দেশের মডেল মসজিদগুলোর পরিচালনা, ব্যবস্থাপনা, রক্ষণাবেক্ষণ, জনবল নিয়োগ, সম্মানী, আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও দায়িত্ব-কর্তব্যে অভিন্ন কাঠামো আনতে ‘মডেল মসজিদ ব্যবস্থাপনা নীতিমালা, ২০২৬’ জারি করেছে সরকার। ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয় ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে। পরে এটি বাংলাদেশ গেজেটের অতিরিক্ত সংখ্যায় ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ প্রকাশিত হয়। নীতিমালাটি প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে কার্যকর হয়েছে।
ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ইসলামিক ফাউন্ডেশন কর্তৃক বাস্তবায়িত ‘প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় একটি করে ৫৬০টি মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র স্থাপন’ প্রকল্পের আওতায় নির্মিত মডেল মসজিদগুলোর ব্যবস্থাপনা মসৃণ, সাবলীল ও সুশৃঙ্খল করা এবং পরিচালনা, ব্যবস্থাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণে সামঞ্জস্য বিধানের প্রয়োজন থেকেই নতুন নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে।
সিটি করপোরেশন, জেলা ও উপজেলায় আলাদা ব্যবস্থাপনা কমিটি
নতুন নীতিমালার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রতিটি মডেল মসজিদের জন্য পৃথক ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন। মসজিদের অবস্থান অনুযায়ী কমিটির নাম হবে—সিটি করপোরেশন মডেল মসজিদ ব্যবস্থাপনা কমিটি, জেলা মডেল মসজিদ ব্যবস্থাপনা কমিটি এবং উপজেলা মডেল মসজিদ ব্যবস্থাপনা কমিটি।
কমিটিই মসজিদ পরিচালনার ক্ষেত্রে সব নির্বাহী ক্ষমতার অধিকারী হবে। কাজের সুবিধার্থে কমিটি এক বা একাধিক উপ-কমিটিও গঠন করতে পারবে। সাধারণভাবে প্রতি দুই মাসে অন্তত একবার কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হবে এবং বিশেষ প্রয়োজনে জরুরি সভা আহ্বান করা যাবে। সভার কোরাম হিসেবে মোট সদস্যের এক-তৃতীয়াংশ উপস্থিতি নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে কমিটির সদস্যরা সভায় অংশগ্রহণের জন্য কোনো ভাতা বা সম্মানী পাবেন না।
জেলা পর্যায়ের কমিটিতে কারা থাকবেন
জেলা মডেল মসজিদ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি হবেন জেলা প্রশাসক। সদস্য হিসেবে থাকবেন পুলিশ সুপার, জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী, বিদ্যুৎ বিভাগের জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তা, মেয়রের প্রতিনিধি, সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের মনোনীত মুসলিম কর্মকর্তা অথবা ওয়াকফ সম্পত্তির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ওয়াকফ এস্টেটের মুতাওয়াল্লী, আলিয়া ও কওমি মাদ্রাসার মনোনীত প্রতিনিধি, চারজন মুসলিম গণ্যমান্য বা দানশীল ব্যক্তি এবং সংশ্লিষ্ট মসজিদের পেশ ইমাম। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
একইভাবে সিটি করপোরেশন পর্যায়ে বিভাগীয় কমিশনার এবং উপজেলা পর্যায়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার সংশ্লিষ্ট কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। উপজেলা কমিটিতে পুলিশ, গণপূর্ত, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল, বিদ্যুৎ বিভাগ, মাদ্রাসা প্রতিনিধি ও স্থানীয় গণ্যমান্য/দানশীল ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তির বিধান রাখা হয়েছে।
মডেল মসজিদ কমিটির দায়িত্ব কী
নীতিমালায় মডেল মসজিদ ব্যবস্থাপনা কমিটির কার্যাবলি বেশ বিস্তৃত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—
- জুমার সালাত, প্রাক-খুতবা ও খুতবার আয়োজন;
- পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ও ঈদের সালাতের ব্যবস্থা;
- জানাজার সালাতের আয়োজন;
- পবিত্র কুরআন শিক্ষা, বয়স্ক শিক্ষা, হিফজখানা ও শিশুদের মক্তব শিক্ষা পরিচালনা;
- মসজিদের আয়-ব্যয়, নগদ অর্থ ও স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের হিসাব ও রক্ষণাবেক্ষণ;
- প্রয়োজনীয় উন্নয়ন ও সংস্কার;
- বার্ষিক কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন;
- বাজেট প্রস্তুত;
- জনবল বাছাই ও নিয়োগ;
- সভার কার্যবিবরণী ও হাজিরা সংরক্ষণ;
- রমজানে তারাবির জন্য হাফেজ নিয়োগ ও আবাসনের ব্যবস্থা;
- মসজিদের পবিত্রতা, শৃঙ্খলা, নিরাপত্তা ও পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা;
- বার্ষিক হিসাব নিরীক্ষা এবং আয়বর্ধক কার্যক্রম গ্রহণ;
- মসজিদের যাবতীয় আয় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ব্যাংক হিসাবে জমা করা।
অর্থাৎ নতুন কাঠামোয় মসজিদ কমিটির দায়িত্ব শুধু নামাজ পরিচালনা বা অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণে সীমাবদ্ধ থাকবে না; শিক্ষা, জনসচেতনতা, অর্থব্যবস্থাপনা, জনবল ব্যবস্থাপনা এবং বার্ষিক পরিকল্পনাও এর আওতায় থাকবে।
মডেল মসজিদে নির্ধারিত জনবল
নীতিমালায় মডেল মসজিদের জনবল কাঠামোও নির্দিষ্ট করা হয়েছে। তফসিল অনুযায়ী একটি মডেল মসজিদে থাকবেন—
| পদ | সংখ্যা | নিয়োগের ধরন | সরাসরি নিয়োগের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ বয়স |
|---|---|---|---|
| খতীব | ১ জন | চুক্তিভিত্তিক | ৬৫ বছর |
| পেশ ইমাম | ১ জন | সরাসরি নিয়োগ/পদোন্নতি | ৩৫ বছর |
| মুয়াজ্জিন | ১ জন | সরাসরি নিয়োগ/পদোন্নতি | ৩২ বছর |
| খাদিম | ৩ জন | সরাসরি নিয়োগ | ৩২ বছর |
| নিরাপত্তা প্রহরী | ১ জন | চুক্তিভিত্তিক | ৩২ বছর |
খাদিমের তিনটি পদের মধ্যে পুরুষ ২ জন ও নারী ১ জন রাখার বিধান রয়েছে। তবে সরকার প্রয়োজন অনুযায়ী জনবলের সংখ্যা কমাতে বা বাড়াতে পারবে। মসজিদ কমিটি নিজস্ব অর্থায়নে চুক্তিভিত্তিক খতীব, নিরাপত্তা প্রহরী এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ করতে পারবে।
খতীব ও ইমাম নিয়োগে যোগ্যতা
খতীব পদে সরাসরি নিয়োগের সর্বোচ্চ বয়স ৬৫ বছর এবং নিয়োগ হবে চুক্তিভিত্তিক। শিক্ষাগত যোগ্যতার ক্ষেত্রে আলিয়া মাদ্রাসা থেকে কমপক্ষে দ্বিতীয় শ্রেণির কামিল অথবা বাংলাদেশে স্বীকৃত কওমি মাদ্রাসা থেকে কমপক্ষে দ্বিতীয় শ্রেণির দাওরায়ে হাদিস (তাকমিল), অথবা দাখিল-আলিমসহ কোনো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইসলামী বিষয় বা আরবিতে দ্বিতীয় শ্রেণির মাস্টার্স ডিগ্রির বিধান রাখা হয়েছে।
এছাড়া ইসলামী জীবনাচরণ, বিশুদ্ধ কুরআন তিলাওয়াত ও তরজমায় দক্ষতা এবং হাদিস, তাফসির ও ফিকাহসহ ইসলামী বিষয়ে গভীর জ্ঞান থাকতে হবে। অভিজ্ঞতার ক্ষেত্রেও সিনিয়র পেশ ইমাম বা পেশ ইমাম হিসেবে পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতা অথবা সংশ্লিষ্ট ইসলামী শিক্ষা/শিক্ষকতার অভিজ্ঞতার বিধান রয়েছে। হাফিজে কুরআন ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ইমামদের অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
পেশ ইমাম পদে সরাসরি নিয়োগ বা পদোন্নতির সুযোগ থাকবে এবং সরাসরি নিয়োগের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ বয়স ৩৫ বছর। শিক্ষাগত যোগ্যতা খতীবের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখা হয়েছে। এছাড়া ইসলামী জীবনাচরণ, বিশুদ্ধ কুরআন তিলাওয়াত ও তরজমা, আরবি ভাষায় দক্ষতা এবং ইসলামী শরিয়াহ সম্পর্কে প্রয়োজনীয় জ্ঞান থাকতে হবে। ইমামতির অভিজ্ঞতা থাকতে হবে এবং হাফিজে কুরআন ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
মুয়াজ্জিন, খাদিম ও নিরাপত্তা প্রহরীর যোগ্যতা
মুয়াজ্জিন পদে সরাসরি নিয়োগ বা পদোন্নতির সুযোগ রয়েছে। সর্বোচ্চ বয়স ৩২ বছর। তফসিলে আলিম অথবা স্বীকৃত কওমি মাদ্রাসার সানাবিয়া উলয়া অথবা দাখিলসহ উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের যোগ্যতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। হাফিজ বা কারী এবং প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের অগ্রাধিকার দেওয়ার বিধান রয়েছে।
খাদিম পদেও সর্বোচ্চ বয়স ৩২ বছর। তিনটি পদের মধ্যে পুরুষ দুইজন ও নারী একজন থাকবেন। দাখিল সমমান, স্বীকৃত কওমি মাদ্রাসার সানাবিয়া অথবা এসএসসি পাসের যোগ্যতা রাখা হয়েছে। ইসলামী জীবনাচরণ, বিশুদ্ধ কুরআন তিলাওয়াত, শারীরিক সুস্থতা ও সবলতার পাশাপাশি মসজিদে খাদিম হিসেবে অভিজ্ঞতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
অন্যদিকে নিরাপত্তা প্রহরী পদে সর্বোচ্চ বয়স ৩২ বছর এবং নিয়োগ চুক্তিভিত্তিক। ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা অষ্টম শ্রেণি পাস। এর সঙ্গে বিশুদ্ধ কুরআন তিলাওয়াত, ইসলামী জীবনাচরণ এবং শারীরিক সুস্থতা ও সবলতার শর্ত রয়েছে।
নিয়োগে বাছাই কমিটি ও বিজ্ঞপ্তি বাধ্যতামূলক
মসজিদের কোনো পদে সরাসরি নিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যবস্থাপনা কমিটি কর্তৃক গঠিত পাঁচ সদস্যের বাছাই কমিটির সুপারিশ ছাড়া নিয়োগ দেওয়া যাবে না।
বাছাই কমিটিতে থাকবেন মডেল মসজিদ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি, সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তা, সভাপতি মনোনীত আলিয়া ও কওমি মাদ্রাসার প্রতিনিধি এবং ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা। নিয়োগের জন্য জাতীয় অথবা স্থানীয় বাংলা পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ এবং মসজিদের নোটিশ বোর্ডে তা প্রদর্শনের বিধান রাখা হয়েছে। আবেদন করার জন্য কমপক্ষে ১৫ দিন সময় দিতে হবে।
ইমাম নিয়োগের ক্ষেত্রে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার পাশাপাশি সহিহ কুরআন তিলাওয়াত, জুমার আলোচনা, খুতবা পাঠ ও সালাতে ইমামতির ব্যবহারিক পরীক্ষা নেওয়ার বিধান রয়েছে।
বাছাই কমিটি মেধা তালিকা প্রস্তুত করে মসজিদ ব্যবস্থাপনা কমিটির কাছে পাঠাবে এবং সেই তালিকা থেকে মেধাক্রম অনুযায়ী প্রথম ব্যক্তিকে নিয়োগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। প্রথম ব্যক্তি যোগদান না করলে পরবর্তী প্রার্থীকে বিবেচনা করা যাবে। পুরোনো মসজিদের জায়গায় মডেল মসজিদ নির্মিত হলে আগের মসজিদে ধারাবাহিকভাবে পাঁচ বছর কর্মরত ব্যক্তিদের নিয়োগে অগ্রাধিকার দেওয়া যেতে পারে; এ ক্ষেত্রে বয়স শিথিলযোগ্য।
পেশ ইমাম ২০ হাজার, মুয়াজ্জিন ১৫ হাজার, খাদিম ১২ হাজার টাকা
নীতিমালার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোর একটি হলো মডেল মসজিদে কর্মরত জনবলের সম্মানী। গেজেটের তফসিলের সারণি অনুযায়ী—
- পেশ ইমাম — ২০,০০০ টাকা
- মুয়াজ্জিন — ১৫,০০০ টাকা
- খাদিম — ১২,০০০ টাকা
- খতীব — চুক্তিভিত্তিক
- নিরাপত্তা প্রহরী — চুক্তিভিত্তিক
একই সারণিতে পেশ ইমামের জন্য জাতীয় বেতনস্কেল ২০১৫ অনুযায়ী গ্রেড-১০, মুয়াজ্জিনের জন্য গ্রেড-১৬ এবং খাদিমের জন্য গ্রেড-১৮ উল্লেখ করা হয়েছে। খতীব ও নিরাপত্তা প্রহরীকে চুক্তিভিত্তিক রাখা হয়েছে। আর্থিকভাবে সক্ষম মডেল মসজিদগুলো সংশ্লিষ্ট পদে উল্লিখিত গ্রেড অনুযায়ী বেতন-ভাতা দেওয়ার সুযোগ পাবে।
এ ছাড়া ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার জন্য সংশ্লিষ্ট জনবলকে উৎসব অনুষ্ঠিত হওয়ার আগের মাসের সম্মানীর সমপরিমাণ উৎসব ভাতা দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।
জনবলের দায়িত্বও নির্দিষ্ট
খতীবকে প্রতি শুক্রবার জুমার আগে বয়ান ও খুতবা প্রদান, কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তারাবি, ঈদ ও ইস্তিসকার সালাত পরিচালনা, মুসল্লিদের মাসআলা-মাসায়েল ও ফতোয়া-সংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তর দেওয়া এবং নিয়মিত তাফসির, তালিম, দারস বা মাহফিল পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
পেশ ইমাম দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত সালাতসহ প্রযোজ্য ক্ষেত্রে জুমা, জানাজা, তারাবি ও ঈদের সালাত পরিচালনা করবেন। পাশাপাশি মুসল্লিদের সালাত, সাওম, হজ, জাকাত ও কুরআন শিক্ষায় সহযোগিতা এবং মসজিদের শৃঙ্খলা ও পরিচ্ছন্নতা রক্ষায় ভূমিকা রাখবেন। মুয়াজ্জিনের পাশাপাশি খাদিম ও অন্যান্য অধস্তন কর্মীদের কাজ তদারকির দায়িত্বও পেশ ইমামের ওপর থাকবে।
মুয়াজ্জিনের দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে সময়মতো আজান-ইকামত দেওয়া, ইমামের অনুপস্থিতিতে সালাত পরিচালনা, দানবাক্স পরিচালনা এবং মুসল্লিদের কাছ থেকে মাসিক দান সংগ্রহ ও হিসাব সংরক্ষণে সহযোগিতা।
খাদিমদের দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে ওজু, গোসল ও ইস্তেঞ্জার স্থান পরিষ্কার রাখা, প্রয়োজনে আজান দেওয়া ও ইমামকে সহযোগিতা, মক্তব পরিচালনায় সহায়তা, মাসিক দান সংগ্রহ, সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণ, বিল পরিশোধ ও হিসাব সংরক্ষণ এবং জানাজা ও মৃতদেহ গোসলের স্থান পরিষ্কার রাখা।
নিরাপত্তা প্রহরীর মূল দায়িত্ব হবে মসজিদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং লাইট, ফ্যান, পানির মোটর, পানির ট্যাপসহ মসজিদের সম্পদের চুরি প্রতিরোধ করা।
রাজনৈতিক কার্যক্রমে সক্রিয় অংশগ্রহণে নিষেধাজ্ঞা
মসজিদে কর্মরত জনবলের সাধারণ করণীয় হিসেবে মসজিদের আমানতদার হিসেবে কাজ করা, বিশ্বস্ততা ও সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন এবং অনুমোদিত ছুটি ছাড়া কর্মস্থল ত্যাগ না করার বিধান রয়েছে।
একই সঙ্গে নীতিমালায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, মসজিদে কর্মরত কোনো ব্যক্তি কোনো রাজনৈতিক দলের কার্যক্রমে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতে পারবেন না।
একাধিক রাজস্ব খাত থেকে বেতন নেওয়া যাবে না
মডেল মসজিদে কর্মরত কোনো ব্যক্তি একই সময়ে একাধিক রাজস্ব খাত থেকে বেতন-ভাতা গ্রহণ করতে পারবেন না। সরাসরি নিয়োগের ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট পদের নির্ধারিত যোগ্যতা ও বয়সসীমা পূরণ করতে হবে।
মসজিদের অর্থ পরিচালনায় ব্যাংক হিসাব বাধ্যতামূলক
মসজিদের তহবিল ব্যবস্থাপনার জন্য শরিয়াহভিত্তিক পরিচালিত তফসিলি ব্যাংকে মসজিদের নামে হিসাব খোলার বিধান রাখা হয়েছে। মসজিদের সব আয় ওই হিসাবে জমা হবে এবং সব লেনদেন ওই হিসাবের মাধ্যমে পরিচালিত হবে।
ব্যাংক হিসাব পরিচালিত হবে ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি, সদস্য সচিব ও কোষাধ্যক্ষের স্বাক্ষরে। তবে টাকা উত্তোলনের ক্ষেত্রে সভাপতিসহ যেকোনো দুইজনের স্বাক্ষর প্রয়োজন হবে। কোষাধ্যক্ষকে লেজার, ক্যাশবই, বিল-ভাউচারসহ প্রয়োজনীয় নথি সংরক্ষণ করতে হবে এবং যেকোনো সময় নিরীক্ষার জন্য তা প্রস্তুত রাখতে হবে।
মসজিদের আয়ের উৎস হিসেবে নিয়মিত ও এককালীন দান, দানবাক্সের অর্থ, মসজিদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি থেকে আয়, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির অনুদান ও মঞ্জুরি এবং শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকে জমাকৃত অর্থের মুনাফাসহ অন্যান্য বৈধ উৎস নির্ধারণ করা হয়েছে।
কর্মীদের জন্য ৫ শতাংশ সঞ্চয়
মডেল মসজিদে কর্মরত ব্যক্তিদের ভবিষ্যৎ কল্যাণের জন্য তাদের সম্মানী/বেতন থেকে ৫ শতাংশ অর্থ কর্তনের বিধান রাখা হয়েছে। একই পরিমাণ অর্থ মসজিদ তহবিল থেকে যোগ করে শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক হিসাবে জমা রাখার কথা বলা হয়েছে।
চাকরি বা দায়িত্বের সমাপ্তির পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে তার প্রাপ্য অনুযায়ী এই অর্থ পরিশোধ করতে হবে। সরকারি কর্মচারীদের মতো এ তহবিল থেকে অগ্রিম উত্তোলনের সুযোগও রাখা হয়েছে। চাকরি সমাপ্তির পর এককালীন সম্মাননা প্রদানের ব্যবস্থার কথাও নীতিমালায় উল্লেখ রয়েছে।
ছুটির ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট নিয়ম
নীতিমালা অনুযায়ী মসজিদে কর্মরত ব্যক্তিরা ব্যবস্থাপনা কমিটির অনুমোদন নিয়ে—
- প্রতি মাসে সর্বোচ্চ ৪ দিন সাপ্তাহিক ছুটি;
- পঞ্জিকাবর্ষে সর্বোচ্চ ২০ দিন নৈমিত্তিক ছুটি, তবে একটানা ১০ দিনের বেশি নয়;
- প্রতি ১২ দিনে ১ দিন হিসেবে অর্জিত ছুটি
ভোগ করতে পারবেন। অর্জিত ছুটি ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও চিকিৎসাজনিত কারণে এককালীন সর্বোচ্চ ৩০ দিন ভোগ করা যাবে এবং ছুটিকালীন সম্মানী পাওয়ার বিধান রয়েছে।
প্রশিক্ষণ ও চাকরির নথি সংরক্ষণ
মসজিদ ব্যবস্থাপনা কমিটি কর্মরত ব্যক্তিদের দক্ষতা ও যোগ্যতা বৃদ্ধির জন্য সরকারি, বেসরকারি বা স্বীকৃত প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে পারবে। প্রশিক্ষণকালকে কর্মকাল হিসেবে গণ্য করার বিধান রয়েছে।
এ ছাড়া প্রত্যেক কর্মীর জীবনবৃত্তান্ত, শিক্ষাগত যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, নাগরিকত্ব, জাতীয় পরিচয়পত্রসহ প্রয়োজনীয় সনদের সত্যায়িত কপি সংরক্ষণ করতে হবে। ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খাদিমদের জন্য পৃথক চাকরিবহি রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
বিরোধ নিষ্পত্তি ও পুরোনো নীতিমালা বাতিল
উপজেলা মডেল মসজিদের বিরোধ ও আপিল নিষ্পত্তিতে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসক ও ইসলামিক ফাউন্ডেশনের জেলা কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করবেন। জেলা পর্যায়ের ক্ষেত্রে বিভাগীয় কমিশনার ও ইসলামিক ফাউন্ডেশনের বিভাগীয় কর্মকর্তা আপিল ও বিরোধ নিষ্পত্তি কর্তৃপক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। বিরোধ বা আপিলের আবেদন ১৫ দিনের মধ্যে করতে হবে এবং এক মাসের মধ্যে তা নিষ্পত্তির বিধান রাখা হয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে, নতুন ‘মডেল মসজিদ ব্যবস্থাপনা নীতিমালা, ২০২৬’ কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ‘জেলা ও উপজেলা মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র পরিচালনা নীতিমালা, ২০২১’ বাতিল করা হয়েছে। তবে বাতিল নীতিমালার অধীনে ইতোমধ্যে সম্পন্ন কাজ, গৃহীত ব্যবস্থা ও চলমান কার্যক্রম নতুন নীতিমালার অধীনে সম্পন্ন বা চলমান হিসেবে গণ্য হবে।
সারসংক্ষেপ
নতুন নীতিমালার মাধ্যমে মডেল মসজিদ পরিচালনায় একটি কেন্দ্রীয় ও অভিন্ন প্রশাসনিক কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে কমিটি গঠন থেকে জনবল নিয়োগ, যোগ্যতা, পরীক্ষা, সম্মানী, দায়িত্ব-কর্তব্য, ছুটি, সঞ্চয়, ব্যাংক হিসাব, আয়-ব্যয়, নিরীক্ষা, প্রশিক্ষণ, শৃঙ্খলা ও বিরোধ নিষ্পত্তি—সবকিছুর জন্য পৃথক বিধান রাখা হয়েছে। ফলে মডেল মসজিদগুলোর পরিচালনা এখন নির্দিষ্ট নীতিমালার অধীনে আরও কাঠামোবদ্ধভাবে সম্পন্ন করার আইনি ও প্রশাসনিক ভিত্তি তৈরি হলো।

