BD Govt Service Rules

জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬: iBAS++-এ পে ফিক্সেশন নিয়ে গেজেটে যেসব নির্দেশনা, ধাপে ধাপে জেনে নিন

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন বেতন নির্ধারণের পদ্ধতি নিয়ে আর কোনো অস্পষ্টতা রাখেনি সরকার। জাতীয় বেতনস্কেল, ২০২৬-এর গেজেটে অনলাইনে Pay Fixation, iBAS++-এ লগইন, প্রয়োজনীয় তথ্য পূরণ, DDO-এর কাছে সাবমিশন, হিসাবরক্ষণ অফিসের যাচাই, Verification Number তৈরি এবং পরবর্তী সময়ে বেতন পরিশোধ—পুরো প্রক্রিয়াটি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ প্রকাশিত গেজেটে বলা হয়েছে, জাতীয় বেতনস্কেল, ২০২৬ জারির পর সরকারি কর্মচারীদের অনলাইনে বেতন নির্ধারণের জন্য iBAS++ সিস্টেমে প্রবেশ করে নির্ধারিত Pay Fixation অপশনে তথ্য পূরণ করতে হবে। একই দিন প্রকাশিত প্রতিবেদনে গেজেটের এই নির্দেশনাকে নতুন বেতন নির্ধারণের আনুষ্ঠানিক পদ্ধতি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

নতুন বেতন নির্ধারণ হবে iBAS++-এ

গেজেটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনার একটি হলো—নতুন জাতীয় বেতনস্কেল অনুযায়ী সরকারি কর্মচারীদের বেতন নির্ধারণ অনলাইনে করতে হবে।

এর জন্য iBAS++ সিস্টেমে লগইন করে Pay Fixation অপশনে যেতে হবে এবং নির্ধারিত ছকে প্রয়োজনীয় তথ্য পূরণ করতে হবে।

আগে ব্যবহৃত payfixation.gov.bd ওয়েবসাইটে কেউ প্রবেশ করলেও তাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে iBAS++-এর Pay Fixation অপশনে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ফলে নতুন বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে iBAS++-ই হবে মূল অনলাইন প্ল্যাটফর্ম।

গেজেটেড ও নন-গেজেটেড কর্মচারীর লগইন পদ্ধতি

গেজেটে iBAS++-এ প্রবেশের জন্য কর্মচারীর শ্রেণি অনুযায়ী আলাদা পদ্ধতি নির্ধারণ করা হয়েছে।

গেজেটেড সরকারি কর্মচারী iBAS++ Login User ID ও Password ব্যবহার করে সিস্টেমে প্রবেশ করবেন।

অন্যদিকে নন-গেজেটেড সরকারি কর্মচারী জাতীয় পরিচয়পত্রের (NID) নম্বর ও জন্মতারিখ ব্যবহার করে সিস্টেমে প্রবেশ করবেন।

লগইনের ক্ষেত্রে নিবন্ধিত মোবাইল নম্বরে OTP পাঠানোর ব্যবস্থা থাকবে। দেশের বাইরে অবস্থানরত কর্মচারীদের ক্ষেত্রে iBAS++-এ নিবন্ধিত ই-মেইলে OTP পাঠানোর বিধান রাখা হয়েছে।

তাই আগে যেসব তথ্য ঠিক রাখা জরুরি

Pay Fixation করার আগে কর্মচারীদের নিজেদের—

  • iBAS++ Login User ID
  • Password
  • NID নম্বর
  • জন্মতারিখ
  • নিবন্ধিত মোবাইল নম্বর
  • প্রয়োজনে নিবন্ধিত ই-মেইল

সঠিক আছে কি না নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।

NID না থাকলে আগে নিবন্ধন করতে হবে

গেজেটে বলা হয়েছে, কোনো কর্মচারীর জাতীয় পরিচয়পত্র না থাকলে বেতন নির্ধারণের আগে জাতীয় পরিচয়পত্রের জন্য নিবন্ধন সম্পন্ন করতে হবে।

অর্থাৎ, NID-সংক্রান্ত তথ্য অসম্পূর্ণ থাকলে সরাসরি Pay Fixation সম্পন্ন করার পরিবর্তে আগে প্রয়োজনীয় নিবন্ধন শেষ করতে হবে।

তথ্য পূরণ করলেই নতুন মূল বেতন দেখাবে

Pay Fixation প্রক্রিয়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—কর্মচারী নির্ধারিত ছকে প্রয়োজনীয় তথ্য সঠিকভাবে পূরণ করার পর DDO-এর কাছে সাবমিট করার আগেই সিস্টেমে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর নির্ধারণযোগ্য মূল বেতনের পরিমাণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রদর্শিত হবে

এ কারণে কর্মচারীকে নিজের ইচ্ছামতো নতুন মূল বেতন নির্ধারণ করার সুযোগ রাখা হয়নি। বরং গেজেট অনুযায়ী প্রাসঙ্গিক তথ্যের ভিত্তিতে সিস্টেমে নির্ধারিত বেতন প্রদর্শিত হবে।

এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা প্রয়োজন—নতুন বেতনস্কেলের সারণিতে কোনো গ্রেডের সর্বনিম্ন বা সর্বোচ্চ বেতন দেখলেই প্রত্যেক কর্মচারীর বেতন সেই অঙ্কে নির্ধারিত হবে না। ব্যক্তির বিদ্যমান মূল বেতন, গ্রেড, চাকরির তথ্য এবং প্রযোজ্য বিধানের ভিত্তিতেই Pay Fixation হবে। নতুন বেতনস্কেলে বর্তমান স্কেলের বিপরীতে অনুরূপ স্কেল কার্যকরের বিষয়টিও গেজেটে নির্ধারণ করা হয়েছে।

Pay Fixation-এর পর DDO-এর কাছে যাবে তথ্য

কর্মচারী অনলাইনে নির্ধারিত তথ্য পূরণ করার পর বেতন নির্ধারণী বিবরণী DDO-এর কাছে সাবমিট করবেন।

এরপর DDO সেটি যাচাই করে সংশ্লিষ্ট হিসাবরক্ষণ অফিসে ফরওয়ার্ড করবেন।

অর্থাৎ পুরো প্রক্রিয়াটি কেবল কর্মচারীর অনলাইন ফরম পূরণে শেষ হবে না। এখানে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ স্তর রয়েছে—

কর্মচারী → DDO → হিসাবরক্ষণ অফিস।

প্রত্যেক স্তরেই তথ্যের সঠিকতা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

SMS-এর মাধ্যমে পাওয়া যাবে বেতন নির্ধারণের তথ্য

গেজেট অনুযায়ী, iBAS++-এ প্রয়োজনীয় তথ্য পূরণ করে DDO-এর কাছে সাবমিট করার পর নির্বাচিত মোবাইল নম্বরে SMS-এর মাধ্যমে বেতন নির্ধারণী বিবরণী পাঠানো হবে।

এ কারণে Pay Fixation-এর সময় মোবাইল নম্বর ভুল দেওয়া হলে পরবর্তী যোগাযোগে সমস্যা তৈরি হতে পারে। তাই নিবন্ধিত মোবাইল নম্বরের তথ্য সঠিকভাবে দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

হিসাবরক্ষণ অফিস করবে চূড়ান্ত যাচাই

DDO বেতন নির্ধারণী বিবরণী হিসাবরক্ষণ অফিসে পাঠানোর পর সেটি যাচাই করা হবে।

হিসাবরক্ষণ অফিস যাচাই করে তথ্য সঠিক বলে প্রতীয়মান হলে অনলাইনে তা প্রতিপাদন করবে। অনুমোদনের পর সিস্টেম থেকে Verification Number স্বয়ংক্রিয়ভাবে তৈরি হবে

এই Verification Number বেতন নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ রেফারেন্স। তাই কর্মচারীদের এটি সংরক্ষণ করে রাখা উচিত।

অডিট রেজিস্টারেও থাকবে রেকর্ড

গেজেটে শুধু অনলাইন অনুমোদনের কথা বলা হয়নি। হিসাবরক্ষণ অফিসের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মচারী বেতন নির্ধারণ অনুমোদনের সময় নির্ধারিত বেতন ও Verification Number অডিট রেজিস্টারে লিপিবদ্ধ করে স্বাক্ষর করবেন

অর্থাৎ নতুন বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে ডিজিটাল রেকর্ডের পাশাপাশি অফিসিয়াল রেকর্ডও সংরক্ষণ করা হবে।

কম বা বেশি বেতন হলে কী হবে?

নতুন বেতনস্কেল কার্যকর হওয়ার সময় সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠতে পারে—কোনো কর্মচারীর নির্ধারিত বেতনের তুলনায় কম বা বেশি টাকা যদি পরিশোধ হয়ে যায়, তাহলে কী হবে?

গেজেটের নির্দেশনা এ বিষয়ে পরিষ্কার। সংশ্লিষ্ট হিসাবরক্ষণ অফিস ‘বেতন নির্ধারণী বিবরণী’-এর ভিত্তিতে বেতন পরিশোধ করবে। কম বা বেশি বেতন পরিশোধ হয়ে থাকলে তা পরবর্তী সময়ে সমন্বয়যোগ্য হবে।

ফলে Pay Fixation এবং প্রকৃত বেতন পরিশোধের মধ্যে কোনো পার্থক্য তৈরি হলে সেটি সংশোধন ও সমন্বয়ের ব্যবস্থা থাকবে।

নতুন বেতনস্কেল কার্যকর ১ জুলাই ২০২৬ থেকে

সরকার অনুমোদিত জাতীয় বেতনস্কেল, ২০২৬ অনুযায়ী নতুন কাঠামো ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর হয়েছে। অনুমোদিত কাঠামোয় বিদ্যমান ২০টি গ্রেড রাখা হয়েছে এবং সর্বনিম্ন প্রারম্ভিক মূল বেতন ২০ হাজার টাকা ও সর্বোচ্চ নির্ধারিত বেতন ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা করা হয়েছে।

সরকার জানিয়েছে, মূল বেতন ১ জুলাই ২০২৬ থেকে ১ জুলাই ২০২৭-এর মধ্যে মোট তিনটি ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। বিভিন্ন ভাতা ১ জানুয়ারি ২০২৮ থেকে কার্যকর হওয়ার সিদ্ধান্তও জানানো হয়েছে।

তাই ‘স্কেলে বেতন কত’ এবং ‘এখনই হাতে কত টাকা পাওয়া যাবে’—এই দুটি বিষয়কে একই হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। নতুন স্কেলের নির্ধারিত মূল বেতন, বাস্তবায়নের ধাপ এবং প্রযোজ্য ভাতা—সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে প্রকৃত মাসিক বেতন নির্ধারিত হবে।

আয়কর রিটার্নের বিষয়েও নির্দেশনা

গেজেটের একই অংশে আয়কর সম্পর্কিত নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।

আয়কর আইনের বিধান অনুযায়ী আয়করযোগ্য সরকারি কর্মচারীদের নিজ বেতন খাতের আয় থেকে নিরূপিত নীট আয়ের ভিত্তিতে যথাসময়ে আয়কর রিটার্ন দাখিল করতে হবে।

অর্থাৎ নতুন বেতনস্কেলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর আয়কর-সংক্রান্ত আইনগত দায়িত্বও বহাল থাকবে।

২০১৫ সালের বেতন-ভাতা আদেশ রহিত

গেজেটের শেষাংশে চাকরি (বেতন ও ভাতাদি) আদেশ, ২০১৫ রহিত করার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে এর অর্থ এই নয় যে পূর্ববর্তী আদেশের অধীনে থাকা প্রতিটি বেতন-ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা একসঙ্গে বাতিল হয়ে গেছে। গেজেটে বলা হয়েছে, পূর্বের আদেশের আওতায় থাকা বেতন, ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা সম্পর্কিত বিধান নতুন আদেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া সাপেক্ষে বহাল থাকবে।

Pay Fixation নিয়ে কর্মচারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা

নতুন বেতন নির্ধারণের সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো তথ্য সঠিকভাবে দেওয়া। কারণ অনলাইন ব্যবস্থায় কর্মচারীর তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই নির্ধারণযোগ্য মূল বেতন প্রদর্শিত হবে।

বিশেষ করে—

প্রথমত, NID ও জন্মতারিখের তথ্য সঠিক হতে হবে।

দ্বিতীয়ত, iBAS++-এর নিবন্ধিত মোবাইল নম্বর সচল রাখতে হবে।

তৃতীয়ত, Pay Fixation করার সময় বর্তমান পদ, গ্রেড, মূল বেতনসহ সংশ্লিষ্ট চাকরির তথ্য সতর্কতার সঙ্গে যাচাই করতে হবে।

চতুর্থত, সিস্টেমে প্রদর্শিত নতুন মূল বেতন DDO-এর কাছে পাঠানোর আগে ভালোভাবে মিলিয়ে দেখা উচিত।

পঞ্চমত, DDO-এর কাছে সাবমিশনের পর হিসাবরক্ষণ অফিসে ফরওয়ার্ড ও যাচাইয়ের বিষয়টি নজরে রাখা প্রয়োজন।

ষষ্ঠত, অনুমোদনের পর পাওয়া Verification Number সংরক্ষণ করতে হবে।

সপ্তমত, বেতন কম-বেশি পরিশোধ হলে তাৎক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্ট DDO বা হিসাবরক্ষণ অফিসের সঙ্গে বিষয়টি মিলিয়ে দেখা উচিত।

পুরো Pay Fixation প্রক্রিয়া এক নজরে

নতুন গেজেটের নির্দেশনা অনুসারে প্রক্রিয়াটি সংক্ষেপে এমন—

iBAS++-এ লগইন

Pay Fixation অপশন নির্বাচন

নির্ধারিত তথ্য পূরণ

সিস্টেমে নির্ধারণযোগ্য নতুন মূল বেতন প্রদর্শন

কর্মচারীর সাবমিশন

DDO কর্তৃক যাচাই ও ফরওয়ার্ড

হিসাবরক্ষণ অফিসের যাচাই

অনলাইন প্রতিপাদন ও অনুমোদন

Verification Number তৈরি

অডিট রেজিস্টারে রেকর্ড

বেতন নির্ধারণী বিবরণীর ভিত্তিতে বেতন পরিশোধ

শেষ কথা

জাতীয় বেতনস্কেল, ২০২৬-এর গেজেটের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো—সরকারি কর্মচারীদের নতুন বেতন নির্ধারণকে একটি কেন্দ্রীয় অনলাইন যাচাই ব্যবস্থার মধ্যে নিয়ে আসা হয়েছে। কর্মচারী নিজে তথ্য দেবেন, DDO তা ফরওয়ার্ড করবেন, হিসাবরক্ষণ অফিস যাচাই ও অনুমোদন করবে এবং পরবর্তী সময়ে Verification Number-এর মাধ্যমে নির্ধারণটি শনাক্ত করা যাবে।

ফলে নতুন বেতনস্কেলে বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে শুধু নতুন পে-স্কেলের চার্ট জানা যথেষ্ট নয়। নিজের সঠিক চাকরির তথ্য, বর্তমান মূল বেতন, গ্রেড, NID এবং iBAS++-এর তথ্য সঠিকভাবে উপস্থাপন করাই Pay Fixation-এর মূল বিষয়।

সরকার অনুমোদিত জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬-এ ২০টি গ্রেড বহাল রেখে নতুন বেতন কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে এবং ১ জুলাই ২০২৬ থেকে তা কার্যকর ধরা হয়েছে।

সুতরাং, নতুন বেতনস্কেলে একজন কর্মচারীর প্রকৃত বেতন কত হবে—তার চূড়ান্ত উত্তর পাওয়া যাবে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর প্রযোজ্য তথ্য iBAS++ Pay Fixation-এ সঠিকভাবে ইনপুট দেওয়ার পর সিস্টেমে প্রদর্শিত নির্ধারিত বেতন এবং হিসাবরক্ষণ অফিসের অনুমোদনের মাধ্যমে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *