আজকের খবর ২০২৬

সন্তানকে জমি দান করলেও দাতা পেলেন আজীবন ভোগাধিকার

সন্তানকে জমি বা বাড়ি দান করার পরও বাবা-মা কিংবা নির্দিষ্ট পারিবারিক সম্পর্কের দাতা জীবিত থাকা পর্যন্ত ওই সম্পত্তি ভোগ ও ব্যবহার করতে পারবেন। সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে ২০২৬ সালের নতুন আইন।

১৮৮২ সালের Transfer of Property Act সংশোধন করে ‘Transfer of Property (Amendment) Act, 2026’ প্রণয়ন করা হয়েছে। সরকারি আইনভাণ্ডারে এটি ২০২৬ সনের ১০৫ নম্বর আইন হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে। নতুন বিধানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—নির্দিষ্ট সম্পর্কের মধ্যে সম্পত্তি দান করলেও দাতার জীবনকালীন ভোগাধিকার সংরক্ষণের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

মালিকানা হস্তান্তর হলেও থাকবে আজীবন ভোগের অধিকার

নতুন আইনের মূল বিষয়টি সহজভাবে বললে, একজন বাবা তাঁর বাড়ি বা জমি ছেলের নামে দান করতে পারেন; কিন্তু দলিলে নির্ধারিত আইনি কাঠামোর মাধ্যমে তিনি জীবিত থাকা পর্যন্ত ওই সম্পত্তি ব্যবহার ও ভোগ করার অধিকার সংরক্ষণ করতে পারবেন।

অর্থাৎ এখানে সম্পত্তির মালিকানা এবং জীবনকালীন ভোগাধিকারকে আলাদাভাবে বিবেচনা করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন বিধান অনুযায়ী বাবা-মা সন্তানকে সম্পত্তি দান করলেও দাতা জীবিত থাকা পর্যন্ত সম্পত্তি ভোগ করতে পারবেন। একই ধরনের সুবিধা নির্দিষ্ট পারিবারিক সম্পর্কের অন্যান্য ক্ষেত্রেও রাখা হয়েছে।

কারা এই সুবিধা পাবেন?

নতুন বিধানের আওতায় নির্দিষ্ট পারিবারিক সম্পর্কের মধ্যে সম্পত্তি হস্তান্তরের সুযোগ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—

  • বাবা-মা ও সন্তানের মধ্যে সম্পত্তি দান;
  • দাদা-দাদি বা নানা-নানির সঙ্গে নাতি-নাতনির মধ্যে সম্পত্তি দান;
  • নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে সন্তান ও বাবা-মায়ের মধ্যে সম্পত্তি হস্তান্তর;
  • স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সম্পত্তি দান।

প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়েছে, এই নতুন ব্যবস্থার মাধ্যমে দাতা জীবিত থাকা পর্যন্ত সম্পত্তির ভোগ ও ব্যবহারের অধিকার সংরক্ষণ করতে পারবেন।

একটি উদাহরণে বিষয়টি পরিষ্কার

ধরা যাক, আব্দুল করিম তাঁর একটি বাড়ি ছেলের নামে দান করলেন। সাধারণভাবে সম্পত্তি দানের অর্থ হলো মালিকানা হস্তান্তর। কিন্তু নতুন আইনের আওতায় নির্ধারিত পদ্ধতিতে দলিলে যদি তাঁর জীবনকালীন ভোগাধিকার সংরক্ষণ করা হয়, তাহলে তিনি জীবিত থাকা পর্যন্ত ওই বাড়িতে বসবাস বা সম্পত্তি ভোগ করতে পারবেন।

এক্ষেত্রে ছেলের কাছে সম্পত্তির মালিকানা হস্তান্তর হলেও বাবার জীবনকালীন ভোগের অধিকার আলাদাভাবে সংরক্ষিত থাকবে।

আইনটির এই দিকটিই বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সম্পত্তি সন্তানকে দেওয়ার পর বাবা-মা যেন নিজেদের বসতবাড়ি বা সম্পত্তি ব্যবহারের অধিকার থেকে বঞ্চিত না হন—এই ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলার একটি আইনি পথ তৈরি হয়েছে।

গ্রহীতা আগে মারা গেলে কী হবে?

নতুন বিধানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, দাতা জীবিত থাকা অবস্থায় সম্পত্তির গ্রহীতা মারা গেলে সম্পত্তির পরবর্তী হস্তান্তর আইন অনুযায়ী গ্রহীতার উত্তরাধিকারীদের কাছে যাওয়ার বিধান রয়েছে।

সরকারি গেজেটের প্রকাশিত তথ্যেও বলা হয়েছে, দাতার জীবদ্দশায় গ্রহীতা মারা গেলে সম্পত্তি আইন অনুযায়ী গ্রহীতার উত্তরাধিকারীদের কাছে সঞ্চারিত হবে।

অর্থাৎ গ্রহীতার মৃত্যু ঘটলেই দাতার সংরক্ষিত জীবনকালীন ভোগাধিকার নিয়ে বিষয়টি স্বয়ংক্রিয়ভাবে শেষ হয়ে যাবে—এমন নয়। সংশ্লিষ্ট আইনি কাঠামো ও দলিলের শর্ত অনুযায়ী বিষয়টি বিবেচিত হবে।

দান করলেই কি দাতা মালিক থাকবেন?

এখানে একটি বিষয় পরিষ্কারভাবে বোঝা জরুরি। মালিকানা ও ভোগাধিকার এক নয়।

নতুন আইনের আলোচনায় যে বিষয়টি সামনে এসেছে তা হলো—সম্পত্তি দানের মাধ্যমে মালিকানা হস্তান্তরের পরও নির্দিষ্ট শর্তে দাতা তাঁর জীবদ্দশায় সম্পত্তি ব্যবহার ও ভোগের অধিকার রাখতে পারবেন।

তাই ‘জমি সন্তানকে দিয়ে দিলেও বাবা-মাই মালিক থাকবেন’—এভাবে সরলভাবে বলা ঠিক হবে না। বরং বলা যায়, মালিকানা হস্তান্তরের পাশাপাশি দাতার জীবনকালীন ভোগাধিকার সংরক্ষণের আইনগত সুযোগ রাখা হয়েছে।

নতুন আইনটি শুধু বাবা-মায়ের জন্য নয়

বিষয়টি শুধু বাবা-মা ও সন্তানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আইন নিয়ে প্রকাশিত ব্যাখ্যায় দাদা-দাদি, নানা-নানি, নাতি-নাতনি এবং স্বামী-স্ত্রীর মধ্যেও নির্দিষ্ট শর্তে এ ধরনের সম্পত্তি হস্তান্তরের সুযোগের কথা বলা হয়েছে।

ফলে নতুন বিধানটি পারিবারিক সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।

হেবা কি বাতিল হয়ে গেল?

নতুন আইন নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের আলোচনা থাকলেও হেবা, দান এবং অন্যান্য সম্পত্তি হস্তান্তরের পদ্ধতিকে এক করে দেখা উচিত নয়

নতুন আইনটি মূলত Transfer of Property Act-এর আওতায় একটি নির্দিষ্ট দেওয়ানি সম্পত্তি হস্তান্তরের কাঠামো তৈরি করেছে। আইনমন্ত্রীও এটিকে বিদ্যমান ব্যক্তিগত আইন পরিবর্তনের পরিবর্তে একটি পৃথক দেওয়ানি পথ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন বলে প্রতিবেদনে এসেছে।

তাই ‘নতুন আইন আসায় হেবা বন্ধ হয়ে গেছে’—এমন দাবি সরাসরি করা ঠিক হবে না।

কেন এই আইন গুরুত্বপূর্ণ?

বাংলাদেশে অনেক বাবা-মা জীবিত অবস্থায় সন্তানদের নামে জমি বা বাড়ি লিখে দেন। কিন্তু সম্পত্তি হস্তান্তরের পর দাতা নিজেই যদি ওই বাড়িতে বসবাস বা সম্পত্তি ব্যবহার করতে না পারেন, তাহলে পারিবারিক বিরোধ তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

নতুন বিধানের মাধ্যমে এমন একটি আইনি কাঠামো তৈরি করা হয়েছে, যেখানে দাতা সম্পত্তি হস্তান্তর করেও নিজের জীবনকালীন ব্যবহার ও ভোগের অধিকার সংরক্ষণ করতে পারবেন।

বিশেষ করে বয়স্ক বাবা-মায়ের জন্য এই বিধানটি গুরুত্বপূর্ণ বলে আইন ও সম্পত্তি-সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।

দলিল করার সময় কী বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে?

নতুন আইন কার্যকর হওয়ার পর জমি বা বাড়ি দানের ক্ষেত্রে শুধু দলিল করে দিলেই সব ঝুঁকি শেষ হয়ে যায় না। দাতা যদি জীবিত থাকা পর্যন্ত সম্পত্তি ব্যবহার করতে চান, তাহলে সংশ্লিষ্ট আইনি শর্ত ও দলিলের ভাষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

জমি দানের আগে সাধারণভাবে যাচাই করা প্রয়োজন—

১. জমির প্রকৃত মালিকানা কার নামে।
২. খতিয়ান ও পূর্ববর্তী দলিল সঠিক কি না।
৩. জমির ওপর কোনো মামলা, বন্ধক বা নিষেধাজ্ঞা আছে কি না।
৪. দাতা ও গ্রহীতার সম্পর্ক আইন অনুযায়ী নির্ধারিত শ্রেণির মধ্যে পড়ে কি না।
৫. দাতার জীবনকালীন ভোগাধিকার দলিলে কীভাবে সংরক্ষণ করা হবে।
৬. নিবন্ধনের সময় প্রযোজ্য কর ও ফি কত।
৭. নিবন্ধনের পর প্রয়োজনীয় নামজারি ও ভূমি রেকর্ড হালনাগাদ করা হয়েছে কি না।

নামজারি কি করতে হবে?

দান বা সম্পত্তি হস্তান্তরের পর নামজারি নিয়ে অনেকের মধ্যে ভুল ধারণা থাকে। দলিল নিবন্ধন এবং ভূমি রেকর্ডে নামজারি—দুটি আলাদা প্রশাসনিক বিষয়।

সম্পত্তি হস্তান্তরের পর নতুন মালিকের নামে ভূমি রেকর্ড হালনাগাদ করার জন্য প্রযোজ্য নিয়মে নামজারি করতে হয়। তবে দাতার জীবনকালীন ভোগাধিকার থাকলে দলিলের শর্ত এবং সংশ্লিষ্ট রেকর্ডে তার প্রতিফলন কীভাবে হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

তাই নতুন আইন অনুযায়ী দান করার ক্ষেত্রে শুধু দলিল লেখাই নয়, দলিলের ভাষা, নিবন্ধন, নামজারি এবং ভূমি রেকর্ড—সবকিছু সমন্বিতভাবে দেখা প্রয়োজন।

নতুন আইনে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন কী?

সবকিছু মিলিয়ে নতুন আইনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো—

সম্পত্তি দান করলেই দাতাকে জীবদ্দশায় সেই সম্পত্তির ব্যবহার থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হতে হবে—এমন পরিস্থিতির বিকল্প আইনি কাঠামো তৈরি হয়েছে।

অর্থাৎ, নির্দিষ্ট সম্পর্কের মধ্যে সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে মালিকানা হস্তান্তর এবং দাতার জীবনকালীন ভোগাধিকার—দুই বিষয়কে আলাদা করে সংরক্ষণের সুযোগ দেওয়া হয়েছে।

শেষ কথা

২০২৬ সালের Transfer of Property (Amendment) Act সম্পত্তি দানের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে। সন্তান, নাতি-নাতনি কিংবা নির্দিষ্ট পারিবারিক সম্পর্কের ব্যক্তির কাছে সম্পত্তি হস্তান্তর করেও দাতা জীবিত থাকা পর্যন্ত সম্পত্তি ভোগ ও ব্যবহারের অধিকার সংরক্ষণ করতে পারবেন—এটাই নতুন ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। আইনটি ২০২৬ সনের ১০৫ নম্বর আইন হিসেবে সরকারি আইনভাণ্ডারে প্রকাশিত হয়েছে।

তবে জমি দান বা হস্তান্তরের ক্ষেত্রে দলিলের ধরন, সম্পর্ক, সম্পত্তির প্রকৃতি, মালিকানার উৎস, ভোগাধিকার এবং প্রযোজ্য কর-ফি—সবকিছু যাচাই করা জরুরি। নির্দিষ্ট কোনো জমি বা দান দলিলের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিস এবং ভূমি আইনজীবীর কাছ থেকে দলিলভিত্তিক পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *