সর্বজনীন পেনশন স্কিম

সর্বজনীন পেনশনে আসছে শরিয়াহভিত্তিক ব্যবস্থা, চার স্কিমেই মিলবে ইসলামিক ভার্সন

বাংলাদেশের সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচিতে যুক্ত হতে যাচ্ছে শরিয়াহভিত্তিক বা ইসলামিক পেনশন ব্যবস্থা। নতুন কোনো পঞ্চম স্কিম চালুর পরিবর্তে বর্তমানে চালু থাকা চারটি স্কিম—প্রবাস, প্রগতি, সুরক্ষা ও সমতা—প্রতিটিরই শরিয়াহভিত্তিক বিকল্প চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে একজন অংশগ্রহণকারী প্রচলিত পদ্ধতি অথবা শরিয়াহভিত্তিক পদ্ধতির মধ্যে পছন্দ করার সুযোগ পেতে পারেন।

তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এটি এখনো চূড়ান্তভাবে চালু হয়ে যায়নি। জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের পরিচালনা পর্ষদ প্রস্তাব অনুমোদন করেছে এবং আইনগত ভিত্তি তৈরির জন্য খসড়া প্রস্তুত করে জাতীয় সংসদে পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ ছবিতে ‘চালু হচ্ছে’ বলা হলেও বাস্তব অর্থে এটি বর্তমানে বাস্তবায়নের প্রস্তুতি ও আইনগত প্রক্রিয়ার পর্যায়ে রয়েছে।

চারটি স্কিমেই থাকবে শরিয়াহভিত্তিক বিকল্প

জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, সর্বজনীন পেনশনের বর্তমান চারটি স্কিম হলো—

  • প্রবাস — প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য
  • প্রগতি — বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী ও প্রতিষ্ঠানের জন্য
  • সুরক্ষা — স্বকর্মে নিয়োজিত ও অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মীদের জন্য
  • সমতা — স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য

বর্তমানে এই চারটি স্কিমের নিবন্ধন কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

শরিয়াহভিত্তিক ব্যবস্থা চালু হলে আলাদা পঞ্চম স্কিমের পরিবর্তে প্রতিটি স্কিমের ইসলামিক সংস্করণ তৈরি করার পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থাৎ ‘প্রবাস শরিয়া’, ‘প্রগতি শরিয়া’, ‘সুরক্ষা শরিয়া’ ও ‘সমতা শরিয়া’ ধরনের বিকল্প কাঠামো থাকতে পারে।

কেন শরিয়াহভিত্তিক পেনশন চালুর উদ্যোগ?

জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের আলোচনায় উঠে এসেছে, দেশের একটি জনগোষ্ঠী সুদভিত্তিক আর্থিক কাঠামোর পরিবর্তে শরিয়াহসম্মত বিনিয়োগ ব্যবস্থাকে অগ্রাধিকার দিতে চায়। এই জনগোষ্ঠীকে সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থার আওতায় আনার লক্ষ্যেই শরিয়াহভিত্তিক বিকল্প তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

গত ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ সচিবালয়ে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের পরিচালনা পর্ষদের চতুর্থ বৈঠকে এ-সংক্রান্ত প্রস্তাব অনুমোদনের পর বিষয়টি নতুন করে সামনে আসে। এরপর এর আইনগত ভিত্তি তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় খসড়া প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

কোথায় বিনিয়োগ করা হবে—এখনো বড় প্রশ্ন

শরিয়াহভিত্তিক পেনশন ব্যবস্থা চালুর ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হচ্ছে চাঁদার অর্থ কোথায় বিনিয়োগ করা হবে।

বর্তমানে সর্বজনীন পেনশন তহবিলের অর্থ নিরাপদ ও লাভজনক খাতে বিনিয়োগ করা হয় এবং জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী সরকারি ট্রেজারি বন্ডে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ ৩২২ কোটি ১ লাখ ২৯ হাজার ৬৬১ টাকা।

শরিয়াহভিত্তিক ব্যবস্থায় প্রচলিত সুদভিত্তিক বিনিয়োগ কাঠামোর পরিবর্তে বিকল্প বিনিয়োগ পদ্ধতি প্রয়োজন হবে। এ ক্ষেত্রে সুকুক, শরিয়াহসম্মত ইক্যুইটি এবং হালাল ব্যবসায় মুদারাবা বা মুশারাকা ভিত্তিক বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা চলছে।

তবে কোন কোন খাতে বিনিয়োগ করা যাবে, কীভাবে ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ করা হবে এবং গ্রাহকের অর্থের নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে—এসব বিষয় এখনো পর্যালোচনাধীন।

আলাদা শরিয়া বোর্ড হবে কি?

শরিয়াহভিত্তিক পেনশন ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতার জন্য শরিয়াহ তদারকির বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে আলাদা শরিয়া বোর্ড গঠন করা হবে কি না, সেটিও পর্যালোচনা করা হচ্ছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের শরিয়া বোর্ড এবং বিভিন্ন সরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শরিয়াহ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পরামর্শ নেওয়ার কথা রয়েছে।

ফলে শুধু ‘ইসলামিক’ নামে একটি স্কিম চালু করাই যথেষ্ট হবে না; বিনিয়োগের উৎস, মুনাফা অর্জনের পদ্ধতি, তহবিল ব্যবস্থাপনা এবং নিয়মিত শরিয়াহ অডিট—সবকিছুর একটি সুস্পষ্ট কাঠামো প্রয়োজন হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

বর্তমানে সর্বজনীন পেনশনে কত মানুষ?

জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত চারটি স্কিমে মোট নিবন্ধনকারী দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৭৯ হাজার ৭২৮ জন। একই সময়ে সরকারি ট্রেজারি বন্ডে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ ৩২২ কোটি টাকার বেশি।

এ তথ্য থেকে বোঝা যায়, নতুন শরিয়াহভিত্তিক বিকল্প যুক্ত করার অন্যতম উদ্দেশ্য হতে পারে পেনশন কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের পরিধি বাড়ানো এবং যারা প্রচলিত কাঠামোতে অংশ নিতে আগ্রহী নন, তাদের জন্য আলাদা বিকল্প তৈরি করা।

বিদ্যমান চার স্কিমের কাঠামো কী?

প্রবাস স্কিম

বিদেশে কর্মরত বা অবস্থানরত বাংলাদেশিদের জন্য প্রবাস স্কিম। বৈদেশিক মুদ্রায় চাঁদা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে এবং নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে ২.৫ শতাংশ প্রণোদনাও চাঁদার সঙ্গে যুক্ত হয়।

প্রগতি স্কিম

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী ও মালিকদের জন্য এই স্কিম। কোনো প্রতিষ্ঠান প্রাতিষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হলে কর্মী ও প্রতিষ্ঠান উভয়েই চাঁদায় অংশ নিতে পারে। বর্তমানে মাসিক চাঁদার নির্ধারিত হার ২ হাজার, ৩ হাজার, ৫ হাজার ও ১০ হাজার টাকা।

সুরক্ষা স্কিম

কৃষক, শ্রমিক, রিকশাচালক, জেলে, কামার, কুমার, গৃহিণীসহ স্বকর্মে নিয়োজিত ও অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মীদের জন্য সুরক্ষা স্কিম। মাসিক চাঁদার হার ১ হাজার, ২ হাজার, ৩ হাজার ও ৫ হাজার টাকা।

সমতা স্কিম

স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য সমতা স্কিম। এখানে মাসিক চাঁদা ১ হাজার টাকা, যার মধ্যে চাঁদাদাতা ৫০০ টাকা এবং সরকার ৫০০ টাকা প্রদান করে।

পেনশনে কী সুবিধা রয়েছে?

সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থায় সাধারণভাবে ১৮ থেকে ৫০ বছর বয়সী বাংলাদেশি নাগরিক অংশ নিতে পারেন। বিশেষ ব্যবস্থায় ৫০ বছরের বেশি বয়সীরাও নিরবচ্ছিন্ন ১০ বছর চাঁদা দেওয়ার শর্তে অন্তর্ভুক্ত হতে পারেন। ১৮–৫০ বছর বয়সীদের ক্ষেত্রে ৬০ বছর বয়স পর্যন্ত চাঁদা দেওয়ার কাঠামো রয়েছে।

চাঁদার অর্থ নির্ধারিত বিনিয়োগ কাঠামোর মাধ্যমে বিনিয়োগ করা হয় এবং সেই বিনিয়োগ থেকে অর্জিত রিটার্নের ভিত্তিতে ভবিষ্যৎ মাসিক পেনশনের পরিমাণ নির্ধারিত হয়। পেনশন গ্রহণের জন্য আলাদা অফিসে গিয়ে টাকা তুলতে হয় না; নির্ধারিত ব্যাংক হিসাবে অর্থ জমা দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।

এ ছাড়া সর্বজনীন পেনশন স্কিমে দেওয়া চাঁদার ওপর আয়কর রেয়াত এবং মাসিক পেনশন আয়করমুক্ত রাখার সুবিধাও রয়েছে।

নিবন্ধন কি এখনই করা যাচ্ছে?

হ্যাঁ। বর্তমানে বিদ্যমান প্রবাস, প্রগতি, সুরক্ষা ও সমতা—এই চারটি স্কিমে নিবন্ধন কার্যক্রম চালু রয়েছে। জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের ওয়েবসাইটে NID, জন্মতারিখ, মোবাইল নম্বরসহ প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে স্কিম নির্বাচন করে নিবন্ধন করা যায়।

সর্বজনীন পেনশন কর্তৃপক্ষের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট

তবে শরিয়াহভিত্তিক নতুন বিকল্পে এখনই নিবন্ধন শুরু হয়েছে—এমন তথ্য অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে পাওয়া যাচ্ছে না। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত কোনো পোস্ট বা ছবিকে দেখে শরিয়াহ স্কিমে নিবন্ধন বা অর্থ জমা দেওয়ার আগে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের বিষয়টি নিশ্চিত করা জরুরি। বর্তমান অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে এখনো চারটি প্রচলিত স্কিমই দেখানো হচ্ছে।

সামনে কী হতে পারে?

শরিয়াহভিত্তিক সর্বজনীন পেনশন চালুর আগে কয়েকটি ধাপ সম্পন্ন করতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে—

  1. আইনগত কাঠামো চূড়ান্ত করা
  2. প্রয়োজনীয় বিধিমালা প্রণয়ন
  3. শরিয়াহভিত্তিক বিনিয়োগ কাঠামো নির্ধারণ
  4. বিনিয়োগের উপযুক্ত খাত নির্ধারণ
  5. শরিয়াহ তদারকি ও অডিট কাঠামো নির্ধারণ
  6. তহবিলের ঝুঁকি ও দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক স্থায়িত্ব বিশ্লেষণ
  7. এরপর বাস্তব নিবন্ধন ও কার্যক্রম শুরু করা

এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) ও স্থানীয় পরামর্শকেরাও শরিয়াহভিত্তিক পদ্ধতির কাঠামো, পরিচালন ব্যবস্থা, বিনিয়োগ পদ্ধতি ও কারিগরি বিষয় নিয়ে কাজ করছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

সারসংক্ষেপ

সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থায় শরিয়াহভিত্তিক পদ্ধতি যুক্ত করার উদ্যোগটি বর্তমানে চূড়ান্ত বাস্তবায়নের আগের পর্যায়ে রয়েছে। এটি আলাদা পঞ্চম স্কিম নয়; বরং বিদ্যমান প্রবাস, প্রগতি, সুরক্ষা ও সমতা—চার স্কিমের ইসলামিক বিকল্প হিসেবে চালুর পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে—শরিয়াহসম্মত বিনিয়োগের পর্যাপ্ত সুযোগ, তহবিল ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, কার্যকর শরিয়াহ তদারকি এবং আইনগত অনুমোদন। এসব প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পরই বোঝা যাবে কবে থেকে সাধারণ মানুষ বাস্তবে এই বিকল্পে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *