ভূমি সেবা গ্রহীতাদের হয়রানি বন্ধ এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে ভূমি মন্ত্রণালয়। এখন থেকে দেশের প্রতিটি উপজেলা ভূমি অফিস, সার্কেল ভূমি অফিস এবং ইউনিয়ন বা পৌর ভূমি অফিসে সরকার নির্ধারিত সেবামূল্য বা ফি সংবলিত স্থায়ী সাইনবোর্ড প্রদর্শন করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) প্রতি এই বিশেষ নির্দেশনা জারি করা হয়। একইসঙ্গে মন্ত্রণালয় সাফ জানিয়ে দিয়েছে, ভূমিসেবার যাবতীয় ফি এখন থেকে কেবল অনলাইনে পরিশোধ করতে হবে।
স্থায়ী সাইনবোর্ড ও স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ
মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, প্রতিটি ভূমি অফিসের দৃশ্যমান স্থানে ৪ ফুট বাই ২.৫ ফুট আকারের স্থায়ী সাইনবোর্ড স্থাপন করতে হবে। এই সাইনবোর্ডে কোন সেবার জন্য কত টাকা ফি, তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকবে। এর ফলে সাধারণ মানুষ দালালের খপ্পর বা অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের হাত থেকে রক্ষা পাবেন।
অনলাইনে ফি ও লেনদেনের সতর্কতা
ভূমি মন্ত্রণালয় স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, ভূমি উন্নয়ন করসহ সকল প্রকার সেবামূল্য কেবল অনলাইনে পরিশোধযোগ্য। নাগরিকদের প্রতি বিশেষভাবে অনুরোধ জানানো হয়েছে যেন কোনো প্রকার নগদ লেনদেন না করা হয়। কেউ যদি নির্ধারিত ফির অতিরিক্ত টাকা দাবি করে, তবে তাৎক্ষণিকভাবে ১৬১২২ নম্বরে কল করে অভিযোগ জানানোর পরামর্শ দিয়েছে মন্ত্রণালয়।
একনজরে ভূমিসেবার নির্ধারিত ফি সমূহ
মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিভিন্ন খাতের সুনির্দিষ্ট ফি উল্লেখ করা হয়েছে। নিচে তার একটি তালিকা দেওয়া হলো:
| সেবার ধরন | নির্ধারিত ফি (টাকা) | বিস্তারিত বিবরণ |
| নামজারি (Mutation) ফি | ১,১৭০/- | কোর্ট ফি ২০, নোটিশ জারি ৫০, রেকর্ড সংশোধন ১০০০, খতিয়ান সরবরাহ ১০০ টাকা। |
| খতিয়ান ফি | ১২০/- | সার্টিফাইড বা অনলাইন কপি। |
| ডাকযোগে খতিয়ান | ১৬০/- | খতিয়ান ফি ১২০ + অতিরিক্ত ডাক মাশুল ৪০ টাকা। |
| মৌজা ম্যাপ (প্রতি শিট) | ৫৪৫/- | সরাসরি অফিস থেকে সংগ্রহ করলে। |
| ডাকযোগে মৌজা ম্যাপ | ৬৫৫/- | ম্যাপ ফি ৫৪৫ + অতিরিক্ত ডাক মাশুল ১১০ টাকা। |
মন্ত্রণালয় পুনর্ব্যক্ত করেছে যে, এই নির্ধারিত ফি-র বাইরে অন্য কোনো অতিরিক্ত টাকা দেওয়ার প্রয়োজন নেই। ডিজিটাল ভূমি সেবা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী এবং জনবান্ধব করতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়।
সম্পূর্ণ অনলাইন ভিত্তিক সেবা প্রদান করলে কি দুর্নীতি কমবে?
সম্পূর্ণ অনলাইন ভিত্তিক ভূমিসেবা প্রবর্তন করলে দুর্নীতি উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এটি কেবল প্রযুক্তি স্থাপনের বিষয় নয়, বরং একটি পুরো ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার প্রক্রিয়া। অনলাইনে সেবা প্রদানের মাধ্যমে কীভাবে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব, তার একটি বিশ্লেষণ নিচে দেওয়া হলো:
১. মধ্যস্বত্বভোগী বা দালালের দৌরাত্ম্য হ্রাস
ঐতিহ্যগতভাবে ভূমি অফিসে সরাসরি উপস্থিত হয়ে কাজ করতে গেলে অনেক সময় সাধারণ মানুষ দালালের খপ্পরে পড়েন। অনলাইন ব্যবস্থায় আবেদনকারী সরাসরি সরকারি পোর্টাল বা অ্যাপের মাধ্যমে আবেদন করতে পারেন, ফলে কোনো তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপের প্রয়োজন পড়ে না।
২. সরাসরি আর্থিক লেনদেনের অবসান
দুর্নীতির অন্যতম প্রধান উৎস হলো নগদ অর্থ লেনদেন। সরকার যখন ঘোষণা করে যে “সকল ফি শুধু অনলাইনে পরিশোধযোগ্য”, তখন কর্মকর্তাদের হাতে সরাসরি টাকা নেওয়ার সুযোগ বন্ধ হয়ে যায়। প্রতিটি পয়সার ডিজিটাল ট্রেইল বা রেকর্ড থাকায় হিসাবের গরমিল করা কঠিন হয়ে পড়ে।
৩. ফাইল ট্র্যাকিং ও স্বচ্ছতা
অফিসে ফাইল আটকে রাখা দুর্নীতির একটি পুরনো কৌশল। অনলাইন সিস্টেমে আবেদনকারী দেখতে পারেন তার ফাইলটি বর্তমানে কার ডেস্কে আছে এবং কতদিন ধরে আটকে আছে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না হলে ঊর্ধতন কর্তৃপক্ষকে জবাবদিহি করতে হয়, যা কর্মকর্তাদের দ্রুত কাজ করতে বাধ্য করে।
৪. মানুষের সাথে মানুষের সংস্পর্শ (Human Contact) কমানো
প্রশাসনিক ভাষায় একে বলা হয় “Faceless Service”। সেবা গ্রহীতা এবং সেবা প্রদানকারীর মধ্যে সরাসরি দেখা হওয়ার সুযোগ যত কমবে, অনৈতিক লেনদেনের দর কষাকষিও তত কমে আসবে।
বিদ্যমান চ্যালেঞ্জসমূহ (যেখানে দুর্নীতি উঁকি দিতে পারে)
প্রযুক্তি একা দুর্নীতি বন্ধ করতে পারে না যদি না এর সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত হয়। কিছু ক্ষেত্রে এখনও ঝুঁকি থেকে যায়:
ডিজিটাল লিটারেসি: যারা ইন্টারনেটে দক্ষ নন, তারা অনলাইন আবেদন করতে গিয়ে আবার নতুন ধরনের “ডিজিটাল দালালের” শরণাপন্ন হতে পারেন।
সার্ভার ও ডেটা এন্ট্রি: যদি ম্যানুয়াল রেকর্ড থেকে অনলাইন রেকর্ডে তথ্য তোলার সময় ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল করা হয়, তবে সেটি সংশোধনের নামে আবার দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তদন্ত বা সরেজমিন পরিদর্শন: নামজারির মতো কাজে এখনও সশরীরে তদন্তের প্রয়োজন হয়। এই ধাপটিতে সরাসরি উপস্থিতির প্রয়োজন থাকায় সেখানে স্বচ্ছতা বজায় রাখা একটি চ্যালেঞ্জ।
উত্তরণের উপায়
দুর্নীতি শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে প্রযুক্তির পাশাপাশি তদারকি জরুরি। ভূমি মন্ত্রণালয় যে ১৬১২২ হটলাইন নম্বর দিয়েছে, সেখানে অভিযোগ করার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। এছাড়া ভূমি অফিসের সামনে আপনি যে ৪ ফুট বাই ২.৫ ফুট সাইনবোর্ডের কথা উল্লেখ করেছেন, সেটি সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে বড় ভূমিকা রাখবে।
