ট্রিকস এন্ড টিপস

১০ লাখ টাকা কাবিনে বিয়ের রেজিস্ট্রেশন ফি কত? জেনে নিন সঠিক নিয়ম

বাংলাদেশে মুসলিম বিবাহ ও তালাক নিবন্ধন ফি পুনঃনির্ধারণ করেছে সরকার। ২০২২ সালের ২১ ডিসেম্বর আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় এক গেজেটের মাধ্যমে এই নতুন ফি তালিকা প্রকাশ করে। সাধারণ মানুষের মধ্যে বিয়ের রেজিস্ট্রেশন খরচ নিয়ে অনেক সময় অস্পষ্টতা থাকে। বিশেষ করে কাবিনের টাকার অংকের ওপর ভিত্তি করে ফি কত হবে, তা নিয়ে নানা মতভেদ রয়েছে।

১০ লাখ টাকা কাবিনের সঠিক হিসাব:

সরকারি গেজেট অনুযায়ী, বিয়ের দেনমোহরের পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে রেজিস্ট্রেশন ফি ধাপে ধাপে নির্ধারিত হয়। ১০ লাখ টাকা দেনমোহরের ক্ষেত্রে হিসাবটি হবে নিম্নরূপ:

১. প্রথম ৫ লক্ষ টাকার জন্য: প্রতি ১ হাজার টাকায় ফি ১৪ টাকা। সেই হিসেবে ৫ লক্ষ টাকার জন্য ফি আসে ৭,০০০ টাকা। তবে মনে রাখতে হবে, সর্বনিম্ন রেজিস্ট্রেশন ফি ২০০ টাকা (যদি দেনমোহরের পরিমাণ অনেক কম হয়)।

২. পরবর্তী ৫ লক্ষ টাকার জন্য: দেনমোহর ৫ লক্ষ টাকার বেশি হলে, পরবর্তী প্রতি ১ লক্ষ টাকা বা তার অংশের জন্য ফি মাত্র ১০০ টাকা। অর্থাৎ, বাকি ৫ লক্ষ টাকার জন্য ফি আসবে (৫ × ১০০) = ৫০০ টাকা

৩. মোট ফি: তাহলে ১০ লক্ষ টাকা কাবিনের জন্য সরকারি মূল রেজিস্ট্রেশন ফি দাঁড়াবে মোট ৭,৫০০ টাকা (৭,০০০ + ৫০০)।

অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ:

মূল রেজিস্ট্রেশন ফি ছাড়াও আরও কিছু ছোটখাটো সরকারি ফি রয়েছে:

  • কমিশন ফি: যদি নিকাহ রেজিস্ট্রার (কাজী) বিয়ের অনুষ্ঠানে গিয়ে নিবন্ধন করেন, তবে তার জন্য কমিশন ফি ৫০ টাকা

  • যাতায়াত খরচ: কাজীর যাতায়াতের জন্য প্রতি কিলোমিটারের জন্য ফি ১০ টাকা

  • নকল বা অনুলিপি প্রাপ্তি ফি: বিয়ের নিবন্ধনের অনুলিপি বা কপির জন্য ফি ৫০ টাকা

  • বহি তল্লাশি ফি: বালাম বই তল্লাশির প্রয়োজন হলে ফি ১০ টাকা

কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য:

গেজেটে স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে যে, বিবাহ নিবন্ধনের ফি পরিশোধের দায়িত্ব মূলত বরের। অন্যদিকে, তালাক নিবন্ধনের ক্ষেত্রে ফি ১,০০০ টাকা (বি/সি/ডি ফরমের জন্য), যা চাহিদা অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট পক্ষ প্রদান করবে।

অনেকের ধারণা ১০ লাখ টাকার কাবিনে ফি অনেক বেশি বা প্রতি হাজারে ১৫০ টাকা, যা সঠিক নয়। সরকারি চার্ট অনুযায়ী ৫ লক্ষ টাকার পরবর্তী প্রতি লক্ষ টাকার জন্য ফি মাত্র ১০০ টাকা। তাই অতিরিক্ত ফি আদায় রোধে সাধারণ নাগরিকদের এই সরকারি চার্ট সম্পর্কে সচেতন থাকা জরুরি।

বিয়ে কে সহজ করতে কাবিন কত টাকা হওয়া উচিত?

বিয়েকে সহজ করার বিষয়টি মূলত ধর্মীয়, সামাজিক এবং ব্যক্তিগত আর্থিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে। তবে ইসলামি শরিয়াহ এবং বর্তমান আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে বিয়ে সহজ করার জন্য মোহরানা বা কাবিনের বিষয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক বিবেচনা করা যেতে পারে:

১. সাধ্যের মধ্যে রাখা: মোহরানা বা কাবিনের মূল উদ্দেশ্য হলো কনের সম্মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। তবে এটি এমন হওয়া উচিত যা বরের সামর্থ্যের মধ্যে থাকে। সাধ্যের অতিরিক্ত কাবিন নির্ধারণ করলে বিয়ের শুরুতেই বর মানসিক ও আর্থিক চাপে পড়ে যায়, যা বিয়েকে কঠিন করে তোলে।

২. ‘মোহর-ই-ফাতেমি’র আদর্শ: ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে মোহরানা কম হওয়াকে বরকতময় মনে করা হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কন্যা ফাতিমা (রা.)-এর বিয়ের মোহরানা (যা মোহর-ই-ফাতেমি নামে পরিচিত) একটি আদর্শ উদাহরণ। বর্তমান সময়ে এর মূল্য আনুমানিক দেড় থেকে দুই লক্ষ টাকার আশেপাশে হতে পারে (রূপার দাম অনুযায়ী)। বিয়ে সহজ করতে এটি একটি চমৎকার মাপকাঠি হতে পারে।

৩. নিরাপত্তা বনাম দেনমোহর: অনেকে মনে করেন কাবিনের টাকা অনেক বেশি হলে বিবাহবিচ্ছেদ কম হবে। কিন্তু বাস্তবে বিশাল অংকের কাবিন সবসময় সুখী দাম্পত্যের গ্যারান্টি দেয় না। বরং পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং বুঝপড়া থাকলে অল্প কাবিনেও সংসার সুখের হয়।

৪. রেজিস্ট্রেশন খরচ বিবেচনা: আপনি আগের চার্টে দেখেছেন, কাবিনের পরিমাণ যত বাড়ে, সরকারি রেজিস্ট্রেশন ফি-ও তত বাড়ে। ৫ লক্ষ টাকার পর প্রতি লাখে ফি কম হলেও, বড় অংকের কাবিনে মোট খরচ বেশ বেড়ে যায়।

৫. নগদ আদায়: ইসলামি বিধান অনুযায়ী মোহরানা নগদে পরিশোধ করা উত্তম। বিয়ে সহজ করতে কাবিনের একটি বড় অংশ যদি বিয়ের সময়ই নগদে দিয়ে দেওয়া যায় (যেমন গয়না বা নগদ টাকা), তবে তা উভয়ের জন্য স্বস্তিদায়ক হয়।

উপসংহার: বিয়ে সহজ করতে কাবিনের পরিমাণ এমন হওয়া উচিত যা বর অনায়াসেই পরিশোধ করতে পারে এবং কনেও খুশি মনে গ্রহণ করে। মধ্যবিত্ত বা নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারে ২ থেকে ৫ লক্ষ টাকার মধ্যে কাবিন নির্ধারণ করা বর্তমানে একটি বাস্তবসম্মত এবং সহজ সমাধান হতে পারে। তবে মনে রাখবেন, এটি সম্পূর্ণই দুই পরিবারের আলোচনার ওপর নির্ভরশীল।

মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত— “বিয়ে হবে সহজ, আর পাপাচার হবে কঠিন।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *