আজকের খবর ২০২৬

জমি সংক্রান্ত মামলা থেকে বাঁচতে জরুরি ‘বন্টননামা’ দলিল: জানুন নিয়ম ও খরচ

বাংলাদেশের আদালতগুলোতে বিচারাধীন জমি সংক্রান্ত মামলার একটি বড় অংশই উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সম্পত্তির ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে। পারিবারিক এই বিবাদ এড়াতে এবং জমির নিরঙ্কুশ মালিকানা বজায় রাখতে ‘বন্টননামা’ বা বাটোয়ারা দলিল রেজিস্ট্রি করা এখন সময়ের দাবি। রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনের ১৪৩(বি) ধারা মোতাবেক, রেকর্ডীয় মালিকের মৃত্যুর পর ওয়ারিশদের মধ্যে বন্টননামা দলিল সম্পাদন ও রেজিস্ট্রি করা বাধ্যতামূলক।

বন্টননামা দলিল কেন প্রয়োজন?

শুধুমাত্র মৌখিক ভাগাভাগি বা আপোষের ভিত্তিতে জমির মালিকানা আইনত প্রতিষ্ঠিত হয় না। বন্টননামা দলিল থাকলে যেসব সুবিধা পাওয়া যায়:

  • নামজারি ও রেকর্ড: ওয়ারিশি সম্পত্তির নামজারি (Mutation) এবং নতুন ভূমি জরিপে নিজের নামে রেকর্ড করাতে এই দলিল আবশ্যক।

  • জমি বিক্রি ও ঋণ: বন্টননামা ছাড়া ওয়ারিশি জমি বিক্রি করা বা ব্যাংক থেকে লোন নেওয়া প্রায় অসম্ভব।

  • আইনি সুরক্ষা: ভবিষ্যতে অংশীদারদের মধ্যে মামলা-মোকদ্দমা হওয়ার ঝুঁকি থাকে না।

দলিল করতে যা যা প্রয়োজন

একটি সঠিক বন্টননামা দলিল তৈরির জন্য প্রধানত চারটি বিষয় নিশ্চিত করতে হয়: ১. মূল মালিকের মৃত্যু সনদ। ২. সঠিক ওয়ারিশ কায়েম সনদ (চেয়ারম্যান/কাউন্সিলর প্রদত্ত)। ৩. সম্পত্তির হালনাগাদ মালিকানা দলিল ও খতিয়ান। ৪. সকল অংশীদারের উপস্থিতি ও সম্মতি

রেজিস্ট্রেশন ও আনুষঙ্গিক খরচ

বন্টননামা দলিলের রেজিস্ট্রেশন ফি নির্ধারিত হয় সম্পত্তির মূল্যের ওপর ভিত্তি করে (সবচেয়ে বড় অংশটি বাদ দিয়ে বাকি অংশের মূল্যের ওপর)।

রেজিস্ট্রেশন ফি-এর তালিকা: | সম্পত্তির মূল্য (বড় অংশ বাদে) | রেজিস্ট্রেশন ফি | | :— | :— | | ৩ লক্ষ টাকা পর্যন্ত | ৫০০ টাকা | | ৩ লক্ষ ১ টাকা থেকে ১০ লক্ষ টাকা | ৭০০ টাকা | | ১০ লক্ষ ১ টাকা থেকে ৩০ লক্ষ টাকা | ১২০০ টাকা | | ৩০ লক্ষ ১ টাকা থেকে ৫০ লক্ষ টাকা | ১৮০০ টাকা | | ৫০ লক্ষ টাকার ঊর্ধ্বে | ২০০০ টাকা |

অন্যান্য খরচ:

  • স্টাম্প শুল্ক: ৫০ টাকা।

  • হলফনামা: ২০০ টাকার স্টাম্পে।

  • ই-ফি: ১০০ টাকা।

  • এন-ফি: প্রতি পৃষ্ঠা (বাংলা) ১৬ টাকা।

  • এনএন-ফি: প্রতি পৃষ্ঠা (বাংলা) ২৪ টাকা (নগদে প্রদেয়)।

  • কোর্ট ফি: সম্পত্তি হস্তান্তর নোটিশের জন্য ১০ টাকা।

দলিল করার প্রক্রিয়া

প্রথমে একজন দক্ষ দলিল লেখক বা আইনজীবীর মাধ্যমে বন্টননামা ড্রাফট করে নিতে হবে। এরপর সোনালী ব্যাংকের নির্ধারিত কোডে (১৪২২২০১) প্রয়োজনীয় ফি জমা দিয়ে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে সকল অংশীদারের উপস্থিতিতে স্বাক্ষর করতে হবে। সাব-রেজিস্ট্রার দলিলটি যাচাই করে রেজিস্ট্রি সম্পন্ন করবেন।

বিশেষ সতর্কবার্তা: ওয়ারিশি স্থাবর সম্পত্তি ছাড়া অন্যভাবে অর্জিত সম্পত্তি বন্টনের ক্ষেত্রে ‘উৎস কর’ প্রযোজ্য হতে পারে। তাই জমি বন্টনের আগে অভিজ্ঞ কারো পরামর্শ নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।

দেওয়ানী মামলা দ্রুত সমাধান হয় না কেন?

বাংলাদেশে দেওয়ানী মামলা (Civil Suit) নিষ্পত্তি হতে দীর্ঘ সময় লাগা একটি অতি পরিচিত সমস্যা। অনেক ক্ষেত্রে একটি মামলা শেষ হতে ১০ থেকে ২০ বছর, এমনকি প্রজন্ম পার হয়ে যায়। এই দীর্ঘসূত্রতার পেছনে বেশ কিছু আইনগত, কাঠামোগত এবং ব্যবহারিক কারণ রয়েছে:

১. অপর্যাপ্ত বিচারক ও আদালতের সংখ্যা

জনসংখ্যার তুলনায় বাংলাদেশে বিচারকের সংখ্যা অত্যন্ত কম। লক্ষ লক্ষ মামলার বিপরীতে বিচারকের সংখ্যা সীমিত হওয়ায় প্রতিটি মামলার জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। একজন বিচারককে প্রতিদিন অনেকগুলো মামলার শুনানি নিতে হয়, যা গুণগত ও দ্রুত বিচার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে।

২. সমন জারিতে বিলম্ব

দেওয়ানী মামলার প্রথম ধাপ হলো বিবাদীকে সমন জারি করা। অনেক সময় বিবাদী ইচ্ছাকৃতভাবে সমন গ্রহণ করেন না বা পিয়ন ভুল প্রতিবেদন দেন। সমন জারি না হওয়া পর্যন্ত মামলার বিচারিক কার্যক্রম শুরু করা যায় না, যা বছরের পর বছর সময় ক্ষেপণ করে।

৩. পক্ষগণের অনীহা ও সময়ের আবেদন (Adjournment)

মামলার কোনো এক পক্ষ (সাধারণত বিবাদী পক্ষ) মামলা দীর্ঘায়িত করার জন্য বারবার সময়ের আবেদন করেন। আইনজীবী অসুস্থ থাকা বা প্রয়োজনীয় সাক্ষী না আসার অজুহাতে আদালত থেকে সময় নেওয়া হয়। যদিও আইনে নির্দিষ্ট সংখ্যক সময়ের বিধান আছে, কিন্তু বাস্তবতায় তা কঠোরভাবে পালন করা সম্ভব হয় না।

৪. আপিল ও রিভিশনের দীর্ঘ প্রক্রিয়া

দেওয়ানী মামলায় আদালতের যেকোনো অন্তর্বর্তীকালীন আদেশের বিরুদ্ধে উচ্চতর আদালতে আপিল বা রিভিশন করার সুযোগ থাকে। যখনই কোনো পক্ষ উচ্চ আদালতে যায়, তখন নিম্ন আদালতের মূল মামলার কার্যক্রমের ওপর অনেক সময় স্থগিতাদেশ (Stay Order) চলে আসে। এতে মূল মামলাটি থমকে থাকে।

৫. সাক্ষীর অনুপস্থিতি ও নথিপত্রের জটিলতা

জমি সংক্রান্ত বা অন্যান্য দেওয়ানী মামলায় অনেক পুরাতন নথিপত্র (যেমন: ব্রিটিশ আমলের খতিয়ান বা দলিল) প্রমাণ হিসেবে দাখিল করতে হয়। এই নথিপত্র সংগ্রহ এবং সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিস থেকে সাক্ষীদের এসে সাক্ষ্য প্রদান নিশ্চিত করতে দীর্ঘ সময় লাগে।

৬. মধ্যস্থতা বা এডিআর (ADR) এর অকার্যকারিতা

আইনে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি বা Alternative Dispute Resolution (ADR) এর বিধান থাকলেও বাংলাদেশে এর প্রয়োগ এখনো খুব একটা জনপ্রিয় হয়নি। মামলা শুরুতেই আপোষের মাধ্যমে সমাধান করার মানসিকতা বিচারপ্রার্থীদের মধ্যে কম দেখা যায়।

৭. আইনজীবীদের ব্যস্ততা ও ফি পদ্ধতি

অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, সিনিয়র আইনজীবীরা একই দিনে অনেকগুলো আদালতে ব্যস্ত থাকেন, ফলে নির্দিষ্ট মামলার শুনানি করা সম্ভব হয় না। এছাড়া মামলার তারিখ যত বাড়বে, আইনজীবীর ফি তত বাড়বে—এমন একটি ধারণা বা চর্চাও ক্ষেত্রবিশেষে মামলা দীর্ঘায়িত হওয়ার পেছনে কাজ করে।


দ্রুত সমাধানের উপায় কী হতে পারে?

  • এডিআর (ADR) জোরদার করা: মামলার শুরুতেই আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা।

  • ডিজিটালাইজেশন: সমন জারি এবং আদালতের নথিপত্র ডিজিটাল পদ্ধতিতে সংরক্ষণ ও আদান-প্রদান করা।

  • সময় সীমিত করা: অযৌক্তিক সময়ের আবেদন (Adjournment) কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা।

  • বিচারক নিয়োগ: মামলার অনুপাতে বিচারকের সংখ্যা দ্বিগুণ বা তিনগুণ করা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *