ভূমি আইন ২০২৬

জমি বা ফ্ল্যাট কেনার আগে সাবধান! টাকা বিনিয়োগের আগে যে ৫টি বিষয় যাচাই করা বাধ্যতামূলক

সূচীপত্র

জমি বা ফ্ল্যাট কেনা মানুষের জীবনের অন্যতম বড় বিনিয়োগ। সারাজীবনের সঞ্চয় দিয়ে একটি মাথা গোঁজার ঠাঁই করতে গিয়ে সামান্য অসতর্কতায় পড়তে পারেন চরম আইনি জটিলতায়। প্রতারণা এড়াতে এবং আপনার কষ্টার্জিত টাকা সুরক্ষিত রাখতে দলিল হস্তান্তরের আগে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যাচাই করা অপরিহার্য বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

নিচে জমি বা ফ্ল্যাট কেনার আগে দলিলের যে বিষয়গুলো অবশ্যই খতিয়ে দেখা উচিত:

১. মালিকানার ধারাবাহিকতা (Chain of Ownership)

যার কাছ থেকে আপনি জমি কিনছেন, তিনি আসলে জমির প্রকৃত মালিক কি না তা নিশ্চিত হতে হবে। এ ক্ষেত্রে শুধু বর্তমান দলিল দেখলে হবে না, বরং পূর্ববর্তী মালিকদের ভায়া দলিল (Via Deed) বা পিট দলিলসমূহ পরীক্ষা করতে হবে। মালিকানার চেইন বা ধারাবাহিকতায় কোনো বিচ্যুতি থাকলে ভবিষ্যতে মালিকানা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।

২. দাগ ও খতিয়ান নম্বর যাচাই

দলিলে উল্লেখিত দাগ নম্বর এবং খতিয়ান নম্বর সঠিক কি না তা গুরুত্বের সাথে দেখুন। বিশেষ করে বর্তমান জরিপের (বিএস/আরএস) সাথে দলিলের তথ্যের মিল থাকা বাধ্যতামূলক। তথ্যের অমিল থাকলে পরবর্তীতে জমিটি রেকর্ড করতে সমস্যার সম্মুখীন হতে হবে।

৩. জমির সঠিক চৌহদ্দি (Boundary)

দলিলের তফসিলে বর্ণিত চৌহদ্দি (উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব, পশ্চিম দিকে কে বা কী আছে) এর বর্ণনার সাথে বাস্তব জমির অবস্থানের মিল থাকতে হবে। অনেক সময় দলিলে এক জায়গার বর্ণনা থাকে কিন্তু বাস্তবে অন্য জমি দেখানো হয়, যা বড় ধরণের জালিয়াতির অংশ।

৪. নামজারি ও সর্বশেষ খাজনা রশিদ

বিক্রেতার নামে সর্বশেষ নামজারি (Mutation) সম্পন্ন হয়েছে কি না এবং জমিটির হালনাগাদ ভূমি উন্নয়ন কর (খাজনা) পরিশোধ করা আছে কি না তা যাচাই করুন। নামজারি ছাড়া জমির পূর্ণাঙ্গ মালিকানা স্বত্ব প্রতিষ্ঠিত হয় না।

৫. রেজিস্ট্রি অফিসের সিল ও স্বাক্ষর

বর্তমানে জাল দলিলের উপদ্রব বেড়েছে। তাই সন্দেহ হলে মূল দলিলটি সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে বালাম বইয়ের সাথে মিলিয়ে দেখা উচিত। অনেক সময় জাল দলিলে ভুয়া সিল ও স্বাক্ষর ব্যবহার করা হয়ে থাকে।


বিশেষজ্ঞের পরামর্শ: একটি ত্রুটিপূর্ণ দলিল আপনাকে দীর্ঘমেয়াদী মামলা এবং আর্থিক ক্ষতির মুখে ফেলতে পারে। তাই জমি ক্রয়ের আগে তাড়াহুড়ো না করে একজন অভিজ্ঞ দলিল লেখক বা আইনজীবীর মাধ্যমে সকল কাগজপত্র যাচাই করে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে।

ফ্ল্যাট নাকি জমি কিনবেন?

ফ্ল্যাট নাকি জমি—কোনটি কিনবেন তা সম্পূর্ণ নির্ভর করে আপনার বাজেটের আকার, আয়ের উৎস এবং ভবিষ্যতের পরিকল্পনার ওপর। নিচে একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ দেওয়া হলো যা আপনাকে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করবে:


১. জমি কেনার সুবিধা ও অসুবিধা

সুবিধা:

  • সম্পদ বৃদ্ধি: জমির দাম সাধারণত ফ্ল্যাটের তুলনায় অনেক দ্রুত বৃদ্ধি পায়। দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগের জন্য জমি সেরা।

  • স্বাধীন মালিকানা: জমির ওপর আপনার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকে। আপনি চাইলে নিজের পছন্দমতো নকশায় বাড়ি করতে পারেন বা বাগান করতে পারেন।

  • ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য: জমি একটি স্থায়ী সম্পদ যা কয়েক প্রজন্ম ধরে ব্যবহার করা যায়।

অসুবিধা:

  • নিরাপত্তা ঝুঁকি: জমি দখল বা আইনি ঝামেলা হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। সবসময় দেখাশোনা করতে হয়।

  • বড় বিনিয়োগ: শহরের ভেতরে জমি কিনতে এককালীন অনেক বড় অংকের টাকা প্রয়োজন হয়।


২. ফ্ল্যাট কেনার সুবিধা ও অসুবিধা

সুবিধা:

  • তাত্ক্ষণিক বসবাস: ফ্ল্যাট কেনামাত্রই আপনি সেখানে থাকতে পারেন বা ভাড়া দিয়ে আয় শুরু করতে পারেন।

  • নাগরিক সুবিধা: সাধারণত আধুনিক ফ্ল্যাটগুলোতে নিরাপত্তা, জেনারেটর, লিফট এবং কমিউনিটি হলের মতো সুবিধা থাকে।

  • সহজ ঋণ: জমির তুলনায় ফ্ল্যাট কেনার জন্য ব্যাংক লোন পাওয়া কিছুটা সহজ।

অসুবিধা:

  • মূল্য হ্রাস: ফ্ল্যাটের বয়স বাড়ার সাথে সাথে ভবনের অবচয় (Depreciation) হয়, ফলে অনেক সময় এর দাম জমির মতো দ্রুত বাড়ে না।

  • সীমিত স্বাধীনতা: আপনি চাইলেই ফ্ল্যাটের বাইরের কাঠামো বা নকশা পরিবর্তন করতে পারবেন না।


আপনার জন্য কোনটি সঠিক? (কুইক গাইড)

আপনার চাহিদা যদি এমন হয়…তাহলে পছন্দ করুন:
দ্রুত বসবাস করতে চান এবং নিরাপত্তা চানফ্ল্যাট
ভবিষ্যতে বড় অংকের মুনাফা (বিনিয়োগ) চানজমি
বাজেট কিছুটা কম এবং কিস্তিতে দিতে চানফ্ল্যাট
নিজের মতো করে বাড়ি তৈরির স্বপ্ন থাকেজমি

সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে শেষ পরামর্শ:

যদি আপনার লক্ষ্য হয় বিনিয়োগ, তবে ঢাকার আশেপাশে বা ক্রমবর্ধমান এলাকায় জমি কেনা লাভজনক। আর যদি আপনি শহরের কেন্দ্রে নিরাপদ ও ঝামেলামুক্ত বসবাস চান, তবে একটি ভালো মানের ফ্ল্যাট কেনাই বুদ্ধিমানের কাজ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *