ভূমি মালিকানার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো নামজারি বা খারিজ। তবে অনেক সময়ই দেখা যায়, প্রকৃত মালিককে অন্ধকারে রেখে জাল দলিল, ভুয়া ওয়ারিশ সেজে কিংবা তথ্য গোপন করে একটি চক্র অবৈধভাবে জমির নামজারি করিয়ে নেয়। নিজের পৈতৃক বা ক্রয়কৃত সম্পত্তির এমন অবৈধ খারিজের কথা জানতে পেরে অনেকেই দিশেহারা হয়ে পড়েন। তবে আইনগতভাবে এই অবৈধ খারিজ বাতিল করার সুনির্দিষ্ট পথ রয়েছে।
সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসি ল্যান্ড অফিসে আবেদন করার পরও যদি কোনো সুরাহা না মেলে, তবে আইন অনুযায়ী পরবর্তী করণীয়গুলো বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. কোন কোন ক্ষেত্রে একটি খারিজ অবৈধ বলে গণ্য হয়?
ভূমি আইন অনুযায়ী, সুনির্দিষ্ট কিছু কারণে একটি নামজারি সম্পূর্ণ অবৈধ ও বাতিলযোগ্য হতে পারে:
জাল-জালিয়াতি: জাল দলিলের মাধ্যমে নামজারি করা হলে।
ভুয়া ওয়ারিশ: আসল ওয়ারিশদের বাদ দিয়ে বা ভুয়া ওয়ারিশ সেজে খারিজ করা হলে।
অগোচরে নামজারি: প্রকৃত মালিককে কোনো প্রকার নোটিশ না দিয়ে বা সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে খারিজ করা হলে।
আদালতের আদেশ অমান্য: কোনো জমির ওপর আদালতের নিষেধাজ্ঞা বা ‘স্ট্যাটাস কো’ থাকা সত্ত্বেও যদি খারিজ করা হয়।
ভুল তথ্য: ভুল দাগ নম্বর, খতিয়ান ব্যবহার করে কিংবা তথ্য গোপন ও প্রতারণার আশ্রয় নিলে।
২. প্রথম পদক্ষেপ: এসি ল্যান্ড অফিসে লিখিত আবেদন ও শুনানি
অবৈধ নামজারির বিষয়টি জানতে পারার পর প্রথম কাজ হলো সংশ্লিষ্ট এসি ল্যান্ড অফিসে মিউটেশন মিস কেস (Mutation Mis Case) বা নামজারি বাতিলের জন্য লিখিত আবেদন করা।
প্রয়োজনীয় কাগজপত্র: আবেদনের সাথে জমির মূল দলিলের কপি, পূর্ববর্তী খতিয়ান, পর্চা, হালনাগাদ খাজনার রসিদ, জাতীয় পরিচয়পত্রের (NID) কপি এবং জালিয়াতির সপক্ষে প্রামাণ্য দলিল বা আদালতের কোনো আদেশ থাকলে তা জমা দিতে হবে।
আবেদনের বিবরণ: আবেদনে স্পষ্ট করে উল্লেখ করতে হবে কীভাবে প্রতারণা করা হয়েছে, কোন কোন আইন লঙ্ঘন হয়েছে এবং কেন এই খারিজটি অবৈধ।
শুনানিতে উপস্থিতি: আবেদনের পর এসি ল্যান্ড অফিস থেকে উভয় পক্ষকে শুনানির জন্য ডাকা হবে। শুনানির দিন মূল কাগজপত্র ও প্রমাণাদি উপস্থাপন করতে হবে। প্রয়োজনে সাক্ষী বা জালিয়াতির অকাট্য প্রমাণ হাজির করতে হবে।
৩. এসি ল্যান্ড ব্যবস্থা না নিলে করণীয়: আপিল ও উচ্চতর কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ
অনেক সময় এসি ল্যান্ড অফিসে আবেদন করার পরও অজ্ঞাত কারণে খারিজ বাতিল করা হয় না কিংবা আবেদন খারিজ করে দেওয়া হয়। এমন পরিস্থিতিতে আইন আপনাকে থেমে থাকার অনুমতি দেয় না। আপনি পর্যায়ক্রমে উচ্চতর কর্তৃপক্ষের দ্বারেস্থ হতে পারেন:
উপজেলা নির্বাহী অফিসার (UNO): এসি ল্যান্ডের আদেশের বিরুদ্ধে বা নিষ্ক্রিয়তায় ইউএনও বরাবর লিখিত অভিযোগ করা যায়।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) বা ডিসি (DC) অফিস: রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনের ১৫০ ধারা অনুযায়ী, এসি ল্যান্ডের আদেশের বিরুদ্ধে ৩০ দিনের মধ্যে জেলা প্রশাসকের (রাজস্ব) কাছে আপিল দায়ের করা যায়।
বিভাগীয় কমিশনার: জেলা প্রশাসকের আদেশেও সন্তুষ্ট না হলে সংক্ষুব্ধ পক্ষ পরবর্তী নির্দেশনার জন্য বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে আপিল বা রিভিশন দায়ের করতে পারেন।
৪. দেওয়ানি ও ফৌজদারি আদালতে মামলা
প্রশাসনিকভাবে সমাধান না হলে বা ভূমির স্বত্ব (মালিকানা) নিয়ে জটিলতা তৈরি হলে আদালতের আশ্রয় নেওয়া চূড়ান্ত ও সবচেয়ে কার্যকর পথ।
দেওয়ানি মামলা: জমির মালিকানা ও দখল বজায় রাখতে দেওয়ানি আদালতে স্বত্ব ঘোষণা (Declaratory Suit), দলিল বাতিল, স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা কিংবা দখল পুনরুদ্ধারের মামলা করা যায়। আদালত থেকে মালিকানার ডিক্রি পেলে অবৈধ খারিজ স্বয়ংক্রিয়ভাবেই কার্যকারিতা হারায়।
ফৌজদারি মামলা: যারা ভুয়া কাগজ তৈরি করেছে, জালিয়াতি ও প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছে এবং সরকারি রেকর্ডে মিথ্যা তথ্য দিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪৬৭/৪৬৮/৪৭১/৪২০ ধারায় ফৌজদারি আদালতে সরাসরি মামলা করা যাবে।
৫. দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা ও তথ্য অধিকার আইনের ব্যবহার
যদি দেখা যায় ভূমি অফিসের কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী ঘুষ গ্রহণ, ক্ষমতার অপব্যবহার বা ইচ্ছাকৃতভাবে অবৈধ খারিজ বহাল রাখছেন, তবে সরাসরি দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ দায়ের করা যাবে।
এছাড়া, মামলা বা আপিল লড়তে গিয়ে যদি নামজারির মূল ফাইল বা নথিপত্রের প্রয়োজন হয়, তবে তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯ অনুযায়ী নির্দিষ্ট ফরমে আবেদন করে নামজারির আবেদনপত্র, শুনানির নোটিশ, আদেশের কপি এবং তদন্ত প্রতিবেদন সংগ্রহ করা অত্যন্ত সহজ।
গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা
ভূমি বিশেষজ্ঞদের মতে, “শুধুমাত্র একটি নামজারি বা খারিজ থাকলেই কেউ জমির চূড়ান্ত মালিক হয়ে যায় না।” মালিকানার মূল ভিত্তি হলো বৈধ মূল দলিল, পিঠ দলিল, সিএস-এসএ-আরএস সহ ধারাবাহিক রেকর্ড এবং জমির প্রকৃত দখল। তাই অবৈধ খারিজ দেখে আতঙ্কিত না হয়ে শান্ত মাথায় আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। ভূমি সংক্রান্ত যেকোনো লেনদেনে দালাল চক্র থেকে দূরে থাকুন এবং সবসময় লিখিত আবেদনের মাধ্যমে রসিদ সংগ্রহ করুন।
