দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত নবম জাতীয় বেতন স্কেল (নবম পে স্কেল) বাস্তবায়নকে কেন্দ্র করে আবারও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) নতুন বেতন কাঠামো অন্তত দুই বছর পিছিয়ে দেওয়ার পরামর্শ দেওয়ায় বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তবে সরকার এখনই সেই সুপারিশ মেনে নেওয়ার পক্ষে নয়। বরং আর্থিক বাস্তবতা বিবেচনায় বাস্তবায়নের উপযোগী কৌশল নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অর্থ বিভাগ সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি ঢাকা সফরকালে আইএমএফের প্রতিনিধিদল অর্থ বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে নবম পে স্কেলের সম্ভাব্য আর্থিক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে। সংস্থাটির মতে, বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন বেতন কাঠামো একযোগে কার্যকর করা হলে সরকারের বার্ষিক ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে। এর ফলে বাজেট ঘাটতি বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতির চাপ এবং সামষ্টিক অর্থনীতিতে অস্থিরতা সৃষ্টি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এসব বিবেচনায় অন্তত দুই বছর পে স্কেল বাস্তবায়ন স্থগিত রাখার সুপারিশ করেছে আইএমএফ।
তবে সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের সূত্রগুলো বলছে, নবম পে স্কেল বাস্তবায়নের পরিকল্পনা থেকে সরকার সরে আসছে না। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিষয়টি গভীরভাবে পর্যালোচনা করে দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি বাস্তবসম্মত কৌশল নির্ধারণের নির্দেশ দিয়েছেন। ফলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ব্যয়, রাজস্ব আহরণ এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে আরও বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে দীর্ঘ বৈঠক
রোববার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রায় পাঁচ ঘণ্টাব্যাপী এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে অর্থমন্ত্রী, অর্থ সচিবসহ সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অংশ নেন। বৈঠকে সচিব কমিটির সুপারিশ, প্রস্তাবিত নতুন বেতন কাঠামো, সরকারের আর্থিক সক্ষমতা এবং সম্ভাব্য ব্যয়ের বিষয়গুলো বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করা হয়।
বৈঠকে নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের ফলে রাজস্ব ব্যয় কী পরিমাণ বাড়তে পারে এবং তা সরকারের বাজেট ব্যবস্থাপনায় কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে, সে বিষয়েও আলোচনা হয়। পরে প্রধানমন্ত্রী আরও বিশদ বিশ্লেষণ করে সুপারিশ দেওয়ার নির্দেশনা দেন।
গেজেট প্রকাশে তৎপর সরকার
অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, নবম পে স্কেলের প্রস্তাব মন্ত্রিসভায় উপস্থাপনের প্রস্তুতি প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। চলতি সপ্তাহ অথবা আগামী সপ্তাহের মন্ত্রিসভার বৈঠকে এটি অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হতে পারে।
এদিকে আগামী অক্টোবরে থাইল্যান্ডে অনুষ্ঠিতব্য বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের বার্ষিক সভায় বাংলাদেশের নতুন বেতন কাঠামো নিয়ে আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া নভেম্বরে আইএমএফ প্রতিনিধিদলের বাংলাদেশ সফরেও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হতে পারে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনা শুরুর আগেই সরকার গেজেট প্রকাশের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার বিষয়ে আগ্রহী।
ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের চিন্তা
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, একযোগে পুরো পে স্কেল কার্যকর করার পরিবর্তে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের বিকল্প নিয়ে গুরুত্বের সঙ্গে ভাবা হচ্ছে। এতে সরকারের ওপর তাৎক্ষণিক আর্থিক চাপ কিছুটা কমবে এবং বাজেট ব্যবস্থাপনাও সহজ হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
এ ধরনের কৌশল গ্রহণ করা হলে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা পর্যায়ক্রমে নতুন বেতন কাঠামোর সুবিধা পাবেন এবং একই সঙ্গে অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপও নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে।
দীর্ঘ এক দশকের অপেক্ষা
বাংলাদেশে সর্বশেষ জাতীয় বেতন স্কেল কার্যকর হয় ২০১৫ সালে। এরপর এক দশকেরও বেশি সময় ধরে সরকারি চাকরিজীবীদের মূল বেতন কাঠামোয় উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন আসেনি। এই সময়ে মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয়, আবাসন খরচ এবং চিকিৎসা ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ায় নতুন পে স্কেলের দাবি আরও জোরালো হয়েছে।
সরকারি চাকরিজীবী সংগঠনগুলোর মতে, বর্তমান বেতন কাঠামো দিয়ে ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয় মোকাবিলা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই দ্রুত নবম পে স্কেল বাস্তবায়নের দাবি দীর্ঘদিন ধরেই জানিয়ে আসছেন তারা।
প্রায় ১৫ লাখ কর্মকর্তা-কর্মচারী উপকৃত হবেন
অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, নবম পে স্কেল কার্যকর হলে প্রায় ১৫ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং কয়েক লাখ পেনশনভোগী এর আওতায় আসবেন। নতুন বেতন কাঠামোর পাশাপাশি বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ভাতা এবং অন্যান্য আর্থিক সুবিধাতেও পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
ফলে এটি শুধু কর্মরত সরকারি চাকরিজীবীদের নয়, অবসরপ্রাপ্ত পেনশনভোগীদের জীবনমানেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
আইএমএফ ঋণ কর্মসূচির প্রভাব
বর্তমানে বাংলাদেশ আইএমএফের ৫.৫ বিলিয়ন ডলারের ঋণ কর্মসূচির আওতায় রয়েছে। পাশাপাশি আরও ৬.৫ বিলিয়ন ডলারের নতুন ঋণ নিয়ে আলোচনা চলছে। এই প্রেক্ষাপটে বড় ধরনের পুনরাবৃত্তিমূলক সরকারি ব্যয় বাড়ানোর বিষয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে আইএমএফ।
সংস্থাটির মতে, রাজস্ব আদায়, বাজেট ঘাটতি এবং সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা নিশ্চিত না করে বড় অঙ্কের নতুন ব্যয় যুক্ত হলে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
সামনে কী হতে পারে?
বর্তমান পরিস্থিতিতে নবম পে স্কেল বাস্তবায়ন পুরোপুরি অনিশ্চিত হয়ে পড়েনি, তবে বাস্তবায়নের সময় ও পদ্ধতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সরকার একদিকে সরকারি চাকরিজীবীদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণ করতে চাইছে, অন্যদিকে আইএমএফের পরামর্শ, অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং রাজস্ব সক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার চ্যালেঞ্জও মোকাবিলা করছে।
সবকিছু বিবেচনায় এখন নজর থাকবে মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত, সম্ভাব্য গেজেট প্রকাশ এবং সরকারের চূড়ান্ত বাস্তবায়ন কৌশলের দিকে। সেটিই নির্ধারণ করবে, নবম পে স্কেল কবে এবং কীভাবে কার্যকর হবে।
