৯ম গ্রেডের একজন কর্মচারী—

  • ঢাকা সিটি করপোরেশনে: মূল বেতনের ৪৫%
  • অন্যান্য বড় শহর ও সাভারে: মূল বেতনের ৩৫%
  • অন্যান্য এলাকায়: মূল বেতনের ৩০%

বাড়ি ভাতা পাওয়ার প্রস্তাবিত কাঠামোর মধ্যে থাকবেন।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নতুন পে-স্কেলে ৯ম গ্রেডের মূল বেতন বর্তমানের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়লে বাড়ি ভাতার শতাংশ কমলেও প্রকৃত মাসিক সুবিধা কমবে কি না—তা নির্ভর করবে নতুন নির্ধারিত মূল বেতন এবং অন্যান্য ভাতার সম্মিলিত হিসাবের ওপর

বাড়ি ভাতা কবে থেকে কার্যকর হবে?

নতুন পে-স্কেলের মূল বেতন ১ জুলাই ২০২৬ থেকে ধাপে ধাপে কার্যকর করার পরিকল্পনা থাকলেও বাড়ি ভাড়াসহ বিভিন্ন ভাতা একই সময়ে কার্যকর হচ্ছে না।

সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, নতুন বাড়ি ভাড়া ভাতার কাঠামো ১ জানুয়ারি ২০২৮ থেকে কার্যকর করার কথা বলা হয়েছে।

অর্থাৎ ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে নতুন মূল বেতন কার্যকর হওয়ার বিষয়টি এবং ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে নতুন বাড়ি ভাতা কার্যকর হওয়ার বিষয়টি আলাদা করে দেখতে হবে।

কেন বাড়ি ভাতার শতাংশ কমানো হচ্ছে?

প্রকাশিত প্রতিবেদনে সচিব কমিটির সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, নতুন পে-স্কেলে মূল বেতন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়লে আগের হারে বাড়ি ভাতা নির্ধারণ করলে সরকারি আবাসন ও সংশ্লিষ্ট ব্যয়ের ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে। এ বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েই গ্রেড ও অঞ্চলভিত্তিক নতুন হার নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে।

অর্থাৎ বাড়ি ভাতার ক্ষেত্রে সরকারের কাঠামোগত চিন্তা হচ্ছে—মূল বেতন বড় আকারে বাড়ানো হবে, কিন্তু সেই বেতনের ওপর বাড়ি ভাতার শতাংশ আগের হারে বাড়ানো হবে না।

শুধু বাড়ি ভাতা নয়, অন্যান্য ভাতাতেও পরিবর্তন

নতুন পে-স্কেলে শুধু বাড়ি ভাতা নয়, চিকিৎসা, যাতায়াত, টিফিন ও মোবাইলসহ বিভিন্ন ভাতায় পরিবর্তনের তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। কিছু ভাতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাড়ি ভাতা ও উচ্চতর গ্রেডে বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে কম হার রাখার তথ্য এসেছে।

এ ছাড়া নতুন কাঠামোয় মোবাইল ভাতার ক্ষেত্রেও পরিবর্তনের তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। ফলে সরকারি চাকরিজীবীদের মোট মাসিক আয় নির্ধারণে শুধু মূল বেতন ও বাড়ি ভাতা নয়, সব ভাতা যোগ-বিয়োগ করে হিসাব করা প্রয়োজন।

তাহলে সরকারি কর্মচারীদের প্রকৃত লাভ-ক্ষতি কী?

এ প্রশ্নের উত্তর সবার জন্য এক হবে না।

একজন কর্মচারীর ক্ষেত্রে বাড়ি ভাতার হার কমলেও মূল বেতন যদি এত বেশি বাড়ে যে নতুন বাড়ি ভাতার টাকার অঙ্ক আগের চেয়ে বেশি হয়, তাহলে তিনি বাড়ি ভাতার দিক থেকে বেশি টাকা পেতে পারেন।

আবার উচ্চ গ্রেডের ক্ষেত্রে বাড়ি ভাতার শতাংশ তুলনামূলক কম হওয়ায় মূল বেতন বৃদ্ধির সঙ্গে বাড়ি ভাতার বৃদ্ধি কতটা হবে, সেটি আলাদাভাবে হিসাব করতে হবে।

তাই ‘বাড়ি ভাতা কমছে’ এবং ‘বাড়ি ভাতার টাকা কমছে’—এই দুটি বিষয় এক নয়।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—গেজেট

নতুন জাতীয় বেতন স্কেল নিয়ে অনুমোদনের খবর প্রকাশিত হলেও সেপ্টেম্বরের শুরুতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়েছিল যে প্রজ্ঞাপনের খসড়া আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং বা আইনি যাচাইয়ের পর্যায়ে ছিল।

তাই সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত সচিব কমিটির সুপারিশ ও অনুমোদিত কাঠামোর তথ্যের সঙ্গে চূড়ান্ত গেজেটের ভাষা ও কার্যকর তারিখ মিলিয়ে দেখা গুরুত্বপূর্ণ।

চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপন প্রকাশিত হলে বাড়ি ভাতার হার, কার্যকর তারিখ, কোন কোন এলাকা ‘অন্যান্য বড় শহর’ হিসেবে বিবেচিত হবে এবং প্রয়োগের বিস্তারিত নিয়ম আরও পরিষ্কার হবে।

সারসংক্ষেপ

নবম পে-স্কেল ২০২৬-এ বাড়ি ভাতা নিয়ে মূল পরিবর্তন হচ্ছে শতাংশভিত্তিক হার পুনর্বিন্যাস। প্রস্তাবিত কাঠামোয় ঢাকা সিটি করপোরেশনে সর্বোচ্চ হার ৬০ শতাংশ এবং সর্বনিম্ন ৪০ শতাংশ; অন্যান্য বড় শহর ও সাভারে ৫০ থেকে ৩০ শতাংশ এবং অন্যান্য এলাকায় ৪৫ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত হার রাখা হয়েছে।

অন্যদিকে মূল বেতন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর কারণে শতাংশ কমলেও অনেক ক্ষেত্রে বাড়ি ভাতার প্রকৃত টাকার অঙ্ক আগের চেয়ে বেশি হতে পারে

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, নতুন বাড়ি ভাতার হার ১ জানুয়ারি ২০২৮ থেকে কার্যকর হওয়ার কথা বলা হয়েছে। ফলে ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে মূল বেতন কার্যকর হওয়ার সঙ্গে বাড়ি ভাতার নতুন হার একই দিনে কার্যকর হচ্ছে না।

চূড়ান্ত হিসাব তাই গেজেট প্রকাশের পরই নিশ্চিত হবে। বর্তমান প্রকাশিত তথ্যকে সচিব কমিটির সুপারিশ ও অনুমোদিত পে-স্কেলের ভিত্তিতে সম্ভাব্য কাঠামো হিসেবে দেখা উচিত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *