সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত নবম জাতীয় পে স্কেল বাস্তবায়নের কার্যক্রম এখন শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে। অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, নতুন বেতন কাঠামোর রূপরেখা, প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এবং প্রয়োজনীয় নীতিগত প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন হয়েছে। এখন আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন ও মন্ত্রিসভার অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে পুরো প্রক্রিয়া।
অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের লক্ষ্যে অর্থ বিভাগ, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বিতভাবে কাজ চলছে। প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হলেই বিষয়টি মন্ত্রিসভার অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে।
পে স্কেল নিয়ে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রীর বক্তব্য
গত ২৯ জুলাই সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, সরকার নির্ধারিত নীতিমালা অনুসরণ করেই নতুন বেতন কাঠামোর কাজ দ্রুত এগিয়ে নিচ্ছে। তিনি জানান, পে স্কেল বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে এবং এ বিষয়ে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট।
একই অনুষ্ঠানে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর ঋণ কর্মসূচির সঙ্গে নতুন পে স্কেলের কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নতুন বেতন কাঠামোর সঙ্গে আইএমএফ ঋণের কোনো নেতিবাচক সম্পর্ক বা শর্ত যুক্ত নয়। অর্থাৎ পে স্কেল বাস্তবায়ন আইএমএফ ঋণপ্রাপ্তির কারণে বাধাগ্রস্ত হবে না বলে তিনি স্পষ্ট করেন।
বিশেষ কমিটির হাতে চূড়ান্ত সুপারিশ
অর্থ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বে গঠিত বিশেষ কমিটি বর্তমানে নতুন বেতন কাঠামোর সুপারিশসমূহ চূড়ান্ত করার কাজ করছে।
এর আগে নবম জাতীয় বেতন কমিশন বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রেখে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মূল বেতন ও ভাতা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধির সুপারিশ জমা দেয়। কমিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী—
- বর্তমান ২০টি গ্রেড বহাল থাকবে।
- কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা প্রায় ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে।
- সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব রয়েছে।
- সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে।
কেন ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন?
অর্থ বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, কমিশনের সুপারিশ একবারে বাস্তবায়ন করতে অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হবে। বিপুল এই অর্থের সংস্থান এক অর্থবছরে করা সরকারের জন্য কঠিন হওয়ায় ধাপে ধাপে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের মাধ্যমে সরকারের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ কমবে এবং একই সঙ্গে সরকারি কর্মচারীরাও পর্যায়ক্রমে নতুন বেতন কাঠামোর সুবিধা পাবেন।
বাজেটে রাখা হয়েছে অর্থ বরাদ্দ
চলতি অর্থবছরের বাজেট ঘোষণার সময় অর্থমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, নতুন বেতন কাঠামো ১ জুলাই থেকে ধাপে ধাপে কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে। সে লক্ষ্যে বাজেটে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দও রাখা হয়েছে।
অর্থ বিভাগ জানিয়েছে, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধে প্রয়োজনীয় অর্থায়নের বিষয়ে কোনো ধরনের সংকট তৈরি হবে না এবং বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে প্রয়োজনীয় আর্থিক প্রস্তুতি রাখা হয়েছে।
সামনে কী?
সরকারি সূত্রে জানা গেছে, প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর নতুন পে স্কেল অনুমোদনের জন্য মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করা হবে। মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর সরকারি প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে এবং এরপরই বাস্তবায়নের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হবে।
অন্যদিকে আগামী ১২ থেকে ১৮ অক্টোবর ব্যাংককে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বার্ষিক সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। ওই সভার ফাঁকে আইএমএফের সঙ্গে সরকারের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে সরকারি ব্যয়, বিশেষ করে অনুন্নয়ন ব্যয় ও সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন অর্থনৈতিক বিষয় নিয়ে আলোচনা হতে পারে। তবে সরকারের অবস্থান হলো—দেশের প্রশাসনিক প্রয়োজন ও আর্থিক সক্ষমতার ভিত্তিতেই নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
সরকারি চাকরিজীবীদের প্রত্যাশা
নতুন পে স্কেল নিয়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই ব্যাপক আগ্রহ রয়েছে। মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় নতুন বেতন কাঠামো দ্রুত কার্যকর হবে—এমন প্রত্যাশা করছেন তারা।
এখন সংশ্লিষ্ট সকলের নজর প্রজ্ঞাপন জারির দিকে। কারণ প্রজ্ঞাপন প্রকাশের মাধ্যমেই বহু প্রতীক্ষিত নবম জাতীয় পে স্কেল বাস্তবায়নের আনুষ্ঠানিক পথ উন্মুক্ত হবে।
