আসন্ন পবিত্র ঈদ-উল-আযহা উপলক্ষে রাজধানী ছাড়তে শুরু করেছে মানুষ। গাজীপুরের বিভিন্ন পোশাক কারখানা ছুটি হওয়ার পর আজ রোববার সকাল থেকেই ঢাকা-টাঙ্গাইল-যমুনা সেতু মহাসড়কে উত্তরবঙ্গগামী ঘরমুখো মানুষের ও যানবাহনের চাপ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে মহাসড়কে অতিরিক্ত গাড়ির চাপ থাকলেও বড় ধরনের কোনো স্থায়ী যানজট বা দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতার খবর পাওয়া যায়নি; গাড়ি চলছে ধীরগতিতে। অন্যদিকে, ঈদযাত্রাকে কেন্দ্র করে দূরপাল্লার বাসগুলোতে, বিশেষ করে উত্তরবঙ্গগামী রুটে সাধারণ যাত্রীদের কাছ থেকে ৩০০ থেকে শুরু করে ১,০০০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের তীব্র অভিযোগ উঠেছে।
মহাসড়কের চিত্র: ধীরগতিতে সচল চাকা, যমুনা সেতুতে দ্বিগুণ গাড়ি
সরেজমিনে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের চন্দ্রা ফ্লাইওভারের পশ্চিম প্রান্ত, কালিয়াকৈর বাইপাস, টাঙ্গাইলের ইলোঙ্গা, রাবনা বাইপাস, নগর জলফৈ ও করটিয়া বাইপাস এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, মহাসড়কে যানবাহনের সংখ্যা সাধারণ সময়ের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি। পশুবাহী ট্রাক এবং যাত্রীবাহী বাসের কারণে কিছু কিছু মোড়ে ও ইন্টারসেকশনে সাময়িক জটলা তৈরি হচ্ছে।
যমুনা সেতু কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় যমুনা সেতুতে সাধারণ সময়ের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ গাড়ি পার হয়েছে। শুক্রবার রাত ১২টা থেকে শনিবার রাত ১২টা পর্যন্ত মোট ৩২,৬৪৯টি যানবাহন সেতু পারাপার হয়েছে, যা থেকে টোল আদায় হয়েছে প্রায় ২ কোটি ৯৬ লাখ টাকা।
বঙ্গবন্ধু সেতুর পূর্ব সাইট অফিসের নির্বাহী প্রকৌশলী সৈয়দ রিয়াজ উদ্দিন জানান, ঈদ যত ঘনিয়ে আসছে, গণপরিবহনের চাপ তত বাড়ছে। টোল প্লাজায় দ্রুত টোল আদায়ের জন্য বর্তমানে ১৮টি বুথ সচল রাখা হয়েছে, যার মধ্যে মোটরসাইকেলের জন্য রয়েছে ৪টি বিশেষ বুথ। মহাসড়কে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে টাঙ্গাইল জেলা পুলিশ ও হাইওয়ে পুলিশের প্রায় ৮০০ জন সদস্য এবং গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) মোতায়েন রয়েছে।
তবে হাইওয়ে পুলিশ জানিয়েছে, মহাসড়কের অবস্থা বিগত বছরগুলোর চেয়ে ভালো হলেও অন্তত ৯default৪টি স্পটকে তারা ‘ঝুঁকিপূর্ণ বা জটলাপ্রবণ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। কোথাও হঠাৎ গাড়ি বিকল বা পশুবাহী ট্রাকের কারণে দুর্ঘটনা ঘটলে দীর্ঘ যানজটের শঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
টার্মিনালে ভাড়ার নৈরাজ্য: জিম্মি যাত্রীরা
সড়ক পরিস্থিতি কিছুটা স্বস্তিদায়ক হলেও টিকিটের দাম ও ভাড়া নিয়ে যাত্রীদের ক্ষোভ এখন চরমে। রাজধানীর মহাখালী, গাবতলী ও কল্যাণপুর টার্মিনাল ঘুরে দেখা গেছে, বিআরটিএ (BRTA) নির্ধারিত ভাড়ার তোয়াক্কা না করে পরিবহন অপারেটররা ইচ্ছেমতো ভাড়া আদায় করছে।
গত এপ্রিল মাসে সরকার আন্তঃজেলা ও দূরপাল্লার বাসের ভাড়া কিলোমিটার প্রতি ২.২৩ টাকা নির্ধারণ করে। সেই তালিকা অনুযায়ী, মহাখালী থেকে টাঙ্গাইল (৯০ কিমি) রুটে ৫১ সিটের বাসের ভাড়া ২০১ টাকা এবং ৪০ সিটের বাসের ভাড়া ২৫১ টাকা নির্ধারিত। কিন্তু আজ যাত্রীদের কাছ থেকে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি উত্তরবঙ্গগামী (রংপুর, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও) দূরপাল্লার বাসগুলোতে। গাবতলী টার্মিনালে রংপুরগামী এক যাত্রী অভিযোগ করে বলেন, “রংপুরের নন-এসি ভাড়া বিআরটিএ চার্ট অনুযায়ী প্রায় ১,০০০ টাকা হলেও কাউন্টার থেকে ২,৪৫০ টাকায় দুটি টিকিট কিনতে বাধ্য করা হয়েছে। তারা নাকি ঠাকুরগাঁওয়ের ভাড়া ধরছে এবং সাথে ‘ঈদ বোনাস’ যোগ করছে।”
এদিকে এসি বাস ও তথাকথিত ‘স্লিপার কোচ’ বা ‘সুইট ক্লাস’ বাসগুলোর ভাড়া নিয়ে চরম নৈরাজ্য চলছে। সরকার এসি বাসের ভাড়া নির্ধারণের আশ্বাস দিলেও তা বাস্তবায়ন না হওয়ায় সুযোগ বুঝে ঢাকা থেকে রংপুরের স্লিপার কোচের ভাড়া ২,৫০০ থেকে ৩,০০০ টাকা পর্যন্ত হাঁকানো হচ্ছে, যা স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি। নিম্ন আয়ের অনেক মানুষকে বাধ্য হয়ে কম খরচে ঝুঁকিপূর্ণভাবে খোলা ট্রাকে যাতায়াত করতে দেখা গেছে।
প্রশাসনের বক্তব্য ও পরবর্তী পদক্ষেপ
টার্মিনালগুলোতে দায়িত্ব পালন করা বিআরটিএ-এর ভিজিল্যান্স টিমের কর্মকর্তারা দাবি করছেন, তারা অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে ব্যবস্থা নিচ্ছেন। তবে যাত্রীদের অভিযোগ, কাউন্টারগুলো প্রকাশ্যে বেশি দাম নিলেও প্রশাসনের দৃশ্যমান কোনো কঠোর ভূমিকা নেই।
যাত্রী সাধারণের যাতায়াত নির্বিঘ্ন করতে সরকার ইতিমধ্যে আগামী ২৫ মে থেকে ৩১ মে পর্যন্ত (ঈদের আগে ও পরে মোট ৭ দিন) মহাসড়কে সাধারণ ট্রাক, লরি ও কাভার্ড ভ্যান চলাচল বন্ধ রাখার নির্দেশনা জারি করেছে। তবে পশুবাহী ও জরুরি সেবার গাড়ি এর আওতামুক্ত থাকবে।
সচেতন মহল মনে করছেন, আগামী দু-তিন দিনে গার্মেন্টস পূর্ণাঙ্গ ছুটি হলে মহাসড়কে চাপ আরও কয়েক গুণ বাড়বে। এই সময়ে যদি অতিরিক্ত ভাড়া আদায় বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং সড়কে শৃঙ্খলা বজায় রাখা না যায়, তবে সাধারণ মানুষের ঈদযাত্রা চরম ভোগান্তিতে রূপ নিতে পারে।
১. জ্যাম ও সড়ক পরিস্থিতি:
চলমান অবস্থা: আসন্ন ঈদ-উল-আযহা উপলক্ষে ঢাকা-টাঙ্গাইল-যমুনা সেতু মহাসড়কে উত্তরবঙ্গগামী মানুষের ও যানবাহনের চাপ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে গাজীপুরের বিভিন্ন পোশাক কারখানা ছুটি হওয়ার পর মহাসড়কে ঘরমুখো মানুষের স্রোত দেখা গেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় যমুনা সেতুতে সাধারণ সময়ের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ গাড়ি পার হয়েছে।
যানবাহন চলাচল: অতিরিক্ত গাড়ির চাপ থাকা সত্ত্বেও মহাসড়কের টাঙ্গাইল অংশ (যেমন: ইলোঙ্গা, রাবনা বাইপাস, নগর জলফৈ ও করটিয়া বাইপাস) এবং যমুনা সেতুর পূর্ব টোল প্লাজা এলাকায় গাড়ি ধীরগতিতে হলেও সচল রয়েছে। বড় ধরনের কোনো স্থায়ী যানজট বা দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতার খবর এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।
প্রশাসন ও টোল প্লাজার প্রস্তুতি: যমুনা সেতু কর্তৃপক্ষ দ্রুত টোল আদায়ের জন্য বর্তমানে ১৮টি বুথ সচল রেখেছে (যার মধ্যে মোটরসাইকেলের জন্য ৪টি ডেডিকেটেড বুথ রয়েছে)। এছাড়া মহাসড়কে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে টাঙ্গাইল জেলা পুলিশ ও হাইওয়ে পুলিশের প্রায় ৮০০ জন সদস্য বিভিন্ন পয়েন্টে মোতায়েন রয়েছেন। তবে পশুবাহী ট্রাকের চাপ এবং কোথাও হঠাৎ গাড়ি বিকল বা দুর্ঘটনা ঘটলে সাময়িক ধীরগতি তৈরি হতে পারে।
২. বাস ভাড়া পরিস্থিতি:
অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের চিত্র: ঈদযাত্রাকে কেন্দ্র করে প্রতিবছরের মতো এবারও ঢাকা-টাঙ্গাইল রুটে এবং উত্তরবঙ্গগামী বাসগুলোতে সাধারণ যাত্রীদের কাছ থেকে বেশি ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। সুযোগ বুঝে কিছু লোকাল ও দূরপাল্লার বাসে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে অতিরিক্ত ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা বা তারও বেশি দাবি করা হচ্ছে। বিশেষ করে কাউন্টারগুলোতে টিকিটের তীব্র সংকটের কারণে অনেক যাত্রী বাধ্য হয়ে বেশি ভাড়ায় টিকিট কাটছেন এবং কম আয়ের মানুষ অনেকে ঝুঁকিপূর্ণভাবে ট্রাকে যাতায়াত করছেন।
সরকারি নির্ধারিত ভাড়া (এপ্রিল ২০২৬-এর সমন্বয় অনুযায়ী): জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণে গত এপ্রিল মাসে সরকার আন্তঃজেলা ও দূরপাল্লার বাসের ভাড়া কিলোমিটার প্রতি ২.২৩ টাকা নির্ধারণ করেছে। সেই তালিকা অনুযায়ী:
ঢাকা (মহাখালী) থেকে টাঙ্গাইল (৯০ কিমি দূরত্ব) রুটে ৫১ সিটের বাসের ভাড়া ২০১ টাকা এবং ৪০ সিটের (আরামদায়ক) বাসের ভাড়া ২৫১ টাকা নির্ধারিত।
সরকারি তদারকি: বিআরটিএ (BRTA) এবং প্রশাসনের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় রোধে মোবাইল কোর্ট ও কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এছাড়া ২৫ মে থেকে ৩১ মে পর্যন্ত (ঈদের আগে ও পরে মোট ৭ দিন) মহাসড়কে সাধারণ ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান চলাচল বন্ধ রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যা যাত্রী সাধারণের যাতায়াত কিছুটা সহজ করবে।
পরামর্শ: আপনি যদি আজ এই রুটে ভ্রমণ করার পরিকল্পনা করেন, তবে কাউন্টারে সরকারি ভাড়ার তালিকা যাচাই করে টিকিট কাটার চেষ্টা করুন এবং রাস্তায় অতিরিক্ত গাড়ির চাপের বিষয়টি মাথায় রেখে কিছুটা বাড়তি সময় হাতে নিয়ে বের হওয়াই ভালো হবে।
ঢাকা থেকে রংপুরের বাস ভাড়া কত?
ঢাকা থেকে রংপুরের স্বাভাবিক বাস ভাড়া সাধারণত বাসের ধরন (এসি নাকি নন-এসি) এবং অপারেটরের ওপর নির্ভর করে নির্ধারিত হয়ে থাকে। নিচে বর্তমানের প্রমিত ভাড়ার তালিকা দেওয়া হলো:
ঢাকা টু রংপুর বাস ভাড়ার তালিকা
| বাসের ধরন | স্বাভাবিক ভাড়ার রেঞ্জ |
| নন-এসি (Non-AC) | ৳৭৫০ থেকে ৳৮০০ |
| এসি (AC – চেয়ার কোচ) | ৳৯০০ থেকে ৳১,৫০০ |
| এসি (Sleeper/Premium) | ৳১,৭০০ থেকে ৳২,০০০ |
প্রধান প্রধান বাস অপারেটর
গাবতলী, মহাখালী ও কল্যাণপুর থেকে রংপুরের উদ্দেশ্যে নিয়মিত যেসব বাস ছেড়ে যায়, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
নাবিল পরিবহন
এস. আর ট্রাভেলস
হানিফ এন্টারপ্রাইজ
শ্যামলী এন. আর ট্রাভেলস
আগমনী এক্সপ্রেস
শাহ আলী পরিবহন
গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা (ঈদযাত্রা প্রসঙ্গে):
বর্তমানে ঈদ-উল-আযহার কারণে উত্তরবঙ্গগামী ঘরমুখো মানুষের প্রচণ্ড চাপ রয়েছে। এই সুযোগে অনেক কাউন্টার বা দালালেরা টিকিট সংকটের অজুহাতে স্বাভাবিক ভাড়ার চেয়ে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত ভাড়া দাবি করতে পারে।
তাই কাউন্টারে টিকিট কাটার সময় অবশ্যই বিআরটিএ (BRTA) নির্ধারিত ভাড়ার তালিকা দেখে নেওয়ার চেষ্টা করবেন এবং সম্ভব হলে অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলো (যেমন- Shohoz, bdtickets, বা বাসের নিজস্ব ওয়েবসাইট) থেকে টিকিট চেক করে নিতে পারেন।
