জমির মালিকানা স্বত্ব নিশ্চিত করতে এবং অংশীদারদের মধ্যে সঠিক বণ্টন বুঝতে ‘খতিয়ানের হিস্যা’ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। বিশেষ করে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত বা যৌথ মালিকানাধীন জমির ক্ষেত্রে কার কতটুকু অধিকার, তা নির্ধারণ করা হয় এই হিস্যার মাধ্যমে। ব্রিটিশ আমল থেকে চলে আসা আনা-গণ্ডা-কড়া-ক্রান্তির জটিল হিসাব বর্তমানে আধুনিক দশমিক পদ্ধতিতে রূপান্তরিত হওয়ায় সাধারণ মানুষের জন্য এটি বোঝা এখন আরও সহজ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
হিস্যা বা অংশ বণ্টন কী?
খতিয়ানে উল্লিখিত মালিকানার অনুপাতকেই ‘হিস্যা’ বলা হয়। একটি খতিয়ানে মোট জমির পরিমাণ কত এবং সেই জমির মধ্যে কোন মালিকের অংশ কতটুকু, তা এই হিস্যা কলামে লেখা থাকে। এটি মূলত জমির স্বত্বের একটি গাণিতিক প্রকাশ।
সনাতন ও আধুনিক হিস্যা পদ্ধতি
সংযুক্ত তথ্যানুসারে, খতিয়ানে হিস্যা প্রধানত দুইভাবে দেখা যায়:
১. সাবেক বা আনা পদ্ধতি (আর.এস ও পি.এস খতিয়ানে প্রচলিত): এই পদ্ধতিতে মোট জমিকে ‘১৬ আনা’ (১ সম্পূর্ণ অংশ) ধরা হয়। এই ১৬ আনাকে আবার ২০ গণ্ডা, ৪ কড়া ও ৩ ক্রান্তিতে ভাগ করা হয়। যেমন- ছবিতে দেখা যাচ্ছে, ৫ আনা ৬ গণ্ডা ২ কড়া ২ ক্রান্তিকে সংকেতিক চিহ্নে ১/৬। ১ // হিসেবে লেখা হয়। তৎকালে ৬৪ পয়সায় ১ টাকা ধরা হলেও ভূমি রেকর্ডে ১৬ আনার হিসাবই মূল ভিত্তি।
২. বর্তমান বা দশমিক পদ্ধতি (বি.এস বা আধুনিক খতিয়ানে প্রচলিত): বর্তমান পদ্ধতিতে মোট জমিকে ‘১.০০’ (এক) ধরা হয়। খতিয়ানে মালিকের নামের পাশে দশমিকের ঘরে তার অংশ লেখা থাকে (যেমন- .৩৩৩ বা .২৫০)।
হিস্যা বের করার সহজ নিয়ম
যেকোনো খতিয়ান থেকে নিজের জমির পরিমাণ বের করার সূত্রটি হলো:
ব্যক্তির জমির পরিমাণ = খতিয়ানের মোট জমি × ব্যক্তির নিজস্ব হিস্যা
উদাহরণ: যদি কোনো খতিয়ানে মোট জমির পরিমাণ ৩০ শতাংশ হয় এবং সেখানে ৪ জন সমান অংশীদার থাকেন, তবে প্রত্যেকের হিস্যা হবে ০.২৫০ (বা ৪ ভাগের ১ ভাগ)। হিসাব: ৩০ × ০.২৫০ = ৭.৫ শতাংশ। অর্থাৎ, ওই খতিয়ানে প্রত্যেকের জমির পরিমাণ ৭.৫ শতাংশ।
কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ?
ভূমি বিশেষজ্ঞদের মতে, হিস্যা সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা না থাকলে নানাবিধ জটিলতা তৈরি হতে পারে:
নামজারি (Mutation): জমি ক্রয়-বিক্রয়ের পর সঠিক হিস্যা অনুযায়ী নামজারি না করলে মালিকানা ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
দলিল সম্পাদন: ভুল হিস্যা দিয়ে দলিল করলে পরবর্তীতে তা বাতিলের মুখে পড়তে পারে।
বিরোধ নিষ্পত্তি: পৈতৃক সম্পত্তিতে ভাই-বোন বা শরিকদের মধ্যে সীমানা ও হিস্যা নিয়ে বিরোধ নিরসনে এটিই প্রধান আইনি ভিত্তি।
সতর্কতা
একটি দাগে একাধিক খতিয়ান থাকতে পারে। সেক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট খতিয়ানের মোট জমির ওপরই কেবল ওই খতিয়ানের মালিকদের হিস্যা কার্যকর হবে। ভূমি অফিসের রেকর্ড বা খতিয়ানের প্রথম পৃষ্ঠায় মালিকের নামের পাশেই এই হিস্যা স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকে, যা খতিয়ান সংগ্রহের সময় যাচাই করে নেওয়া জরুরি।
সঠিকভাবে হিস্যা বণ্টন ও বোঝার মাধ্যমে জমি সংক্রান্ত হয়রানি এবং দীর্ঘমেয়াদী মামলা-মোকদ্দমা থেকে রেহাই পাওয়া সম্ভব।

