আজকের খবর ২০২৬

জমি বন্ধক নেওয়ার আগে ও পরে: জেনে নিন নির্ভুল বন্ধকনামা লেখার নিয়ম

সূচীপত্র

গ্রামীণ কিংবা শহর অঞ্চলে জরুরি প্রয়োজনে টাকার বিনিময়ে জমি বন্ধক রাখার প্রচলন দীর্ঘদিনের। তবে সঠিক নিয়ম ও আইনি প্রক্রিয়া না মানলে অনেক সময় জমি মালিক বা বন্ধক গ্রহীতা—উভয়কেই আইনি জটিলতায় পড়তে হয়। সম্প্রতি জমি বন্ধকনামা বা চুক্তিপত্র লেখার একটি স্ট্যান্ডার্ড ফরম্যাট বা নমুনা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে বেশ আগ্রহ দেখা যাচ্ছে।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি সঠিক জমি বন্ধকনামা চুক্তিপত্রে উভয় পক্ষের স্বার্থ সুরক্ষিত থাকা জরুরি। একটি আদর্শ বন্ধকনামা দলিলে প্রধানত যে বিষয়গুলো উল্লেখ থাকা আবশ্যক, তা নিচে তুলে ধরা হলো:

১. উভয় পক্ষের বিস্তারিত পরিচয়

চুক্তিপত্রের শুরুতে প্রথম পক্ষ (জমির মালিক/বন্ধক দাতা) এবং দ্বিতীয় পক্ষ (বন্ধক গ্রহীতা)-এর নাম, বাবার নাম, পূর্ণ ঠিকানা, জাতীয়তা, ধর্ম এবং পেশা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে। এতে ভবিষ্যতে কোনো পক্ষকে শনাক্ত করতে অসুবিধা হয় না।

২. জমির মালিকানা ও প্রাপ্তির বিবরণ

প্রথম পক্ষ জমিটি কীভাবে পেয়েছেন (যেমন: উত্তরাধিকার সূত্রে বা ক্রয় সূত্রে), তা চুক্তিতে স্পষ্টভাবে বলতে হয়। জমিটি কোনো বিবাদমুক্ত এবং দাতা শান্তিপূর্নভাবে ভোগদখল করছেন—এই মর্মে একটি ঘোষণা থাকা জরুরি।

৩. আর্থিক লেনদেনের স্বচ্ছতা

বন্ধক বাবদ কত টাকা আদান-প্রদান হচ্ছে, তা অংকে এবং কথায় লিখতে হবে। সেই সাথে টাকাটি উপস্থিত সাক্ষীদের সামনে বুঝে নেওয়া হয়েছে কি না, তাও উল্লেখ করতে হবে।

৪. অধিকার ও ভোগদখলের শর্ত

সাধারণত বন্ধক গ্রহীতা জমিটিতে ফসল ফলানো বা ভোগদখল করার পূর্ণ অধিকার পান। চুক্তিতে উল্লেখ থাকা উচিত যে, যতদিন পর্যন্ত আসল টাকা ফেরত দেওয়া না হবে, ততদিন দ্বিতীয় পক্ষ জমিতে চাষাবাদ বা দখল বজায় রাখতে পারবেন।

৫. পরবর্তী উত্তরাধিকারীদের দায়বদ্ধতা

একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো—চুক্তি চলাকালীন কোনো পক্ষের মৃত্যু হলে তার ওয়ারিশদের ভূমিকা কী হবে? আদর্শ চুক্তিতে উল্লেখ থাকে যে, বন্ধক দাতা মারা গেলেও তার উত্তরাধিকারীরা টাকা ফেরত দিয়ে জমি বুঝে নিতে বাধ্য থাকবেন, একইভাবে গ্রহীতার ওয়ারিশরাও টাকা বুঝে নিয়ে জমি ফেরত দিতে বাধ্য থাকবেন।

৬. তফসিল বা জমির পরিচয়

দলিলে জমির সঠিক অবস্থান (জেলা, থানা, মৌজা) এবং খতিয়ান ও দাগ নম্বরসহ জমির মোট পরিমাণ নির্ভুলভাবে উল্লেখ করতে হয়। এতে কোনো ভুল থাকলে পুরো চুক্তিটিই বাতিল হতে পারে।

৭. সাক্ষীর গুরুত্ব

যেকোনো আইনি দলিলে অন্তত ২-৩ জন বিশ্বস্ত সাক্ষীর স্বাক্ষর থাকা অপরিহার্য। এটি চুক্তির গ্রহণযোগ্যতা ও সত্যতা প্রমাণে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে।

সতর্কতা: জমি বন্ধক থাকাকালীন মালিক সেই জমি অন্য কারো কাছে বিক্রি বা পুনরায় হস্তান্তর করতে পারবেন না। করলে সেটি চুক্তি ভঙ্গের শামিল এবং দ্বিতীয় পক্ষ চাইলে আইনের আশ্রয় নিতে পারবেন।


উপসংহার: জমি বন্ধকনামা তৈরির সময় শুধু সাদা কাগজে না লিখে স্ট্যাম্পে লেখা এবং সম্ভব হলে তা নোটারি বা রেজিস্ট্রি করা বুদ্ধিমানের কাজ। এতে উভয় পক্ষের অধিকার সংরক্ষিত থাকে এবং অনাকাঙ্ক্ষিত ঝামেলা এড়ানো সম্ভব হয়।

স্ট্যাম্প লেখার নমুনা

স্ট্যাম্পে জমি বন্ধকনামা বা চুক্তিপত্র লেখার সময় সাধারণত ৩০০ টাকা বা তদূর্ধ্ব মূল্যের (সরকারি নিয়ম অনুযায়ী) নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প ব্যবহার করা হয়। স্ট্যাম্পের উপরের অংশে কিছুটা জায়গা ফাঁকা রেখে নিচের অংশ থেকে লেখা শুরু করতে হয়।

আপনার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে স্ট্যাম্পে লেখার জন্য একটি মার্জিত ও আইনি কাঠামোর নমুনা নিচে দেওয়া হলো:


জমি বন্ধকনামা চুক্তিপত্র

প্রথম পক্ষ (বন্ধক দাতা): নাম: ……………………………………., পিতা: ……………………………………., মাতা: ……………………………………., ঠিকানা: …………………………………………………………………………, জাতীয়তা: বাংলাদেশী, ধর্ম: ইসলাম, পেশা: ……………..।

দ্বিতীয় পক্ষ (বন্ধক গ্রহীতা): নাম: ……………………………………., পিতা: ……………………………………., মাতা: ……………………………………., ঠিকানা: …………………………………………………………………………, জাতীয়তা: বাংলাদেশী, ধর্ম: ইসলাম, পেশা: ……………..।


পরম করুণাময় মহান আল্লাহ তায়ালার নাম স্মরণ করিয়া অত্র জমি বন্ধকনামা চুক্তিপত্রের বয়ান আরম্ভ করিতেছি। যেহেতু, প্রথম পক্ষ তফসিল বর্ণিত সম্পত্তির পৈত্রিক/অর্জিত সূত্রে মালিক হইয়া ভোগ দখল করিয়া আসিতেছেন। বর্তমানে প্রথম পক্ষের পারিবারিক প্রয়োজনে নগদ টাকার বিশেষ আবশ্যকতা হওয়ায় তিনি নিম্নে বর্ণিত সম্পত্তি বন্ধক রাখার প্রস্তাব করিলে দ্বিতীয় পক্ষ তাহাতে সম্মত হন।

শর্তাবলী:

১. টাকার পরিমাণ: প্রথম পক্ষ দ্বিতীয় পক্ষের নিকট হইতে নগদ ১,০০,০০০/- (এক লক্ষ) টাকা উপস্থিত সাক্ষীগণের সম্মুখে বুঝিয়া পাইয়াছেন।

২. ভোগদখল: অদ্য তারিখ হইতে বন্ধকী জমি দ্বিতীয় পক্ষের দখলে থাকিবে। দ্বিতীয় পক্ষ উক্ত জমিতে নিজে চাষাবাদ করিতে পারিবেন অথবা বর্গা প্রদান করিয়া ফসলাদি ভোগ করিতে পারিবেন। এতে প্রথম পক্ষ কোনো প্রকার হস্তক্ষেপ করিতে পারিবেন না।

৩. মেয়াদ: অত্র বন্ধকনামা চুক্তিপত্রটি অনির্দিষ্টকালের জন্য বলবৎ থাকিবে। যতদিন প্রথম পক্ষ দ্বিতীয় পক্ষকে আসল টাকা (১,০০,০০০/-) ফেরত দিতে না পারিবে, ততদিন জমি দ্বিতীয় পক্ষের দখলে থাকিবে। টাকা ফেরত প্রদান মাত্রই দ্বিতীয় পক্ষ জমি ছাড়িয়া দিতে বাধ্য থাকিবেন।

৪. হস্তান্তর নিষিদ্ধ: বন্ধক থাকাকালীন প্রথম পক্ষ উক্ত জমি অন্য কোথাও বিক্রয় বা পুনরায় বন্ধক দিতে পারিবেন না। যদি করেন, তবে দ্বিতীয় পক্ষ আইনের আশ্রয় নিতে পারিবেন।

৫. উত্তরাধিকার: চুক্তি চলাকালীন কোনো পক্ষের মৃত্যু হইলে তাহার বৈধ ওয়ারিশগণ এই চুক্তির দায় ও অধিকার বহন করিবেন। দাতার ওয়ারিশগণ টাকা ফেরত দিয়া জমি বুঝে নিবেন এবং গ্রহীতার ওয়ারিশগণ টাকা বুঝিয়া পাইয়া জমি ফেরত দিবেন।


বন্ধকী জমির তফসিল পরিচয়:

  • জেলা: নারায়ণগঞ্জ, থানা: রূপগঞ্জ।

  • মৌজা: …………………, খতিয়ান নং: …………………

  • জমির দাগ নং: …………………

  • জমির পরিমাণ: ১৮.৫ (সাড়ে আঠারো) কাঠা।

  • জমির ধরণ: নাল/ফসলি জমি।


এতদ্বার্থে স্বেচ্ছায়, সুস্থ শরীরে, অন্যের বিনা প্ররোচনায় অত্র দলিল পাঠ করিয়া ও মর্ম অবগত হইয়া আমরা উভয় পক্ষ সাক্ষীগণের সম্মুখে নিজ নিজ নাম স্বাক্ষর করিলাম।

সাক্ষীগণের স্বাক্ষর: ১. ………………………………. ২. ………………………………. ৩. ……………………………….

প্রথম পক্ষের স্বাক্ষর (বন্ধক দাতা) ……………………………………………..

দ্বিতীয় পক্ষের স্বাক্ষর (বন্ধক গ্রহীতা) ……………………………………………..


কিছু জরুরি পরামর্শ:

  • স্ট্যাম্পের মূল্য: বর্তমানে বাংলাদেশে এই ধরণের চুক্তির জন্য সাধারণত ৩০০ টাকার স্ট্যাম্প ব্যবহৃত হয়। তবে বড় অঙ্কের টাকার ক্ষেত্রে আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া ভালো।

  • কাটাকাটি: স্ট্যাম্পে কোনো লেখা কাটাকাটি বা ঘষামাজা করবেন না। ভুল হলে সেখানে ছোট করে সই দিয়ে দিবেন।

  • ছবি ও টিপসহি: নিরাপত্তার খাতিরে স্ট্যাম্পের এক কোণায় উভয় পক্ষের পাসপোর্ট সাইজ ছবি লাগিয়ে তার ওপর দিয়ে আড়াআড়ি স্বাক্ষর বা টিপসহি নিতে পারেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *