অনেক পরিবারেই এমন জমি বা সম্পত্তি থাকে, যা পূর্বপুরুষদের নামে রেকর্ড বা রেজিস্ট্রি করা আছে, কিন্তু বর্তমান প্রজন্ম সে সম্পর্কে জানে না। সঠিক তথ্যের অভাবে এই মূল্যবান সম্পত্তি দীর্ঘদিন ধরে অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকে, বা অনেক সময় বেহাতও হয়ে যায়। তবে সুখবর হলো, এখন আর দালাল ধরে কিংবা ভূমি অফিসে ঘোরাঘুরি করে হয়রানি হতে হবে না। আপনার স্মার্টফোন দিয়েই মাত্র ২ মিনিটে আপনার বাপ-দাদা, চাচা বা নানার নামে কোনো পুরনো জমি আছে কিনা, তা খুঁজে বের করতে পারবেন।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের ডিজিটাল উদ্যোগের ফলে সাধারণ মানুষ এখন ঘরে বসেই এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য যাচাই করতে পারে।
🔍 যেভাবে খুঁজে বের করবেন পূর্বপুরুষের নামে থাকা পুরাতন জমি: ৫টি সহজ উপায়
আপনার বাবার, দাদার বা পূর্বপুরুষের নামে কোনো জমি রেকর্ড হয়েছে কিনা, তা যাচাই করার জন্য নিচে দেওয়া ধাপগুলো অনুসরণ করুন:
১. ‘ভূমি’ অ্যাপ দিয়ে নাম সার্চ
-
প্রথমে Google Play Store থেকে “ভূমি” নামে ভূমি মন্ত্রণালয়ের অফিশিয়াল অ্যাপটি ডাউনলোড করুন।
-
অ্যাপটিতে প্রবেশ করে হোল্ডিং/RS/CS/BS (বিভিন্ন সময়ের রেকর্ড) অপশনগুলোতে যান।
-
সেখানে “Owner Name” (মালিকের নাম) অপশনে আপনার বাবা, দাদা বা পূর্বপুরুষের নামটি লিখে সার্চ দিন।
-
যদি কোথাও জমি রেকর্ড করা থাকে, তাহলে অ্যাপটিতেই কেস নম্বর, জমির প্লট, মৌজা এবং সংশ্লিষ্ট সমস্ত তথ্য বিস্তারিত আকারে দেখানো হবে।
২. অনলাইনে খতিয়ান সার্চ (e-Namjari Portal)
-
আপনার মোবাইলের ব্রাউজারে গুগলে সার্চ করুন: “অফিসিয়াল ভূমি সেবা – খতিয়ান সার্চ”।
-
নির্দিষ্ট পোর্টালে গিয়ে সার্চ ফর্মে ডিস্ট্রিক্ট (জেলা) → উপজেলা → মৌজা নির্বাচন করুন।
-
এরপর নাম অপশনে আপনার বা পূর্বপুরুষের নামটি দিয়ে সার্চ দিন।
-
যদি ওই মৌজায় আপনার বা বাপ-দাদার নামে কোনো জমি থাকে, তবে তার একটি তালিকা সেখানে প্রদর্শিত হবে।
৩. বানানের ভিন্নতা যাচাই (পুরনো রেকর্ড)
পুরনো রেকর্ড (যেমন CS, SA, RS, BS) করার সময় অনেক ক্ষেত্রে নামে বানানের পার্থক্য দেখা যায়। তাই যদি প্রথমবার সার্চ করে ফল না পান, তবে নামের সম্ভাব্য সব বানান দিয়ে সার্চ করুন।
উদাহরণ: যদি নাম হয় ‘মোঃ রহমান’, তবে ‘মোহাম্মদ রহমান’, ‘রহমান’, ‘মুহাম্মদ রহমান’—এসব ভার্সনেও সার্চ করে দেখতে পারেন।
৪. সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে রেজিস্ট্রি কপি চেক
যদি অনলাইনে খুঁজে না পান, তাহলে সরাসরি সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে গিয়ে খোঁজ নিতে পারেন। সেখানে গিয়ে আপনার দাদার নাম এবং গ্রামের নাম বললে, তারা রেকর্ড বুকে খুঁজে দেখতে পারবে জমিটির কোনো রেজিস্ট্রি কপি আছে কিনা।
৫. স্থানীয় ভূমি অফিস (তহসিল) থেকে খতিয়ান চেক
আপনার স্থানীয় ভূমি অফিস বা তহসিল অফিসে গিয়েও নামভিত্তিক খতিয়ান চেক করতে পারেন। অনেক সময় একই নামে একাধিক খতিয়ান থাকতে পারে, যা তারা তালিকা আকারে দেখিয়ে দিতে পারে।
🚨 কেন এখনই জমি খুঁজে বের করা জরুরি?
পূর্বপুরুষের জমি এখনই খুঁজে বের করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ:
-
উত্তরাধিকার নিশ্চিত: জমি পাওয়া গেলে তা আপনার উত্তরাধিকার হিসেবে পাওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়।
-
দখল রক্ষা: দীর্ঘদিন জমি পড়ে থাকলে অনেক সময় গ্রাবার বা দখলদার সেই জমি আত্মসাৎ করে নেয়। দ্রুত চেক করলে সম্পত্তি রক্ষা করা সম্ভব।
-
সহজ নামজারি: রেকর্ড ঠিক থাকলে ভবিষ্যতে আপনার নামে নামজারি বা মিউটেশন করা সহজ হয়।
✅ যদি কোথাও জমি পাওয়া যায়, তবে আপনার করণীয়:
১. নামজারি করুন: দেরি না করে দ্রুত সেই জমি আপনার নামে নামজারি (মিউটেশন) করার জন্য আবেদন করুন।
২. মানচিত্র (ম্যাপ) সংগ্রহ: জমির সঠিক অবস্থান ও পরিমাণ জানতে জমির মানচিত্র তুলে নিন।
৩. আপডেট খতিয়ান: প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে সর্বশেষ আপডেট খতিয়ান সংগ্রহ করুন এবং সব তথ্য নিজের কাছে সুরক্ষিত রাখুন।
এই ডিজিটাল পদ্ধতি ব্যবহার করে সময় এবং অর্থ সাশ্রয় করুন। নিজের পূর্বপুরুষের সম্পত্তি সুরক্ষিত রেখে ভবিষ্যতের প্রজন্মকে একটি মজবুত ভিত্তি দিতে এখনই উদ্যোগী হোন।
📱 টাঙ্গাইল জেলার জন্য অনলাইনে বাপ-দাদার জমি খোঁজার প্রক্রিয়া
আপনার বা আপনার পূর্বপুরুষের জমি টাঙ্গাইল জেলার যে কোনো উপজেলায় থাকুক না কেন, এই দুটি অনলাইন প্ল্যাটফর্মই সবচেয়ে কার্যকর।
১. অনলাইনে খতিয়ান সার্চ (e-Namjari Portal)
এটিই সবচেয়ে সহজ এবং সরাসরি পদ্ধতি। এখানে আপনি আপনার পূর্বপুরুষের নাম ব্যবহার করে জমির খতিয়ান (Record of Rights) খুঁজে বের করতে পারবেন।
-
ধাপ ১: ওয়েবসাইটে প্রবেশ
-
গুগলে সার্চ করুন: “অফিসিয়াল ভূমি সেবা – খতিয়ান সার্চ” অথবা সরাসরি ভূমি মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রবেশ করুন।
-
-
ধাপ ২: জেলা নির্বাচন (CRITICAL)
-
সার্চ ফর্মে প্রথমে “ঢাকা” বিভাগ নির্বাচন করুন।
-
এরপর “জেলা” অপশনে গিয়ে তালিকা থেকে “টাঙ্গাইল” নির্বাচন করুন।
-
-
ধাপ ৩: উপজেলা নির্বাচন
-
টাঙ্গাইল নির্বাচন করার পর আপনার জমিটি যে উপজেলায় অবস্থিত, সেটি নির্বাচন করুন। টাঙ্গাইল জেলার প্রধান উপজেলাগুলো হলো:
-
টাঙ্গাইল সদর
-
বাসাইল
-
ভুয়াপুর
-
দেলদুয়ার
-
ঘাটাইল
-
গোপালপুর
-
মধুপুর
-
মির্জাপুর
-
নাগরপুর
-
সখিপুর
-
কালিহাতী
-
ধনবাড়ী
-
-
-
ধাপ ৪: মৌজা নির্বাচন
-
এরপর জমিটি যে মৌজায় অবস্থিত, সেটি নির্বাচন করুন। যদি মৌজার সঠিক নাম মনে না থাকে, তাহলে একটি সম্ভাব্য তালিকা দেখতে পাবেন।
-
-
ধাপ ৫: নাম দিয়ে সার্চ
-
সর্বশেষ “নাম” অপশনে গিয়ে আপনার পূর্বপুরুষের (যেমন: দাদা বা বাবা) সম্পূর্ণ নামটি নির্ভুলভাবে লিখে সার্চ দিন।
-
যদি ওই নামে কোনো রেকর্ড থাকে, তাহলে খতিয়ানের তালিকা, খতিয়ান নম্বর এবং জমির ধরন প্রদর্শিত হবে।
-
💡 জরুরি টিপস: পুরনো বানানে সার্চ করুন। যেমন: ‘মোহাম্মদ’ না লিখে ‘মোঃ’ বা নামের শুধু অংশবিশেষ দিয়েও সার্চ করে দেখতে পারেন।
২. ‘ভূমি’ মোবাইল অ্যাপ ব্যবহার
‘ভূমি’ অ্যাপ ব্যবহার করেও ঠিক একই পদ্ধতিতে টাঙ্গাইল জেলার জমি খুঁজে বের করা যায়।
-
অ্যাপটি ওপেন করুন এবং টাঙ্গাইল জেলা ও নির্দিষ্ট উপজেলা নির্বাচন করুন।
-
Owner Name (মালিকের নাম) অপশনে গিয়ে আপনার পূর্বপুরুষের নাম লিখে সার্চ করুন। এতে হোল্ডিং/RS/CS/BS সহ বিভিন্ন ধরনের পুরনো রেকর্ডে থাকা তথ্য খুঁজে বের করতে সুবিধা হবে।
🏛️ যদি অনলাইনে খুঁজে না পান, টাঙ্গাইল জেলার স্থানীয় অফিসগুলোতে করণীয়
অনলাইনে যদি কোনো তথ্য না পাওয়া যায়, তবে সরাসরি টাঙ্গাইল জেলার সংশ্লিষ্ট অফিসগুলোতে যোগাযোগ করতে হবে:
১. সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে রেজিস্ট্রি কপি চেক
-
আপনার জমিটি যে উপজেলার অধীনে আছে, সেই সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে যোগাযোগ করুন।
-
অফিসের কর্মীদের কাছে আপনার দাদার নাম, বাবার নাম এবং গ্রামের নাম উল্লেখ করে জিজ্ঞাসা করুন যে এই নামে কোনো জমি রেজিস্ট্রি করা আছে কিনা। তারা তাদের রেকর্ডবুকে খুঁজে আপনাকে তথ্য দিতে পারবে।
২. স্থানীয় ভূমি অফিস (তহসিল অফিস) থেকে খতিয়ান চেক
-
নির্দিষ্ট মৌজার অধীনে যে ইউনিয়ন ভূমি অফিস (বা তহসিল অফিস) আছে, সেখানে যোগাযোগ করুন।
-
কর্মকর্তার কাছে আপনার পূর্বপুরুষের নাম উল্লেখ করে সেই মৌজায় তার নামে কোনো খতিয়ান আছে কিনা, তা জানতে চান। একই নামে একাধিক খতিয়ান থাকলে তারা আপনাকে তালিকা দেখিয়ে দেবে।
এই প্রক্রিয়াগুলো অনুসরণ করে আপনি টাঙ্গাইল জেলার যেকোনো এলাকায় আপনার বাপ-দাদার নামে থাকা পুরনো জমি সহজে খুঁজে বের করতে পারবেন।
