সরকারি নিউজ আপডেট

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে জনপ্রশাসন খাতে ৫ হাজার ৬৭ কোটি টাকা বরাদ্দ: দ্রুত পেনশন নিষ্পত্তি ও কর্মকর্তা প্রশিক্ষণে জোর

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের জন্য ৫ হাজার ৬৭ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। এই বরাদ্দের মাধ্যমে সরকারি সেবার দক্ষতা বৃদ্ধি, পেনশন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, প্রশাসনিক জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ এবং সরকারি কর্মকর্তাদের সক্ষমতা উন্নয়নে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার।

বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপনকালে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জনপ্রশাসন খাতের বিভিন্ন কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আগামী অর্থবছরে সরকারি কর্মচারীদের সেবা প্রাপ্তি আরও সহজ ও দ্রুত করার লক্ষ্যে বেশ কয়েকটি সময়সীমাভিত্তিক কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে।

৯ কার্যদিবসের মধ্যে পেনশন নিষ্পত্তির উদ্যোগ

প্রস্তাবিত বাজেটে সরকারি চাকরিজীবীদের পেনশন আবেদন নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, স্বয়ংসম্পূর্ণ পেনশন আবেদন জমা দেওয়ার পর সর্বোচ্চ ৯ কার্যদিবসের মধ্যে তা নিষ্পত্তি করা হবে। দীর্ঘদিন ধরে পেনশন প্রাপ্তিতে ভোগান্তি ও বিলম্বের অভিযোগ থাকলেও নতুন উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারীরা দ্রুত তাদের প্রাপ্য সুবিধা পাবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

কল্যাণ অনুদান প্রদানেও নির্ধারিত সময়সীমা

চাকরিরত অবস্থায় কোনো সরকারি কর্মচারী মৃত্যুবরণ করলে অথবা গুরুতর আহত হয়ে স্থায়ীভাবে কর্মক্ষমতা হারালে তার পরিবারকে দ্রুত আর্থিক সহায়তা প্রদানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাজেট পরিকল্পনা অনুযায়ী, আবেদন পাওয়ার ২০ কার্যদিবসের মধ্যে কল্যাণ অনুদান প্রদান নিশ্চিত করা হবে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো দ্রুত আর্থিক সহায়তা পাবে এবং প্রশাসনিক জটিলতা কমবে।

দুর্নীতি দমন ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলায় গুরুত্ব

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমে জবাবদিহিতা ও শৃঙ্খলা জোরদার করাও নতুন বাজেটের অন্যতম লক্ষ্য। শৃঙ্খলা ও আপিল বিধিমালার যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করার পাশাপাশি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রাপ্ত দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ১২ কার্যদিবসের মধ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে অভিযোগ ও তদন্ত-সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম সম্পন্ন করার এই উদ্যোগ সরকারি প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতা বৃদ্ধিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

কর্মকর্তা প্রশিক্ষণে ব্যাপক বিনিয়োগ

সরকারি প্রশাসনের দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের জন্য দেশীয় ও বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে।

বাজেট পরিকল্পনা অনুযায়ী—

  • ১৩০ জন উপসচিবকে অ্যাডভান্সড কোর্স অন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (এসিএডি) প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।
  • ১১০ জন যুগ্মসচিবকে সিনিয়র স্টাফ কোর্স (এসএসসি) প্রশিক্ষণ প্রদান করা হবে।
  • ৫০ জন অতিরিক্ত সচিবকে পলিসি প্লানিং অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট (পিপিএমসি) কোর্সে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হবে।

এ ছাড়া নবীন কর্মকর্তাদের চাকরি স্থায়ীকরণের পূর্বশর্ত হিসেবে বিভিন্ন আবশ্যিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি পরিচালিত হবে। এর মধ্যে রয়েছে—

  • বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ কোর্সে ৬১৫ জন কর্মকর্তা,
  • আইন ও প্রশাসন প্রশিক্ষণ কোর্সে ২৮০ জন কর্মকর্তা,
  • উন্নয়ন প্রশাসন কোর্সে ৮০ জন কর্মকর্তা।

বিশেষায়িত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ মানবসম্পদ গঠন

আধুনিক প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নে বিশেষায়িত প্রশিক্ষণও গুরুত্ব পাচ্ছে। আগামী অর্থবছরে—

  • পাবলিক প্রকিউরমেন্ট ম্যানেজমেন্ট (পিপিএম) কোর্সে ১৬০ জন,
  • প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট কোর্সে ২০ জন,
  • সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট কোর্সে ১২০ জন,
  • লিডারশিপ অ্যান্ড স্ট্রাটেজিক ম্যানেজমেন্ট কোর্সে ১২৫ জন,
  • পলিসি অ্যানালাইসিস কোর্সে ৭০ জন কর্মকর্তাকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি কর্মকর্তাদের নীতি বিশ্লেষণ, প্রকল্প ব্যবস্থাপনা এবং নেতৃত্ব বিকাশে এসব প্রশিক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

জাতীয় বাজেটের সামগ্রিক চিত্র

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটের আকার নির্ধারণ করা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা, যা দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১৩.৭ শতাংশ। এটি চলতি অর্থবছরের বাজেটের তুলনায় ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা বেশি।

বাজেট বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী জানান, আগামী অর্থবছরে উন্নয়ন ব্যয় বৃদ্ধি এবং পরিচালন ব্যয় তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর ফলে সরকারি ব্যয়ের কাঠামোয় উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডকে আরও বেশি অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

প্রশাসনিক সংস্কার ও সেবা উন্নয়নের প্রত্যাশা

বিশ্লেষকদের মতে, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ শুধু প্রশাসনিক ব্যয় নির্বাহের জন্য নয়; বরং সরকারি সেবার মানোন্নয়ন, ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণ, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। বিশেষ করে দ্রুত পেনশন নিষ্পত্তি, কল্যাণ অনুদান প্রদান এবং কর্মকর্তাদের দক্ষতা উন্নয়নমূলক প্রশিক্ষণ বাস্তবায়িত হলে সরকারি প্রশাসনের কার্যকারিতা ও জনসেবা প্রদানে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *